ছোট বউরানি বললে–অমন নবাবের মুখে আগুন, অমন নবাব থাকলেই বা কী, আর গেলেই বা কী!
দুর্গা বললে–তা তোমরাও তো পলাশপুরের তালুকদার, তোমাদের কিছু হেনস্থা করেনি নবাব?
এসব কথার জবাব দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল না লুৎফার। সেই ভোরবেলা থেকে পাশাপাশি একসঙ্গে কাটিয়ে একটু ঘনিষ্ঠতা হয়ে গিয়েছিল। একসঙ্গে খানিকক্ষণ থাকলেই তো পরস্পরের খবর দেওয়া-নেওয়া চলে। তোমরা মুসলমান, তা হোক। কিন্তু এক দেশেরই তো মানুষ। আমাদের হাতিয়াগড়েও অনেক মুসলমান প্রজা আছে।
দুর্গা বললে–আমাদের ছোটমশাইকে সবাই রাজার মতো ছেদ্ধা-ভক্তি করে। ছোটমশাই হাতিয়াগড়ের রাজা–তা ওই যে এক হতচ্ছাড়া নবাব হয়েছে, তার জ্বালায় কি আর শান্তিতে থাকতে পারে কেউ? নবাবি গেছে বেশ হয়েছে
কথা শুনতে শুনতে লুৎফার যেন কেমন ভয় করতে লাগল। এরা যদি জেনে ফেলে? এরা যদি চিনতে পারে? চিনতে পারলে যে জানাজানি হয়ে যাবে?
তা তোমার কর্তা অমন চুপচাপ বসে আছে কেন গো? কী হয়েছে?
লুৎফা বললে–মন ভাল নেই
তা মন তো আমাদেরও ভাল ছিল না এতদিন। এতদিন যে কী কষ্টে দিন গেছে! কোথায় কোথায় দিন কাটিয়েছি, রাস্তায়ঘাটে যেখানে পেরেছি থেকেছি। তেমন কষ্ট শত্ত্বরেও যেন না পায়।
কেন? কী হয়েছিল আপনাদের?
ওই যে বললুম, হতচ্ছাড়া নবাব। হতচ্ছাড়া নবাবের জন্যে কি দেশে বউ-ঝি নিয়ে কেউ শান্তিতে থাকতে পারত। আমার এই ছোট বউরানির ওপরে যে নবাবের বিষনজর পড়েছিল বাছা! মুখপোড়া নবাব এখন গেছে এখন বেঁচেছি–
লুৎফা বললে–এই ছোট বউরানির ওপর নজর পড়েছিল?
তা শুধু কি বাছা এই ছোট বউরানির ওপর? কত মেয়ের সব্বনাশ করেছে তার কি ঠিক আছে? তুমি কি মনে করেছ তাদের শাপ লাগেনি? নবাবের এখন হয়েছে কী? এখন তো সবে কলির সন্ধে। মাথার ওপর ভগবান বলে তো একজন আছে, তার নজর তো এড়াবে না বাছা!
সত্যি বলুন-না, কী হয়েছিল? কেন এত গালাগালি দিচ্ছেন?
ছোট বউরানি বললে–তুই থাম না দুগ্যা, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে এখন আর কেন বলছিস?
বলব না? এখন কাকে ভয় করব শুনি?
লুৎফা বললে–না না, বলুন-না কী হয়েছিল?
যে-লোকটা এতক্ষণ গাছতলায় হেলান দিয়ে বসে ছিল, সে-লোকটা তখন উঠে দাঁড়িয়েছে।
দুর্গা দেখতে পেয়েছে। বললে–ওই যে তোমার কর্তা কোথায় যাচ্ছে গো, খুব খিদে পেয়েছে বোধহয় মানুষটার, আহা, সকাল থেকে তোমাদের কিছু খাওয়া হয়নি।
লুৎফা ফিরে তাকাল।
দুর্গা বললে–কী রকম আক্কেল বাছা তোমাদের, তোমরা যাচ্ছ পিরের দরগায়, আর সঙ্গে চাল-ডাল কিছু নাওনি
প্রথমে রান্না হয়েছিল দুর্গাদের। কৃষ্ণনগর থেকে সবই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। রান্না-খাওয়া হবার পর তখন আলাদা করে রান্না চড়েছিল লুৎফাঁদের। শিরিনা রান্না করছিল খিচুড়ি। জীবনে কখনও এমন করে এমন অবস্থায় পড়তে হয়নি লুৎফাঁকে। খিদে যে এমন জিনিস, তাও কখনও এমন করে বুঝতে হয়নি। খোলা আকাশের তলায় এমন করে বসে খাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেনি। টাটা করছে রোদ। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ডাকলে ওগো
মির্জা মহম্মদ মুখ ফেরাল।
কোথায় যাচ্ছ? খিচুড়ি বানিয়েছে যে শিরিনা—
অ্যাঁ? এতক্ষণে বাস্তব জগৎটা যেন মির্জা মহম্মদের চোখের সামনে ধরা পড়ল।
কোথায় যাচ্ছিলে? তুমি যে বললে–খুব খিদে পেয়েছে তোমার?
আমার কিছু ভাল লাগছে না আর। খুকু কোথায়?
ঘুমোচ্ছে! চলল, খাবে চলো।
ওরা কারা? কাদের সঙ্গে কথা বলছিলে এতক্ষণ?
হাতিয়াগড়ের হোটরানি!
হাতিয়াগড়! নামটা শুনেই মরিয়ম বেগমসাহেবার কথা মনে পড়ল। মরিয়ম বেগমসাহেবা এখানে এসেছে নাকি! মির্জা মহম্মদ নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা খানিকক্ষণের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। চেহেসতুনের কথা মনে পড়ল। আবার একবার দেখতে ইচ্ছে করল মরিয়ম বেগমসাহেবাকে। চেহেল্-সুতুন ছেড়ে আসবার সময় একবার শেষবারের মতো দেখা করবার ইচ্ছে হয়েছিল।
ওরা এখানে কী করতে এসেছে?
ওরা হাতিয়াগড়ে ফিরে যাচ্ছে।
তা হলে স্বামীর কাছেই শেষপর্যন্ত ফিরে যাচ্ছে বেগমসাহেবা! ভালই হয়েছে। একদিন যখন অশান্তির যন্ত্রণায় ছটফট করেছে, যখন অনিদ্রায় ক্লান্তিতে শরীর-মন অবশ হয়ে এসেছে, তখন ওই মরিয়ম বেগমসাহেবাই দিনরাত পাশে বসে সান্ত্বনা দিয়েছে নবাবকে।
বললে–ওরা জানে আমি এখানে এসেছি?
না, আমি কখনও তাই বলি? আমি বলেছি আমি পলাশপুরের তালুকদার সাহেবের বউ, আজিমাবাদের ফকিরের দরগায় দোয়া চাইতে যাচ্ছি–
মির্জা মহম্মদ বললে–খিচুড়ি তৈরি হয়েছে?
আর একটু সবুর করো, এখনই হবে। আমি দেখে আসছি
দাঁড়াও, আমিও যাব।
কোথায়?
ওদের সঙ্গে দেখা করব।
লুৎফা ভয় পেয়ে গেল। বললে–না না, তুমি যেয়ো না, ওরা চিনে ফেলবে
মির্জা মহম্মদ বললে–না না, মরিয়ম বেগমসাহেবা চিনতে পারলে কিছু ক্ষতি নেই
ওগো না, ও মরিয়ম বেগম নয়, ও অন্য, ওরা নবাবকে গালাগালি দিচ্ছে, ওরা তোমার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। নবাব পালিয়ে গেছে শুনে ওরা এতদিন পরে হাতিয়াগড়ে ফিরে যাচ্ছে। ওখানে তুমি যেয়ো না–
বলতে বলতে লুৎফার চোখে জল এসে গেল। বললে–সবাই তোমার শত্রু তা জানো, কেউ তোমার ভাল দেখতে পারে না।
মির্জা মহম্মদ থমকে দাঁড়াল খানিকক্ষণ! সবাই তার শত্রু! সবাই তার খারাপ চায়। সবাই তার অমঙ্গল কামনা করে! এই মুর্শিদাবাদ থেকে এত দূরে এসেও মানুষের শত্রুতার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া গেল না!
