পালকিটা চলতে চলতে প্রায় কাশিমবাজারের কাছে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে আবার ময়দাপুর ফিরতে প্রায় ভোর হয়ে গেল। ল’সাহেব যদি আবার ফিরে আসে তো তারও কিছু বন্দোবস্ত করতে হবে।
নবাব মির্জা মহম্মদ ফিরেই আসুক আর ক্লাইভ সাহেবই জিতুক, তাতে উমিচাঁদ সাহেবের কিছু এসে যায় না। তোমাদের দুজনের মধ্যে যে জিতবে আমি তার দলে। তোমার টাকা যদি থাকে তো থাকুক, আমি সেদিকে নজর দেব না। কিন্তু আমার হাতযশ যদি থাকে তো সে টাকা আমার হাতে চলে আসবেই! আমি উমিচাঁদ। একদিন নিঃসম্বল হয়ে এই বাংলা মুলুকে এসেছিলাম পাঞ্জাব থেকে। সেদিন পথে পথে দুটো ভাতের জন্যে ঘুরে বেড়িয়েছি, কেউ ভিক্ষে দেয়নি। আজ আমার টাকা হয়েছে, কিন্তু প্রতিজ্ঞা করেছি, চুরি করব, ডাকাতি করব, ঠকব, কিন্তু ভিক্ষে আর করব না। জীবনে সার বুঝে নিয়েছি ভিক্ষের চেয়ে চুরি ভাল!
হঠাৎ যেন কিছু শব্দ কানে এল! এত সকালে কীসের শব্দ? ময়দাপুর এসে গেল নাকি?
কাছে যেতেই ছাউনির সেপাইরা ঘিরে ধরেছে।
হুজুর আপনি?
সেপাইরা এত ভোরেই উঠে পড়েছে। এত কীসের কাজ?
হ্যাঁ, জরুরি খবর আছে, সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
কিন্তু পথে ওদিকে কোনও মেয়েছেলেকে দেখলেন?
মেয়েছেলে?
সেপাইটা বললো, কর্নেলসাহেব একজন মেয়েছেলে স্পাইকে ধরে রেখে দিয়েছিলেন, তাকে আবার শাড়িও কিনে দিয়েছিলেন, সে হঠাৎ পালিয়েছে
পালিয়েছে?
সর্বনাশ হয়েছে। এই খবর এসেছেনবাব আসছে আর এই সময়েই কি নবাবের চর পালিয়ে গেল।
কী করে পালাল?
ওদিক থেকে নবকৃষ্ণ এসে হাজির হল। এই যে, আবার ফিরে এলেন হুজুর? এদিকে সর্বনাশ কাণ্ড বেধে গেছে। একজন মেয়েমানুষ চর পালিয়ে গেছে সাহেবের ঘর থেকে।
উমিচাঁদ বললে–চলো, কর্নেলসাহেবের কাছে চলল। চর পালাক, ওদিকে আরও জবর খবর দিতে হবে সাহেবকে
*
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ভাল লোকই দিয়েছিলেন সঙ্গে। নৌকো ঘাটে লাগতেই তারা গাছতলায় রান্নাবান্না আরম্ভ করে দিয়েছিল। সঙ্গে কাঠও ছিল, হড়িকুড়ি-বাসন-তৈজস সবই এনেছিল সঙ্গে।
এতক্ষণ দেখতে পায়নি ওরা। বোরখা-পরা বউটা আর তার ঝি আবার কাছে এল।
বউটা বললে–আপনারা কি রান্নাবান্না করছেন?
দুর্গা বললে–তা তোমরাও রান্নাবান্না করো না
বউটা বললে–আমাদের সঙ্গে যে বাসনটাসন কিছু নেই
তা এত দূরের রাস্তায় যাচ্ছ, সঙ্গে বাসনকোসন নেই, এ কী রকম রীতি তোমাদের বাছা? সঙ্গে কে তোমার? ভাতার?
বউটা বুঝলে। বললো –হ্যাঁ
তা তোমার ভাতারেরই বা কী রকম আক্কেল বাছা যে, সঙ্গে বাসনকোসন আনে না।
বউটার স্বামী তখন একটা গাছতলায় চুপ করে হেলান দিয়ে বসে আছে।
তা হলে খাবে কী?
বউটা বললে–সেই কথাটা তো বলতে এসেছি। সঙ্গে আমাদের কিছু নেই।
তা আমরা যে হিন্দু, তোমাদের ছোঁয়া তো আমরা খাইনে। আমাদের ছোঁয়া কি তোমরা খাবে?
তা খেতে পারি! আমার জন্যে আমি ভাবি না। আমার এই ছোট মেয়েটা আর ওঁর জন্যে ভাবছি।
দুর্গা বললে–তা এখানে যদি তোমাদের কোনও স্বজাতি থাকে তাদের বাড়ি যাও না, সেখানে গেলে তোমাদের ভাত রান্না করে দিতে পারে–
অনেকক্ষণ ধরে দু’জন লোক এদিকে চেয়ে দেখছিল। তারা আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কী যেন বলছিল।
একজন বললে–আমার মালুম হচ্ছে লোকটা নবাবজাদাটাদা কেউ হবে।
কী করে বুঝলেন?
দুধের জনো একটা মোহর দিয়ে দিলে, এ তো যে-সে কেউ নয়, আর পায়ের জরিদার চটি দেখছিস, নবাবজাদা ছাড়া ওরকম চটি কে প্রবে?
যে-লোকটার চটির কথা হচ্ছিল তার তখন কোনও দিকে খেয়াল নেই। খোলা আকাশের দিকেই। তখন সে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। আল্লাহ খোদাতালা, তোমার কাছে আমি আজ ক্ষমাও চাইব না। ক্ষমা চাইবার হিম্মৎ আজ আর আমার নেইও। কিন্তু ওদের তুমি দেখো। ওরা কোনও পাপকরেনি, আমার পাপের ফল ওরা কেন ভোগ করবে! ওদের তুমি দেখো আল্লাহ
খানিকক্ষণের মধ্যেই বেশ ঘনিষ্ঠতা জন্মে গেল দুটো দলে। ভোরাত্রে দুটো পরিবার দুটো নৌকোয় এসে একই ঘাটে জুটেছিল। তারপর আস্তে আস্তে সূর্যের আলো ফুটল। কৌতূহল অদম্য হয়ে উঠল দুদলের মনে। এরা ভাবলে–ওরা কারা। ওরাও ভাবলে–এরা কারা। বিপদের সময় মানুষ আশেপাশের কারও সহানুভূতি চায়, কাউকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়।
তা মুর্শিদাবাদের নবাব পালিয়ে গেছে, তা শুনেছ তো বাছা?
কথাটা শুনেই বউটা যেন চমকে উঠল। সেই জুন মাসের ভোরবেলায় হঠাৎ বজ্রাঘাত হলে যেমন হয়, ঠিক তেমনি হয়ে উঠল বউটার মুখের ভাব। তাড়াতাড়ি ছোট মেয়েটাকে কোলে টেনে নিলে। যেন অভিশাপ লাগবে কারও!
বউটি বললে–আমি উঠি ভাই
দুর্গা বললে–ওমা, উঠবে কেন, বোসো না–
দুর্গা ছাড়লে কিছুতেই। জোর জবরদস্তি করে বসিয়ে দিলে। দূরে মানুষটা তখনও গাছে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার যেন কোনও দিকেই খেয়াল নেই। আল্লার বিচিত্র খেয়াল কারও বুঝবার উপায় নেই। একদিন এই রাজমহল, এই মুর্শিদাবাদ, এই বাংলা মুলুক, এখানকার সবাই নবাবকে দেখতে পেলে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে কুর্নিশ করত। হিন্দু মুসলমান ফিরিঙ্গি সবাই নবাবের সামনে আসতে ভয় পেয়েছে। আজ তাদের সেই নবাব গাছতলায় চুপ করে বসে আছে, কেউ তার দিকে চেয়েও দেখছে না, কেউ কুর্নিশও করছে না। কেউ বুঝতেই পারছে না, তাদেরই নবাব আজ এখানে তাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে রাস্তার ধুলোয় তার মসনদ পেতেছে।
