একই কথা। দরকার হলে তোমার মির্জা আজিমাবাদ থেকে লড়াই করবে। কিংবা জাহাঙ্গিরাবাদ থেকে
তুমি তা হলে বলছ ওই কথা? তুমি তা হলে অভয় দিচ্ছ?
হ্যাঁ হ্যাঁ, অভয় দিচ্ছি। তোমার কোনও ভয় নেই, সে মুর্শিদাবাদেই আসছে। একেবারে হাতির পিঠে চড়ে আসছে….
বলতে বলতে কী যেন একটা শব্দ হল আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল।
কৌন?
আমি পিরালি খাঁ, নানিবেগমসাহেবা।
নানিবেগমসাহেবা ধড়মড় করে উঠে ফটক খুলে দিয়েছে।
কী হয়েছে পিরালি খাঁ? কেউ মালখানা লুঠ করতে এসেছে?
না নানিবেগমসাহেবা। নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা মুর্শিদাবাদে আসছেন।
মির্জা আসছে? তোকে কে বললে?
আনন্দে উৎকণ্ঠায় নানিবেগমসাহেবার গলা যেন বুজে এল।
বল শিগগির, কে তোকে বললে? বল
শহরে খবর এসেছে। আজিমাবাদ থেকে ফরাসি মিরবকশি ল’সাহেবের সঙ্গে ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে আসছে।
নানিবেগমসাহেবা কী করবে বুঝতে পারলে না। হাতের কাছে কাউকে যেন ডাকতে ইচ্ছে হল, কারও কাছে যেন কথাটা বলে তৃপ্তি পেতে ইচ্ছে হল। ওরে, তোরা কোথায় গেলি? ওরে পেশমন, ওরে গুলসন, বন্ধু, তকি, আমিনা, ময়মানা–
তারপর হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেছে। পিরালিকে বললে–ওরে, তা হলে, নহবতখানায় খবর দে পিরালি, নবত বাজাতে বল–মির্জা আসছে, বল যেন ভাল করে নবত বাজায়–ওরা নবত বাজাচ্ছে না কেন? ওরে যা, শিগগির কর–
সেদিন মনসুরগঞ্জের হাবেলিতেও খবর পৌঁছে গেল। মিরন ক’দিন থেকেই রাত্রে ঘুমোচ্ছ না। মিরজাফর আলি হবে সুজা উল মুলক হিসাম-উ-দ্দৌলা বাহাদুর মহবত জঙ। আর মিরন নিজে হবে। সুজা উল মুলক শহবত জঙ।
হঠাৎ মনসুরগঞ্জের ভেতরেও গোলমাল শুরু হল।
শেষরাত্রের দিকে আবার কী হল? কীসের গোলমাল? মিরন বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে। ভোর হয়ে আসছে।
বাপজান?
তাড়াতাড়ি মিরজাফরের ঘরের সামনে গিয়ে ডাকাডাকি শুরু করে দিলে মিরন। নীচেয় সদর ফটকে কারা এসেছে। আবার ফিরিঙ্গি সাহেব এল নাকি? বারবার একটানা-একটা ফরমাশ! মরিয়ম বেগম তো আছে চেহেল্-সুতুনে। আবার কীসের খবরদারি!
কী হল? ডাকছিস কেন?
মিরজাফর সাহেবের কানেও আওয়াজটা গেছে।
নীচেয় বোধহয় আবার সেই ওয়ালস সাহেব এসেছে।
মিরজাফর সাহেব বিরক্ত হল। একটু ভেবে নিয়ে বললে–আসলে এটা হল ফিকির। কেবল এসে এখানকার হালচাল জেনে যাচ্ছে–
কিন্তু না। এসেছে মেহেদি নেসার। আর সঙ্গে আছে রেজা আলি।
শুনলাম নবাব ফিরে আসছে মুর্শিদাবাদে।
ক্যা?
নবাব ফিরে আসছে শহরে। জোর গুজব। আজিমাবাদ থেকে জেনারেল ল’সাহেব ফৌজ নিয়ে নাবের সঙ্গে আছে!
হঠাৎ সমস্ত মুর্শিদাবাদের মুখখানার ওপর কে যেন কালি লেপে দিলে। একদিন যে মুর্শিদাবাদ ফিরিঙ্গি ফৌজের ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল, এই নতুন খবরটা পেয়ে তার যেন বাকরোধ হয়ে এল। অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই অরাজক রাজধানী আগেও অনেকবার অরাজকতা দেখেছে, কিন্তু এমন করে কখনও আতঙ্কে শিউরে উঠে নিশ্চল হয়ে যায়নি। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে যেন রোমাঞ্চের খোরাক জুগিয়ে গেছে ইতিহাস। যারা সেদিন শহর ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিল তারাও খবর শুনে জেগে উঠে বসল। এদের এতদিনের সমস্ত ভবিষ্যৎবাণী মিথ্যে হয়ে গেল রাতারাতি; আবার তা হলে নবাব আসবে? আবার তা হলে যে-যার নিজের নিজের ভিটেয় গিয়ে গৃহদেবতা শালগ্রাম শিলার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে কথাবার্তা সেরে শেষরাত্রের দিকে রওনা দিয়েছিল উমিচাঁদ সাহেব। রাত্রের অন্ধকারে রাজধানীতে পোঁছোনোই ভাল। কিন্তু পথেই খবরটা পেয়ে পালকি থামাতে বললে।
কী বললে রে লোকটা?
একটা পালকি-বেহারা বললে–হুজুর, বললে–নবাব নাকি আবার আসছে
আবার আসছে মানে?
আজিমাবাদ থেকে ফৌজ সেপাই নিয়ে মুর্শিদাবাদে লড়াই করতে আসছে।
কথাটা শুনে কিছুক্ষণ থমকে চুপ করে রইল উমিচাঁদ সাহেব। একবার দাড়িতে হাত বুলোল। পালকিটা আবার চলতে আরম্ভ করেছিল। দু’কোটি কুড়ি লাখ টাকা চেয়ে পাঠিয়েছিল সাহেব, তাও জগৎশেঠজি দিলে না? আরে, টাকাটা তো তোমার জলে যাচ্ছে না। তুমি টাকাটা দিয়ে দেবে এখন, তারপর যখন নবাবের মালখানার ভেতরে ঢুকে হিসেব-নিকেশ হবে তখন তো তোমার আসল টাকা পেয়ে যেতে। শুধু আসল টাকাটাই পেতে না, সঙ্গে সঙ্গে সুদও পেয়ে যেতে। সুদখোর মানুষ তো, তাই দিতে ভরসা হল না।
এই, রোখকে রোখকে
পালকিটা চলতে চলতে হঠাৎ সাহেবের হুকুম পেয়ে থেমে গেল মাঝপথে।
পালকি ঘোরা। যেদিক থেকে এসেছিলি, সেই দিকেই ফিরে চল–
আজ্ঞে, আবার ময়দাপুরে যাব?
হ্যাঁ!
পালকিটার মুখটা আবার ঘুরল। আবার উলটো দিকে চলতে লাগল পালকি। হুজুরের যেমন মর্জি, তেমনি করতে হবে। সেই কবে কলকাতা থেকে বেরিয়েছে। বেরিয়ে পথে কাজ সেরেছে, কোথাও দুদিন থেমেছে, আবার চলতে আরম্ভ করেছে। সাহেবের মতিগতি বোঝবার উপায় নেই কারও। কখন কোথায় যাবে, কোথায় থামবে তারও আগে থেকে কোনও হদিস দেবে না।
তা হোক, তারা তো জানে না যে, উমিচাঁদ সাহেব নিজেই জানে না কখন কোথায় থামতে হবে। সারাজীবন ধরে একদিকে স্থির লক্ষ্যে চলা হয়নি উমিচাঁদের। শুধু টাকাটার দিকেই নজর ছিল। সেই টাকার জন্যে কখনও বাঁয়ে হেলেছে, কখনও ডাইনে। কখনও এদলে কখনও ও দলে। যতদিন নবাব আলিবর্দি বেঁচে ছিল ততদিন তাকে ভুলিয়ে খুশি রেখেছে। নবাবকে খুশি রেখে কাজ হাসিল করেছে নিজের। কিন্তু তার পরে যেনবাব এল তার হাত উপুড় হতে চায় না। কথায় কথায় বলে, টাকা নেই। আরে টাকা যখন তোমার নেই তখন আমিও নেই। যাদের টাকা আছে আমি তাদের দলেই থাকব।
