আর তা ছাড়া এই-ই তো সুযোগ। এই সময়ে নবাব নেই, পাহারাদার নেই। কিছুই নেই বলতে গেলে। নিয়ম করে আর ইনসাফ মিঞা নহবতও বাজায় না। তারাও ভয় পেয়ে গেছে। মাইনে পাবে কি না তারই তো কোনও ঠিকঠিকানা নেই।
নানিবেগমসাহেবা সারারাত পাহারা দেয়। পিরালি খাঁ-কে হুশিয়ার করে দেয়। বলে খুব হুশিয়ার পিরালি। আমার মালখানার দিকে যেন কেউ না আসে। কেউ এলে তার গর্দান নিয়ে নেবে, তার পরে কথা।
পিরালি খাঁ,নজর মহম্মদ,বরকত আলি, তারা সবাই প্রহরে প্রহরে টহল দেয়। বেগমমহলের ফটকে ফটকে গিয়ে চিৎকার করে হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার হো
যারা ঘুমোয় তারা হুড়মুড় করে জেগে ওঠে ভয় পেয়ে। কী হল? আবার কী হল? আবার মালখানা লুঠ করতে এল নাকি?
তারপর যখন বুঝতে পারে তখন গালাগালি দেয় মনে মনে। বলে–মরণদশা আর কী! একটু ঘুমোতেও দেবে না ছাই
সমস্ত চেহেল্-সুতুনটাই এমনি ভয়ে ভয়ে শিউরে ওঠে সারারাত। দিনের বেলাটা তবু কোনওরকমে কাটে। কিন্তু রাত হলেই সকলের ভয় করে। কখন কী হয় কেউ বলতে পারে না।
কিন্তু সেদিন সত্যি-সত্যিই আর কারও ঘুম এল না। বাইরে যেন খুব গোলমাল হতে শুরু করেছে। আবার কি মালখানা লুঠ করতে এসেছে মেহেদি নেসার সাহেব? আবার বুঝি নানিবেগমসাহেবার সঙ্গে ঝগড়া বাধবে।
পেশমন বেগম নিজের মহলের ফটকের সামনে এসে উঁকি মারল। লোকজন ছুটোছুটি করছে।
সাহস করে পেশমন বেগম একজনকে জিজ্ঞেস করলে-কী হল রে বরকত?
বরকত আলির তখন বোধহয় আর সময় নেই কথা বলবার। দৌড়োত দৌড়োতে ছুটল নানিবেগমসাহেবার মহলের দিকে।
গুলসন কথাটা শুনতে পেয়েছিল। একটু ফুরসুত পেতেই জিজ্ঞেস করলে–কী হয়েছে রে ভাই? এত হল্লা আবার কীসের?
পেশমন বললে–কী জানি, মুখপোড়ারা আবার কী করেছে
আর কাউকে জিজ্ঞেস করো না।
তুই জিজ্ঞেস কর ভাই। আমার ভয় করছে।
হয়তো ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে।
পেশমন বললে–ফিরিঙ্গি ফৌজ এলে তো বাঁচি–এ আর ভাল্লাগে না ছাই। রোজই একটা-না-একটা হুজ্জত ।
পাশের ফটক থেকে তক্কি বেগমসাহেবা জিজ্ঞেস করলে–কী হয়েছে রে ভাই? হল্লা হচ্ছে কেন?
ওই দেখ, সব্বাই জেগে উঠেছে।
জেগে তো উঠবেই। কেউ কি আর ঘুমোতে পারছে একদিন? খাওয়া নেই, ঘুম নেই, শান্তি নেই মনে!
তক্কি বেগম বললে–ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে নাকি রে?
পেশমন বললে–হ্যাঁ, তোর তো আরাম, নতুন নতুন নাগর পাবি। একটু তবু মুখ বদলাতে পারবি
আহা মুখ বদলিয়ে আর কাজ নেই লো। সে বয়েস গেছে।
তা হলে মক্কায় গিয়ে হজ করে আয়। ফিরিঙ্গিরা তোকে হজ করিয়ে নিয়ে আসবে।
তক্কি বেগম রেগে গেল। বললে–তা তোদের তো বয়েস আছে, তা হলেই হল।
পেশমন খোঁটা দিয়ে উঠল–মর তুই, আমরা মরছি প্রাণের ভয়ে, তোর এখন নাগরের শখ! এত নাগর পেয়েও তোর রস ঝরে না লো?
কথাটা বোধহয় আরও বাড়ত। কিন্তু বাধা পড়ল। পিরালি খাঁ ওদিক থেকে আসছিল। সামনে আসতেই যে-যার মহলের ফটক বন্ধ করে আড়ালে মুখ লুকিয়েছে।
পিরালি খাঁ যেতে যেতে বলতে লাগল–হুশিয়ার হো-হুঁশিয়ার
তারপর একেবারে সোজা নানিবেগমসাহেবার মহলের সামনে গিয়ে হাজির বরকত আলি।
নানিবেগমসাহেবা বলতে গেলে জেগেই ছিল। ডাক শুনে উঠে পড়ল–কৌন? পিরালি?
আমি বরকত, নানিবেগমসাহেবা!
ক্যা খবর?
ততক্ষণে পিরালি খাঁ-ও দৌড়োত দৌড়োতে এসে পড়েছে। নানিবেগমসাহেবা সজাগই থাকে সবসময়। কিন্তু সেদিন বুঝি একটু তন্দ্রা এসেছিল। তার মধ্যেই যেন স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্ন দেখছিল, নবাব আলিবর্দি খাঁ এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।
একী, তুমি আলি জাঁহা!
হ্যাঁ, আমি এলাম। মির্জার বিপদের দিনে আমি না এসে পারি?
তা ভালই করেছ, তুমি এসেছ। জানো, সবাই মিলে মির্জাকে আমার হয়রান করে দিচ্ছে। সে বেপাত্তা হয়েছে। যাবার সময় আমাকে একবার বলেও যায়নি। আমি আর একলা সামলাতে পারছি না চেহেল্-সুতুন।
আর একলা সামলাতে হবে না, আমি তো এসেছি।
কিন্তু আমার মির্জার কী হবে?
হবে আবার কী? কিছুই হবে না।
জানো, মির্জার ইয়ারবকশিরা আমার মালখানা লুঠ করতে এসেছিল, আমি তাদের গালাগালি দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছি–এখন কী হবে? তারা যদি ফিরিঙ্গিদের ফৌজ নিয়ে এসে চেহেল্-সুতুনে হামলা করে? তারা যদি আমাদের কোতল করে?
কেঁদোনা। কান্না তোমায় মানায় না। তুমিনা নানিবেগম! তোমার মুখ চেয়ে না চেহেল্-সুতুনের বেগমরা বসে আছে? তোমায় কাঁদতে দেখলে তারা কী ভাববে তা একবার ভাবো তো? আর মির্জার কথা বলছ? মির্জা কি পালাবার মতো নাতি তোমার? মির্জা ফিরিঙ্গিদের ভয়ে পালাবে, তোমার নাতি কি সেই রকম?
ওগো, তুমি জানো কোথায় গেছে সে? সত্যি জানো?
জানি জানি। জানি বলেই তো তোমাকে বলতে এসেছি
বলো না সে কেমন আছে? কোথায় আছে? কখন আসবে?
আসবে আসবে, দু’দিন সবুর করো। সে হাতির পিঠে চড়ে মুর্শিদাবাদে আসবে।
সত্যি বলছ আসবে?
হ্যাঁ হ্যাঁ, সে আসবে! দু’দিন পরেই আসবে।
কিন্তু তা হলে সে পালাল কেন? অমন করে চোরের মতো রাজধানী ছেড়ে পালাল কেন?
নবাব আলিবর্দি খাঁ হা হা করে হাসলেন সেই আগের দিনের মতো। বললেন–নবাবি রাখতে গেলে যেমন লড়াই করতে হয়, তেমনি আবার লড়াই থেকে পালাতেও হয়। আমি পালাইনি? ভাস্কর পণ্ডিতের ভয়ে আমি পালিয়ে আসিনি? তোমার মনে নেই সে-সব দিনের কথা?
কিন্তু লড়াই থেকে পালানো আর চেহেল সুতুন থেকে পালানো কি এক কথা?
