কিন্তু একটা আশা ছিল এই যে লড়াই থেমে গিয়েছে। নবাব মুর্শিদাবাদ শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। নিজামতের বিষদাত ভেঙে গিয়েছে। এখন আর অত্যাচারের প্রকোপটা সাময়িকভাবে বাইরের প্রজাদের ওপর গিয়ে পড়বেনা। সেই সুযোগে ছোট বউরানিরা নির্বিবাদে নিজের দেশে গিয়ে হয়তো পৌঁছোত পারবে।
মহারাজা সকলকে পাঠাতে পেরে নিজের মনে কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। মানুষের সমাজে বা রাষ্ট্রে যখন দুর্যোগ আসে তখন ব্যক্তির সমস্যা দেশের কর্ণধারের কাছে ছোট হয়ে আসে। তখন মনে হয় বৃহত্তর মানুষের সমাজের মঙ্গল হবে কেমন করে। নবাব যে পালিয়ে গেল, এত অত্যাচারের স্রোতে বাংলাদেশের মানুষকে ভাসিয়ে দিয়ে গেল, তার শাস্তি তো হল না।
শাস্তি! শাস্তি কথাটা মনে পড়তেই মহারাজের মনে হল–কীসের শাস্তি? পাপের শাস্তি? ইতিহাসে আগে কি আর কোনও নবাব অত্যাচার করেনি? তাদের পাপের শান্তি কে দিয়েছে? বাব মুর্শিদকুলির পাপের শাস্তি কি হয়েছে? বাদশা আওরঙ্গজেবের পাপের শাস্তি কে ভোগ করেছে? কিংবা হয়তো পাপ পুণ্য বলে কিছুই নেই। ইতিহাসের চাকার তলায় পড়ে একজন খুঁড়িয়ে যায়, আবার কেউ একজন উঠে দাঁড়ায়। তাই-ই যদি হবে, তা হলে এ-পৃথিবী কোন আইনের সূত্র ধরে চলবে?
বাচস্পতি মশাইকে কথাটা একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন মহারাজ।
বাচস্পতি মশাই বলেছিলেন–পাপের শাস্তি তো সময় নগদ পাওয়া যায় না মহারাজ।
কিন্তু নগদ না-পাওয়া গেলে আমার প্রজাদের আমি কী বলে প্রবোধ দেব? তারা চাইবে ফলাফল। পুণ্যের ফলাফলও যেমন দেখতে চাইবে, পাপের ফলাফলও তেমনি দেখতে চাইবে। না দেখাতে পারলে সবাই যে শেষকালে অধার্মিক হয়ে উঠবে। রসাতলে যাবে সংসার। রাজ্য অরাজক হয়ে উঠবে।
বাচস্পতিমশাই বলেছিলেন সেই জন্যেই তো মহারাজ ঈশ্বরকে অদৃষ্ট বলা হয়েছে–আমরা সেই ঈশ্বরকেই ডাকব। ডেকে বলব–হে ঈশ্বর, তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা করো
না বাচস্পতিমশাই, যে ক্ষমা চায় সে দুর্বল, সে ভীরু! ক্ষমা চাইলে সে প্রার্থনা ঈশ্বরের কানে গিয়ে পৌঁছোবে না। বলতে হবে, আমাদের পাপ মার্জনা করো।
সত্যিই সেদিন যখন মহারাজ কৃষ্ণনগর ছেড়ে মুর্শিদাবাদের দিকে যাচ্ছিলেন তখন চারদিকের অবস্থা দেখে সেই কথাগুলোই মনে হচ্ছিল। সবেমাত্র তিন দিন আগে লড়াই শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু নদীর দু’পাশের ধানখেতগুলো খা খন্মছে, লাঙল পড়েনি। দু’পাশের গায়ের কুঁড়েঘরগুলোফাঁকা। এই পথ দিয়েই নবাবের ফৌজ একদিন লাবাগে গিয়েছিল, আবার এই পথ দিয়েই ফিরিঙ্গিদের সেপাইরা পেছনে পেছনে এসেছে।
তা একেই হয়তো বলে প্রায়শ্চিত্ত। পৃথিবীর পাপ যখন পাকার হয়ে ওঠে তখন তার প্রায়শ্চিত্তের বিধান হয়তো এই রকমই। যেখানে যত কিছু পাপ আছে, অত্যাচার আছে, অশান্তি আছে, অকল্যাণ আছে, এইরকম করেই হয়তো ঈশ্বর তা মার্জনা করেন। কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত মানুষই যে এক। তাই একজনের পাপ অন্য জনের প্রায়শ্চিত্ততে তার প্রতিবিধান হয়। পিতার পাপ পুত্রকে বহন করতে হয়। প্রবলের পাপ দুর্বলকে সহ্য করতে হয়। মানুষের একজনের পাপ সকলকেই ভাগ করে নিতে হয়।
জগৎশেঠজির বাড়িতে বসে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সেই কথাই বলছিলেন।
জগৎশেঠজির দুশ্চিন্তা কদিন ধরে কম ছিল না। এক-একদিন এক-এক রকম খবর এসে সমস্ত ওলটপালট করে দিচ্ছিল। যার টাকা আছে তারই চুরির ভয় থাকে, যার রাজ্য আছে তারই অরাজকতার ভয় থাকে। অথচ সমস্ত মুর্শিদাবাদের লোকরা কেন শহরময় অত ভিড় করছে? তাদের ভাবনা কীসের? জগৎশেঠজি একবার দিল্লিতে লোক পাঠিয়েছেন, আবার কাছারিতে গিয়ে বসেছেন। কিছুতেই শান্তি পাননি মনে। খবরটা তিনিও পেয়েছিলেন যে, ক্লাইভ এক-একটা কাজের জন্যে এক-একবার লোক পাঠাচ্ছে মুর্শিদাবাদে। ওটা ছুতো। ওটা অজুহাত। মরিয়ম বেগম নামে কোনও বেগমসাহেবা চেহেল্-সুতুনে আছে কিনা তা জানবার জন্য এত কৌতূহল সাহেবের নেই। আসলে জানতে চায় মুর্শিদাবাদের হাঁড়ির খবর। জানতে চায় ক্ষমতা নিয়ে ঝগড়া বেধে গেছে কিনা ভেতরে ভেতরে। ইয়ার লুৎফ খাঁ, মিরজাফর আলি, রাজা দুর্লভরাম–এদের মধ্যে ঝগড়া বাধার গুজবটা সত্যি কি না।
মহারাজ বললেন–আমি ভুল করেছিলাম জগৎশেঠজি, আমার মনে হচ্ছে ক্লাইভ সাহেবের মতলব খারাপ। বোধহয় নিজেই মসনদে বসতে চায় এখন
জগৎশেঠ বললেন–আশ্চর্য নয়, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম লোকটা চালাক
তা চালাক তো বটেই। নইলে কাজ শেষ হবার আগেই টাকা চেয়ে বসে! ভাবছে এখানে এলে যদি সবাই মিলে আমরা রুখে দাঁড়াই।
জগৎশেঠজি বললেন–সেই জন্যেই আমি খবর পাঠিয়েছি যেন এখুনি মুর্শিদাবাদে না এসে পড়েন, তাতে খুন হয়ে যাবার ভয় আছে। লিখে দিয়েছি ক্লাইভকে খুন করবার জন্যে শহরে ষড়যন্ত্র চলছে বলে খবর পেয়েছি।
কিন্তু এমন করে ক’দিন আর অপেক্ষা করে থাকবে সাহেব?
জগৎশেঠজি বললেন–তা জানি না। তবে আমি দিল্লিতে তোক পাঠিয়েছি, তার কাছ থেকে খবর পাবার আশায় বসে আছি
কিন্তু সে তো তিন মাস লাগবে সেখান থেকে খবর আসতে।
হঠাৎ বাইরে ভিখু শেখের গলার আওয়াজ পেয়ে দুজনেই অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। কেউ এল নাকি? আজকাল যে-কোনও মুহূর্তে যে-কোনও ঘটনা ঘটতে পারে। কখন যে ফৌজের লোকরা বিদ্রোহ করে ওঠে বলা যায় না। নবাব নেই, সব লুঠপাট করে ফেলতে পারে। খবর রটে গেছে যে, মেহেদি নেসার চেহেল্-সুতুনের মালখানা লুঠ করতে গিয়েছিল। নানিবেগমসাহেবা বাধা দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। মালখানার ভেতরে এখনও অনেক সোনা হিরে মুক্তো আছে। একবার মালখানা লুঠ করতে পারলে আর কোনও ভাবনা নেই।
