কে?
দুর্গা আঁচলের আড়াল দিয়ে মরালীকে নিয়ে আসছিল। বললে–দূর মুখপোড়া, চেঁচাচ্ছে দেখো, তোকে বলে গেলাম না–
তারপর মাধব ঢালির পাশ দিয়ে যাবার সময় বললে–সরে দাঁড়াতে পারিসনে, মেয়েমানুষের গায়ে ঢলে পড়বি নাকি মুখপোড়া
তখনও ভেতরের বারমহলের উঠোনে ঢোকেনি। হঠাৎ মনে হল যেন ঘোড়র পায়ের শব্দ কানে এল। দুর্গা মরালীকে আড়াল করে বুড়োশিবের মন্দিরে এসে দাঁড়াল। তারপর একবার চারদিকে চেয়ে নিয়ে পা বাড়াল। অতিথিশালার ভেতরে কেউ আছে কি না কে জানে। ভোগবাড়ির দিকেও সমস্ত অন্ধকার। দক্ষিণ দিকের দরজাটা খোলা রেখেছিল দুর্গা। সেটা পেরিয়ে ভেতরবাড়ির ছোট গড়বন্দি। সেখানে তখনও টিমটিম করে আলো জ্বলছিল।
দুর্গা বললে–আয়, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আয়, কেউ দেখে ফেলবে—
মরালী বললেও কীসের শব্দ দুগ্যাদি? ছোটমশাই বুঝি?
দূর, ছোটমশাই তো মহিমাপুর গেছে
কেন?
দুর্গা বললে–ডিহিদারের পরওয়ানা এসেছে
কীসের পরওয়ানা?
তা জানিনে, তুই চুপ কর, কেউ জানতে পারলে তুইও মরবি আমিও মরব–
তারপর কয়েকবার ঝনঝন করে দরজার হুড়কো খোলার শব্দ হল। আলো, ফিসফিস কথা, হাঁক-ডাক, সিঁড়িতে ওঠা-নামা। অন্ধকার সিঁড়ির তলায় একটা ঘরে মরালীকে পুরে দিয়ে দুর্গা বললে–এখানে থাক তুই, আমি দরজায় তালা চাবি দিয়ে যাচ্ছি, কিচ্ছু ভাবিসনে, আমি এক্ষুনি আবার আসব—
*
মেহেদি নেসার খানদানি লোক। তামাম মুর্শিদাবাদে মেহেদি নেসারের নাম জানে না, এমন মানুষ পাবে না। মেহেদি নেসার মানেই খেলাত মির্জা মহম্মদ নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা। যারা নেহাত গরিব মানুষ, তারা নবাব পর্যন্ত পৌঁছোতে পারে না। শুধু নবাব কেন, নবারের কাছারি পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে না। কারও বাড়িতে চুরি হয়েছে, কারও স্বামীকে কোতোয়াল গ্রেপ্তার করেছে, দারোগা-ই-আদালতে গিয়ে ফরিয়াদ কবুল করতে হবে। কিন্তু তার আগে টাকা দাও। টাকা দিলে তবে তোমার আর্জি পেশ হবে। আর কত টাকা দিতে হবে, তারও আইন কায়েম আছে নিজামত-কাছারিতে।
সেরেস্তায় গেলেও সেই একই নিয়ম। খাসনবিশ থেকে শুরু করে পরগনা কানুনগো আর পেশকার মুনশি মোহরার পর্যন্ত সবাই বাঁ হাতটা পেতেই বসে আছে। বলে টাকা দাও তবে খালাস দেব।
লোকে মিনতি করে বলে–জনাব, আগে আর্জিটা তো নেন, তার পরে আপনার পাওনা-গণ্ডা যা লাগে দেব
হুজুর-নবিশরা চটে যায়। বলে–পাওনাগণ্ডা আবার বাকিতে চলে নাকি?
গরিব প্রজারা তবু পীড়াপীড়ি করে, বলে পরে দেব হুজুর, পরে দেব, এবার খেতের ধান বেচেই আপনার পাওনা-গণ্ডা মিটিয়ে দেব
কিন্তু এত ল্যাঠায় দরকার কী! সোজা যদি কোনওরকমে মেহেদি নেসারকে ধরতে পারো তো তুমি যা চাও, তাই পাবে। আকাশের আফতাব থেকে শুরু করে ইদের চাঁদ পর্যন্ত আদায় করে দিতে পারে মেহেদি নেসার। আর যদি মেহেদি নেসার পর্যন্ত না পৌঁছোতে পারো তো সেরেস্তার মুনশি মোহরার মনসুর আলি মেহের সাহেব পর্যন্ত পৌঁছোত পারলেই চলবে। আর যদি তা-ও না পারো তো বশির মিঞা আছে। বশির মিঞার ফুপা মনসুর আলি মেহের। বশির মিঞা চেষ্টা করলেও তোমার আর্জি হাসিল করতে পারে।
আসলে নবাব-নিজামতে কেতাদুরস্তের কোনও কমতি নেই। পাঠানদের সময়ে যা-থাক তা-থাক, কিন্তু মোগল আমলে কানুন কায়দার সবকিছু আছে। নায়েব সুবাদার আছে, দারোগা-ই-আদালত আছে, সিপাহশালার আজম আছে, খাসনবিশ, হুজুরনবিশ, দারোগা কাছারি, আমিন কাছারি, ফৌজদার, থানাদার, ডিহিদার, কোতোয়াল, কোতোয়াল-ই-দাগ সবই আছে। কিন্তু এসব ডিঙিয়েও তুমি আর্জি হাসিল করতে পারো, যদি মেহেদি নেসার তোমার সহায় হয়। মেহেদি নেসারের সবচেয়ে বড় গুণ, সে খেলাত মির্জা মহম্মদের ইয়ার। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার দোস্ত।
মেহেদি নেসার খুশি হলে হুকুম তো হুকুম, হাকিমও নড়ে যায়।
সেই মেহেদি নেসারের কাজের মধ্যে কাজ সকালবেলা নাস্তা করেই মির্জা মহম্মদের সঙ্গে মোলাকাত করা। আর যতদিন বুড়ো আলিবর্দি বেঁচে ছিল, ততদিন তো মেহেদি নেসারকে কেউ পরোয়া করেনি। কিন্তু এখন? এখন তামাম দুনিয়ার দৌলত মেহেদি নেসারের মুঠোর মধ্যে। এখন মেহেদি নেসারের এক কথায় জমিদারদের নসিব ওঠে আর নামে।
মুর্শিদাবাদের রাস্তায় মেহেদি নেসারের পালকি চলেছে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে। বেহারারা হুম হাম করতে করতে চলেছে। সামনে তোক দেখে হাঁকে হুঁশিয়ার
মেহেদি নেসার সারা রাত মহফিল করেছে কাল। ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে খানাপিনা করেছে। কিন্তু মহফিল তেমন জমেনি। জুতসই হয়নি নেশাটা। মির্জার মাথায় যত বদ ভাবনা ঢুকেছে। মেহেদি নেসার মির্জাকে বলেছে–আরে এখন তুই গদি পেয়েছিস, এখন কাকে ডরবি তুই? ওই ফিরিঙ্গিদের? তুই অত ডরপোক কেন রে? আমাকে বল, আমি ওই শালা উমিচাঁদকে শায়েস্তা করে দিচ্ছি। ও শালা দুমুখো সাপ। ও তোরও খাবে, ফিরিঙ্গিদেরও খাবে। ওকে আমি এখুনি ঢিট করে দিতে পারি। ফুর্তির সময় ওসব কথা ভাবিসনি, ওতে টাকাও নষ্ট, মহফিলও নষ্ট
নাচ হয়েছে, পান হয়েছে, সরাব হয়েছে। তবু মির্জার মন ওঠেনি।
মির্জা বলেছে–এবার খতম করে দে ইয়ার, ঘুম পাচ্ছে
ঘুম পাচ্ছে? সেকী রে? বাংলা মুলুকের নবাব ঘুমোবে কী রে? তোরই তো দুনিয়া। দিল্লির বাদশা তো তোর কাছে জবাবদিহি চাইছে না। খাজনা পাঠাতেও বলছে না। আর আলিবর্দি খাঁ কখনও দিল্লির দরবারে খাজনা পাঠিয়েছে? এখন আলমগির বাদশা আছে দিল্লির তখত-এ-তৌস-এ যে ভয় পাচ্ছিস?
