সেদিন হঠাৎ খবর এল, ক্লাইভসাহেব আসছে।
তুই কী করে জানলি?
আমি যে দেখলুম ঘোড়ায় চড়ে একটা ফিরিঙ্গি সাহেব আসছে।
দুর বেল্লিক, ক্লাইভ সাহেব কি আর এলে একলা আসবে? তার সঙ্গে ফৌজ আসবে। সেপাই লাশকর সবাই আসবে।
সেদিন মেহেদি নেসার, ডিহিদার রেজা আলি সবাই এসে হাজির। মিরজাফর সাহেবের সঙ্গে সবাই পরামর্শ করতে এসেছে। শহরে কাজকর্ম সব বন্ধ, রাস্তাঘাট পরিষ্কার হয় না। মেথররা কেউ খানাখন্দ পরিষ্কার করে না। দুর্গন্ধ জমছে নর্দমায়। শেষকালে মড়ক শুরু হবে।
নবাবের কিছু খবর পাওয়া গিয়েছে?
মেহেদি বললে–আমি চর পাঠিয়েছি সব জায়গায়
চেহেল্-সুতুনের খবর কী?
মালখানায় তালা-চাবি দিতে গিয়েছিলাম, তাতে নানিবেগমসাহেবা আমাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলে। বললে–চেহেলসতুনের মালখানার টাকাও আমার
তুমি কী বললে?
মেহেদি বললে–আমি শাসিয়ে এলাম। বললাম–মিরজাফরসাহেবকে গিয়ে আমি সব বলছি। কিন্তু নানিবেগমসাহেবাকে তো কিছু বলতে পারি না। শেষে হয়তো মালখানা লুঠপাট করে সব টাকাকড়ি সকলকে বিলিয়ে দেবে
মিরন বললে–আগে মালখানাটা আমাদের নিতে হবে! ওতে অনেক টাকা আছে
মিরজাফর বললে–আগে ক্লাইভসাহেব আসুক, এখন কিছু কোরো না
ফটকের বাইরে তখন ওয়ালস্ সাহেব এসেছে। খবর পেয়েই মিরুন দৌড়ে নীচেয় গেছে।
আসুন হুজুর, আসুন।
মিরজাফর সাহেবও দাঁড়িয়ে উঠল। চার দিন পরে একটা খবর অত পাওয়া যাবে। সাহেব সামনে আসতেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলে–কী খবর? কর্নেলসাহেব কেমন আছে? খয়রিয়ত তো?
ওয়ালস বললে–আমি একটা খবর নিতে এসেছি। কর্নেলসাহেব জানতে পাঠিয়েছে।
মিরন বললে–আমরাও তো বসে আছি ক্লাইভ সাহেবের জন্যে। তিনি আসতে এত দেরি করছে কেন? টাকা পাঠানো হয়নি বলে গোঁসা করেছেন নাকি?
মিরজাফর বললে–আমরা তো বলেছি টাকা দেব। তিনি নিজে এলে সব ব্যবস্থাই হবে।
ওয়ালস্ বললে–না, সে জন্যে নয়, কর্নেল আমাকে জানতে পাঠিয়েছে চেহেল্-সুতুনে মরিয়ম বেগম বলে কোনও বেগমসাহেবা আছে কিনা
মরিয়ম বেগম? আগে ছিল, এখন তো নেই!
নেই?
মেহেদি নেসার এতক্ষণে কথা বললে। বললে–মরিয়ম বেগম? মরিয়ম বেগম সাহেবার খবর চেয়েছে ক্লাইভসাহেব? কেন?
ওয়াল বললে–তা জানি না। জরুরি খবর চেয়েছে কর্নেল।
মিরজাফর সাহেব মেহেদি নেসারের দিকে চাইলে। বললে–তুমি তো চেহেল্-সুতুনের ভেতরের খবর রাখো? মরিয়ম বেগম বলে কেউ আছে?
ডিহিদার রেজা আলি বললে–আছে, আমি জানি
ওয়ালস বললে–আছে? তা হলে আমি সেই কথা কর্নেলকে গিয়ে বলি?
ওয়ালস আর দাঁড়াল না। কিন্তু সে চলে যাবার পরেই মিরজাফর আলি সাহেবের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। কর্নেল সাহেব এই সেদিন টাকা চেয়ে পাঠিয়েছিল, এখন আবার বেগম সাহেবার খবর চেয়ে পাঠাল কেন? নিশ্চয় কোনও মতলব আছে। মরিয়ম বেগমসাহেবা কে?
মেহেদি নেসার বললে–আমি বুঝেছি।
কী বুঝেছ?
মরিয়ম বেগম হচ্ছে হাতিয়াগড়ের জমিদারের বউ। নবাব তাকে হাতিয়াগড় থেকে চেহেল্-সুতুনে এনেছিল। আমার মনে হয় হাতিয়াগড়ের জমিদার এর মধ্যে আছে।
মিরন বললে–ঠিক আছে, আমি তার ব্যবস্থা করছি
কী ব্যবস্থা করবে?
মেহেদি নেসার বললে–আমি তার ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছি, আমি তাকে চেহেলসূতুনে নজরবন্দি করে রেখেছি
মিরজাফর সাহেব বললে–তা যদি কর্নেলসাহেব মরিয়ম বেগমসাহেবাকে পেলে খুশি তো শুধু মরিয়ম বেগমসাহেবা কেন, চেহেল সুতুনে মির্জা মহম্মদের যত বেগম আছে সকলকে দিয়েই কর্নেলকে খুশি করব
২.১৭ রাজমহলের ঘাটে দুর্গা
রাজমহলের ঘাটে দুর্গা তখন মুখ হাত-পা ধুয়ে নিয়ে খাবার বন্দোবস্ত করেছে। রাজমহল থেকে নৌকো ছেড়ে আবার যাত্রা করতে হবে। এখান থেকে ছেড়ে হাতিয়াগড়ে পোঁছোতে আর বেশি সময় লাগবে না।
তবু ছোট বউরানি তাগাদা দিয়েছে দুর্গাকে। বলেছেওরে দুর্গা, ওরা দেরি করছে কেন? কখন নৌকো ছাড়বে?
দুর্গা বললে–দাঁড়াও গো ছোট বউরানি, একটু জিরোতে দাও, সারারাত নৌকো বেয়েছে, একটু জলটল খেয়ে নেয় ওরা? ওরাও তো মানুষ, না কী।
আর যেন তর সইছে না ছোট বউরানির। সেই কবে বেরিয়েছে হাতিয়াগড় থেকে, মনে হয় যেন কত বছর। এমন করে যে বিপদ কাটবে, কে জানত।
হঠাৎ পাশের নৌকোর ঝিঈ দুর্গার কাছে এল। বোরখা-পরা মূর্তি মুখের ঢাকনাটা তুলে বললে–মা, তোমাদের কাছে একটু দুধ হবে?
দুধ? দুধ কী হবে বাছা?
ঝি-টা বললে–আমার বিবির ছোট মেয়েটার খিদে পেয়েছে, একটু দুধ,পেলে ভাল হত তাই জিজ্ঞেস করছি।
তোমার মালিক কে? কোথায় যাচ্ছে?
আমার মালিক পলাশপুরের তালুকদার।
তা রাজমহলেই নামবে নাকি?
না মা, এখান থেকে যাবে আজিমাবাদে। সেখানে ফকিরের দরগায় দোয়া মানতে যাচ্ছে।
তা সঙ্গে ছোট মেয়ে রয়েছে, দুধ আনতে হয় তো। দুধ আমরা কোথায় পাব?
ঝি-টা আর দাঁড়াল না। ডাঙার ওপর পলাশপুরের তালুকদার আর তার বিবি ছোট মেয়েটাকে কোলে করে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই দিকেই চলে গেল।
আসলে জায়গাটা রাজমহল নয়। নৌকো দুটো ভিড়েছিল রাজমহলের উলটো দিকের ঘাটে। বড় নিরিবিলি জায়গাটা। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র উপযুক্ত লোকের হাতেই ছোট বউরানিদের পাঠিয়েছিলেন। কথা ছিল হাতিয়াগড়ে পৌঁছিয়ে দিয়েই তারা আবার যথাসময়ে ফিরে আসবে। তবু দিনকাল বড় খারাপ। চারদিকে অরাজক অবস্থা। তাই মহারাজ যাত্রার আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন–চারদিক বুঝেসুঝে তবে যাবে, অনেক দূরের রাস্তা, কাউকে বিশ্বাস করবে না
