কিন্তু কর্নেল যুদ্ধের খরচা হিসেবে মিরজাফরের কাছে এখনকার মতো দু’কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা চেয়ে পাঠিয়েছিল। মিরজাফর বলে পাঠিয়েছে টাকা নেই। এমনকী লোন হিসেবেও টাকাটা যদি জগৎশেঠজির কাছে পাওয়া যায় তাও বলে দিয়েছিল কর্নেল, তাতেও জগৎশেঠজি দিতে রাজি হয়নি।
ঠিক আছে, উমিচাঁদ সাহেব বললে–ঠিক আছে, কুছ পরোয়া নেই, কর্নেলসাহেব বুঝি সেই ভাবনায় অস্থির হয়েছে? আচ্ছা, আমি নিজে গিয়ে সাহেবকে অভয় দিয়ে আসছি, কুছ পরোয়া নেই। নবাবের টাকা তো সাহেবের একলার টাকা নয়, আমারও তো ভাগ আছে সে টাকাতে। সাহেবের সঙ্গে কড়ার আছে তিরিশ লাখ টাকা আমার পাওনা, নইলে আমি যে মারা যাব রে বাবা
বলে ক্লাইভ সাহেবের ঘরের দিকে এগিয়ে চলল। মেজর কিলপ্যাট্রিক তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে উমিচাঁদের খবরটা দিতে গেল কর্নেলকে।
নবকৃষ্ণ তাড়াতাড়ি গিয়ে ধরল উমিচাঁদ সাহেবকে।
হুজুর, একটা কথা ছিল
উমিচাঁদ চলতে চলতে থেমে গেল। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে বললে–কী?
একটা কাণ্ড শুনেছেন? সাহেবের কাণ্ড! সাহেব এখানে এসেও একটা মেয়েমানুষের ফাঁদে পড়েছেন!
সেকী? সে-রোগ এখনও আছে? মেয়েমানুষটা কে?
কে জানে হুজুর! পেরিন সাহেবের বাগানে যে ছিল সে নয়। এ আলাদা। আজকে এসেছে। নতুন আমদানি হয়েছে। বেটাছেলের মতন জামাকাপড় পরা ছিল, আসলে মেয়েমানুষ।
কিন্তু মেয়েমানুষটা কে? নাম কী? কোথাকার?
তা জানি না হুজুর। ঘরের মধ্যে রয়েছে। তার জন্যে আবার তাঁতিপাড়া থেকে শাড়ি কিনিয়ে অনালেন এখন সাহেব।
উমিচাঁদ ভাবনায় পড়ল। এই ফাঁকা মাঠের মধ্যে সেপাইদের ছাউনিতে আবার মেয়েমানুষ কোত্থেকে এল।
ততক্ষণে মেজর কিলপ্যাট্রিক ওদিক থেকে ডাকলে–আসুন উমিচাঁদসাহেব, আসুন
*
মূল কথা কিন্তু মেয়েমানুষ নয়। মূল কথা সেই টাকা। দু’কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা না পেলে যেন ফিরিঙ্গি কোম্পানির সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি উসূল হবে না। ১৭৫৭ সালের সেদিনকার সেই বাংলা মুলুকেও চরম প্রশ্ন হল টাকা। নবাব সিরাজউদ্দৌল্লাকে টাকার প্রয়োজনেই ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াইতে নামতে হয়েছিল, আবার টাকার প্রয়োজনেই ফিরিঙ্গি কোম্পানিকে সাত সমুদ্র-তেরো নদী পেরিয়ে এসে বাংলা মুলুকের মসনদ কেড়ে নিতে হয়েছিল। উমিচাঁদ নন্দকুমার থেকে শুরু করে বশির মিঞার মতো খুদে চুনোখুঁটিটাও এই টাকার জন্যেই দল বেঁধে নবাবকে ছেড়ে ফিরিঙ্গিদের দলে ভিড়েছিল।
মনসুরগঞ্জ হাবেলির সামনে নতুন পাহারাদারের আস্তানা বসেছে। তাদের বলে দেওয়া আছে সবাইকে যেন মিরজাফর আলি সাহেবের কাছে না ঢুকতে দেওয়া হয়।
মিরন হুঁশিয়ার ছেলে। আসলে সেই কদিন ধরে খুব মাতব্বরি করছে। মিরজাফর সাহেব নবাব হলে তারই মাতব্বরি করার কথা! পাহারাদাররাও তাই জেনে নিয়েছে।
কিন্তু পুরোপুরি সাহস তখনও হয়নি। রাজা দুর্লভরাম রয়েছে, ইয়ার লুৎফ খাঁ-ও রয়েছে। তারপর ঢাকায় সরফরাজ খাঁর ছেলে আমানি খা রয়েছে। তারপরনবাব মির্জা মহম্মদ কোথায় গিয়ে কী ষড়যন্ত্র করছে তারও ঠিক নেই। যদি আজিমাবাদের দিকে গিয়ে থাকে তো বিপদ। সেখানে জেনারেল ল’ সাহেবকে নিয়ে আবার যদি হুড়মুড় করে এসে পড়ে তখন কী হবে তা বলা যায় না।
স্বপ্ন দেখতে দোষ কী?
মিরন জিজ্ঞেস করে–টাকার কী হবে বাপজান?
মিরজাফর সাহেব বলে–টাকা দেব না
কিন্তু ক্লাইভসাহেবকে যে টাকা দেবার চুক্তি হয়েছে?
মিরজাফর সাহেব বলে একবার নবাবি পেলে তখন দেখা যাবে। এখন টাকা কোথায় পাব?
তা বটে।কথাটা মনে লাগল মিরনের। একবার নবাবি পেয়ে গেলে তখন কি কেউ চুক্তির কথা মনে রাখে? তার চেয়ে অন্য কথা ভাবা ভাল। দরজা-জানালা বন্ধ মনসুরগঞ্জ হাবেলির মধ্যে রাত্রে শুয়ে শুয়ে মিরজাফর আলি সাহেব আর মিরন সাবধানে রাত কাটায়। বড় অশান্তিতে কাটছে কদিন। ফিরিঙ্গিদের এক কোটি টাকা দিতে হবে। আরমানিদের দিতে হবে সওর লক্ষ।
বাপজান।
রাত্রে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসে না মিরনের। হঠাৎ মাথায় একটা ভাবনা আসতেই আবার উঠে আসে বাবার কাছে। মিরজাফর সাহেবও তখন শুয়ে শুয়ে ভাবছে।
কী?
হঠাৎ যেন মুর্শিদাবাদের রাস্তায় চিৎকার ওঠে–আল্লা-হো-আকবর
মনে হয় যেন লক্ষ লক্ষ লোক একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। তবে কি খেপে উঠল সবাই? নাকি ইংরেজ ফৌজ এসে হাজির হল। কখনও চিৎকার ওঠে মতিঝিলের দিক থেকে, কখনও চকবাজারের দিক থেকে, কখনও আবার মহিমাপুরের দিক থেকে।
মিরজাফর বলে–তুই ঘুমো গে যা
ঘুম যে আসছে না।
সেই ২৪ জুন থেকেই ছেলে আর বাপের ঘুম নেই। আর শুধু তাদেরই বা কেন, সারা চেহেল্-সুতুনেরই ঘুম নেই। বলতে গেলে সারা মুর্শিদাবাদেরই ঘুম নেই। চারদিকে চর ছুটছেনবাবকে খুঁজতে। ঢাকাতেও লোক পাঠিয়েছে আমানি খা’র খবর আনতে। আজিমাবাদের দিকেও লোক গেছে। জেনারেল ল’সাহেব আসছে নাকি? জগৎশেঠজির কাছেও আর্জির সীমা নেই। টাকাটা দিয়ে দিলেই হয়। কেউ এসে পড়বার আগেই একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলে হয়।
সুজা উল মুলক হিসাম-উ-দ্দৌলা মিরজাফর আলি খাঁ বাহাদুর মহবত জঙ।
খেতাবটা শুনতে ভাল। মিরজাফর আলি খেতাব নিয়েছে মহবত জঙ, আর মিরন খেতাব নিয়েছে শাহামত জঙ!
ফটকের পাহারাদাররা দেখা হলেই সেলাম করে। আগেও সেলাম করত, কিন্তু এখন মনে হয় ভিখু শেখ যেমন করে জগৎশেঠজিকে সেলাম করে তেমনি করে এরাও সেলাম করছে মিরনকে।
