ওয়ালস কথাটা বুঝতে পারলে না। মিরজাফর খাঁ টাকা দিতে রাজি হচ্ছেনা, জগৎশেঠ পর্যন্ত তাদের বিশ্বাস করছে না। সেই কথাটাই আগে ভাবা দরকার। তা নয়, কোথাকার হারেমের মধ্যে কোন মেয়েমানুষ রয়েছে, খবর এত কীসের জরুরি হল কর্নেলের কাছে।
সামনেই মুনশি বসে ছিল। ওয়ালস্ সাহেবকে আসতে দেখেই দাঁড়িয়ে উঠল। বললে–কী হল সাহেব, মালিক কী বললে?
ওয়ালস জিজ্ঞেস করলে–তুমি এখনও বসে আছ?
মুনশি বললে–বা রে, মালিক কি আমাকে চলে যেতে বলেছে যে চলে যাব? টাকাকড়ির কী ব্যবস্থা হল? এমাসের মাইনেটা যে এখনও পেলুম না।
মাইনে? খেপে গেল যেন ওয়ালস্ সাহেব! মাইনে বুঝি তুমি একলাই পাওনি, আর আমরা বুঝি পেয়েছি ভেবেছ?
মুনশি অবাক হয়ে গেল আপনারাও পাননি হুজুর?
আরে না, আমরা কেউই পাইনি। পাব কোত্থেকে? আসছে মাসেও পাও কিনা তাই দেখো মুনশি। কোম্পানির ভাঁড়ারে যা কিছু টাকাকড়ি ছিল সমস্ত তো লড়াইয়ের পেছনে খরচ হয়ে গেছে।
তা নবাবের টাকা তো আসছে। শুনলাম যে নবাবের টাকা পেলে সকলকে কড়ায়-গভায় মিটিয়ে দেওয়া হবে?
সে টাকা কি আছে ভেবেছ? নবাব কি আর তা ফেলে রেখে গেছে? যা-কিছু ছিল তাও তো যাকে পেরেছে তাকে দুহাতে বিলিয়ে দিয়ে গেছে।
কিছু নেই?
অনেক আশা করেছিল নবকৃষ্ণ। এই মাইনেটার জন্যেই বলতে গেলে অত দূর থেকে এখানে এসেছিল। কিন্তু তাও যদি না পাওয়া যায় তো কী হবে! টাকার জন্যেই সাহেব কোম্পানির চাকরিতে ঢোকা। টাকার জন্যেই ম্লেচ্ছদের ছোঁয়া খাওয়া। টাকাই তো সব মা! মা, তুমি তো স্বপ্ন দিয়েছিলে আমি অনেক টাকার মালিক হব, অনেকে আমায় হাত দেখেই তাই বলেছে। কিন্তু কোথায় টাকা? টাকার নামগন্ধও যে দেখতে পাচ্ছি না।
ওদিকে সেপাইদের ছাউনি। ক’দিন ধরে বড় ধকল গেছে সকলের। তাই সবাই গড়িমসি করছে। মুনশি একবার সেদিকে গেল। সেপাইরা সবাই চেনে মুনশিকে। মুনশির মাথার টিকি ধরে টানে মাঝে মাঝে। বলে–এটা কী গো মুনশি?
মুনশি বলে–ওতে হাত দিয়ো না বাবারা, ওতে হাত দিয়েছ কী তোমাদের পাপ হবে।
পাপ? পাপ মানে?
পাপ মানে পাপ! যাকে বলে পাতক। তোমরা তো বাবা অনেক পুণ্য করেছ তাই ফিরিঙ্গি হয়ে জন্মেছ, আর আমরা হিন্দু হয়ে জন্মে ভুগে ভুগে মরছি। এই দেখোনা, কোথায় সুতোনুটি, সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসছি দুটো টাকার জন্যে। এটা পাপ নয়? উটি ছুঁলে তোমাদেরও বাবা আমার মতন টাকার জন্যে হা-হতোশ করতে হবে!
হঠাৎ ওদিক থেকে একটা পালকি আসার হুমহাম শব্দ হল। সবাই হাঁ করে চেয়ে রইল। পালকি করে আবার কে আসে? কে?
বেশ চটকদার পালকি বটে! খানদানি লোক হবে কেউ! আট বেহারার পালকিটা একেবারে সোজা কর্নেলসাহেবের ঘরের দিকে যাচ্ছিল।
মেজর কিলপ্যাট্রিক সাহেব দেখতে পেয়েই দৌড়ে এসেছে।
কে?
পালকিটা থামল। ভেতর থেকে নামল উমিচাঁদ সাহেব। মেজর সাহেবকে দেখে জিজ্ঞেস করলে কর্নেলসাহেব কোথায়?
ক্যাম্পে আছেন।
তা হলে একবার যে খবর দিতে হবে আমি এসেছি। ওদিকের সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। তোমাদের কোনও ভাবনা নেই। তবু একবার দেখা করতে এসেছি। নইলে তোমাদের কর্নেল ভাববে আমাদের গাছে তুলে দিয়ে গিয়ে শেষকালে মই কেড়ে নিলে উমিচাঁদসাহেব। আমি সেরকম লোক নই হে, সেরকম লোকনই। নইলে আমাকে আর এতদিন কারবার করে খেতে হত না।
মেজর বললে–ওদিকের খবর কী?
কোনদিকের? শুনেছ তো নবাব পালিয়ে গেছে?
সেটা করলে কে? আপনি?
সে-খবরও এখনও পায়নি কর্নেল? এই উমিচাঁদকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তোমরা তো শুধুলড়াই করেই খালাস। কিন্তু শুধু বন্দুককামান দেগেই তো লড়াইতে জেতা যায় না, তার সঙ্গে সঙ্গে কূটনীতি চালাতে হয়। এ কদিন অনেক খাটাখাটনি গেছে। এ কদিন নাওয়া-খাওয়া বন্ধ ছিল আমার। এখন সব শেষপর্যন্ত ভালয় ভালয় চুকল, তাই কর্নেল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এলাম,নইলে আবার মনে মনে ভাববে–
হঠাৎ মুনশিকে দেখতে পেলো নবকৃষ্ণ ততক্ষণে একেবারে উমিচাঁদ সাহেবের পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে ফেলেছে।
কী গো, নবকেষ্ট কেমন আছ? চাকরি কেমন চলছে?
আজ্ঞে, আপনার কৃপায় ভালই আছি। কিন্তু…
কিন্তু আবার কী?
আজ্ঞে, এমাসের মাইনেটা পাইনি, তাই মালিকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, আপনি যদি একটু বলে দেন–
উমিচাঁদ যেন রেগে গেল–আরে, তোমার ভারী ক’টা টাকা মাইনে, তার জন্যে আবার ভাবনা করছ? সাহেব কি পালাচ্ছে? এই সবে লড়াই মিটল, এরপর নবাবের সম্পত্তির বিলিব্যবস্থা হোক, তবে ততা! তোমার তো সবে ওইটা টাকা পাওনা, আমার যে লাখ লাখ টাকা পাওনা পড়ে রয়েছে, আমার কথাটা ভাববা দিকিনি একবার!
মুনশি বললে–আজ্ঞে, শুনছি নাকি নবাব সব টাকাকড়ি নিয়ে পালিয়েছে
উমিচাঁদ হো হো করে হেসে উঠল–আরে তুমিও যেমন পাগল,নবাবের অত টাকা সব কি সঙ্গে নিয়ে পালানো যায়? অত টাকা বইতে গেলে কুড়িটা হাতি লাগবে, তা জানো?
তবে যে ওয়ালসাহেব ফিরে এসে বললেন টাকা নেই কিছু! মিরজাফরসাহেব বলেছে। সব টাকাকড়ি যা ছিল সব নাকি যাবার আগে হরির লুঠ করে দিয়ে চলে গেছে নবাব।
মেজর সাহেব পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। উমিচাঁদ তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলে-তাই নাকি?
মেজর বললে–হ্যাঁ
স্রেফ বাজে কথা! আমার কথায় বিশ্বাস করো, সব স্রেফ বাজে কথা। তা হলে আমি আমার এই নাক কান কেটে ফেলব, এই বলে রাখলুম। অন্তত নবাবের চেহেলসূতুনের মালখানা খুললে তার ভেতরে কুড়ি কোটি টাকা পাওয়া যাবে!
