ও ছোট বউরানি, ওই দেখো, কাদের আবার একটা নৌকো এসে লাগল।
কাদের?
দুর্গা বললে–কে জানে কাদের! মনে হচ্ছে মোছলমানদের
ছোট বউরানিও চেয়ে দেখলে জানালা দিয়ে।
বউটা খুব সুন্দর, না রে দুর্গা? ওমা, একটা ছোট মেয়েও রয়েছে সঙ্গে। কোথায় যাচ্ছে বল তো?
মাঝিকে ডেকে দুর্গা জিজ্ঞেস করলে–হ্যাগো বাছা, ওরা কারা এল গো?
মাঝিটা বললে–ওরা পলাশপুরের লোক, আজিমবাদে ফকির সাহেবের দরগায় দোয়া নিতে যাচ্ছে। মোছলমান মা ওরা
ও, তাই বলো!
তারপর চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। বউটা সুন্দরী বটে। পায়ের গোড়ালিটা একেবারে দুধে-আলতায় ধপধপ করছে। সঙ্গের বেটাছেলেটার চেহারাও বেশ। মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বউটা স্বামীর সঙ্গে ডাঙায় উঠল।
*
ক্লাইভ সাহেব বাইরে আসতেই মুনশি নবকৃষ্ণ বললেও কে, হুজুর?
ক্লাইভ সাহেব বললে–সে তোমার জেনে দরকার নেই মুনশি, তুমি এখন যাও এখান থেকে
নবকৃষ্ণ বুঝতে পারলে ব্যাপারটা। আস্তে আস্তে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। তারপর সাহেব অর্ডার্লিকে ডাকলে। বললে–ওই যে বুড়োমতন একটা লোককে ধরা হয়েছে, ওর নাম ইব্রাহিম খাঁ, ওকে ছেড়ে দিতে বল।
অর্ডার্লি চলে যাচ্ছিল, ক্লাইভ সাহেব আবার ডাকলে–শোন, আরময়দপুরে যদি কোনও ততির বাড়ি থাকে, সেখান থেকে দু’চারটে শাড়ি কিনে আনতে বলে দে। বেশ ভাল কোয়ালিটির শাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি যা
ক্লাইভ সাহেব ঘরের ভেতরে এল আবার। মরালী তখনও তেমনি করে দাঁড়িয়েই আছে।
সাহেব বললে–তারপর?
মরালী বললে–আমি তো আপনাকে সব কথাই বললুম। এখন আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন। ওই ইব্রাহিম খাঁ না থাকলে আমি হয়তো চেহেলসুতুন থেকে পালাতেই পারতুম না। কিন্তু মরিয়ম বেগম সেজে সেই কান্ত এখনও সেই চেহেল্-সুতুনেই হয়তো আছে। আমার ইচ্ছে আপনি তাকে উদ্ধার করে আনুন।
কিন্তু মুর্শিদাবাদে যেতে তো আমার দেরি হবে।
কেন?
জগৎশেঠজি আমাকে চিঠি দিয়েছে যে কয়েকজন আমাকে খুন করবার মতলব করেছে। আমি স্পাই লাগিয়েছি, তারা কী খবর দেয় তাই জানবার জন্যে এখানে কিছুদিন থাকব ঠিক করেছি। আমি তোমার জন্যে এখানকার তাঁতিদের বাড়ি থেকে শাড়ি কিনে আনতে বলেছি, তোমার কিছু ভাবনা নেই।
কিন্তু কেউ যদি আমাকে চিনতে পারে? চিনতে পারলে যে সবাই ছিঁড়ে খাবে–
ক্লাইভ সাহেব বললে–সে-ভয় তোমার নেই। আমার নাম রবার্ট ক্লাইভ।
মরালী ভাল করে চেয়ে দেখলে। আগের বারে যখন বাগবাজারে পেরিন সাহেবের বাগানে দেখেছিল তখন অন্য চোখ ছিল মরালীর। এখন এতদিন পরে মরালীর চোখও বদলে গেছে, ক্লাইভ সাহেবের চোখও বদলে গেছে। ক্লাইভ সাহেবও আজ যেমরিয়ম বেগমকে দেখছে এ সে মরিয়ম বেগম নয়।
ক্লাইভ বললে–লড়াইতে যারা ধরা পড়ে তাদের কী করা হয় তা জানেন তো বেগমসাহেবা?
আপনারা তো আমাকে বন্দিই করেছেন।
হ্যাঁ, বন্দিই করেছি। তবু আপনি বেগমসাহেবা বলে আপনার জন্যে আমি শাড়ি সালোয়ার কামিজ যা পাওয়া যায় আনতে হুকুম দিয়েছি। আপনার কথায় আমি আপনার সঙ্গের লোকটাকেও ছেড়ে দেবার হুকুম দিয়েছি।
তার জন্যে আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার জন্যে তো আমি ভাবছি না। আমার যা হয় হোক, আমাকে আপনি খুশি হলে ফাঁসিও দিতে পারেন, আমার কোনও ক্ষোভ থাকবে না। কিন্তু চেহেল্-সুতুনের মরিয়ম বেগমকে আপনি দয়া করে উদ্ধার করে আনুন
ক্লাইভ অবাক হয়ে গেল।
মরিয়ম বেগম? আপনি নিজেই তো মরিয়ম বেগম, চেহেল্-সুতুনে কি আরও একজন মরিয়ম বেগম আছে?
হ্যাঁ!
আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে আপনি আবার সেবারের মতো আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে চাইছেন। কিন্তু বেগমসাহেবা, আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, আপনার যদি মনে হয়ে থাকে যে মেয়েদের ওপর আমার উইকনেস আছে, তা হলে আপনি ভুল করেছেন। আমি যেমন নরম হতে পারি তেমনি আবার পাথরের মতো শক্তও হতে পারি। আমি যদি এখনই হুকুম করি তো আমার সোলজাররা। এখনই আমার চোখের সামনে আপনার মাংস ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে খাবে, আমার তাতে কোনও কষ্ট হবে না। তাই চান আপনি?
মরালী চুপ করে রইল।
পেছনে আর্দালিটা বাইরে থেকে ডেকে শাড়িগুলো এনে দিলে। ক্লাইভ শাড়ি নিয়ে বললে–আপনি এটা পরুন, আমি আবার আসব। কিন্তু খবরদার, পালাবার চেষ্টা করবেন না। তাতে আদারই ক্ষতি হবে।
বলে বাইরে এসে মেজর কিলপ্যাট্রিককে ডেকে পাঠালে। বললে–মুর্শিদাবাদে ওয়ালসকে পাঠাও–সে যেন খবর নিয়ে আসে মুর্শিদাবাদের নবাবের হারেমের ভেতরে মরিয়ম বেগম বলে কোনও বেগম আছে কিনা
*
শুধু তো বাংলা মুলুকের মসনদ নয়। একটা দেশের উত্থান-পতনের সঙ্গে সে-দেশের প্রত্যেকটি মানুষের সমস্যাও যে জড়িয়ে থাকে তা ক্লাইভ সাহেবের জানা ছিল। ওই যারা নদীতে নৌকো চালায়, যারা খেতমজুরি করে, যারা তাঁতে কাপড় বোনে, যারা বাড়ি-ঘর বানায়, গোরুর গাড়ি চালায়, তাদের সকলের সমস্যার সঙ্গে নবাবের স্বার্থ, কোম্পানির স্বার্থ, ক্লাইভের স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
ওয়ালস্ জিজ্ঞেস করেছিল কিন্তু সেবেগম নবাবের কে?
নবাবের নিজের উওম্যান।
কিন্তু নবাব তো পালিয়ে গেছে। নবাব যখন পালিয়ে গেছে তখন নবাবের উওম্যানদের নিয়ে আমাদের কী দরকার? তারা তো সবাই নেটিভ মেয়েমানুষ। ইউরোপিয়ান বেগম কেউ আছে নাকি?
ক্লাইভ বলেছিল সেসব তোমার জানার দরকার নেই ওয়ালস্–আমি শুধু একটা খবর জানতে চাই, হারেমের ভেতরে মরিয়ম বেগম বলে কোনও বেগম এখনও আছে কি না–
