যে-মানুষটা একদিন ঘুমের জন্যে মাথা খুঁড়ে মরেছে, সেই মানুষটাই আবার সে-দিন চোখ দুটো খুলে সামনের অন্ধকার জলের দিকে চেয়ে ঠায় বসে ছিল এক ভাবে। কোথায় রইল মতিঝিল, কোথায় রইল মনসুরগঞ্জ, আর কোথায় বা রইল তার চেহেল সুতুন। এমনি করেই একদিন সবাইকে সব ছেড়ে চলে যেতে হয়। তেমন যাওয়া তো একদিন যেতেই হবে, তবে দুঃখ কেন? মসনদের জন্যে? লক্কাবাগের সেই খিদমদগারটা সেদিন খুব বেত খেয়েছিল নবাবের সোনার কলকে চুরি করার জন্যে। আসবার সময় তাকে সামনে পেলে মসনদও দিয়ে দিত মির্জা মহম্মদ। বলত–নে, আমার সোনার কলকেটা তো ছোট জিনিস, আমার মসনদটা পারিস তো নিয়ে নে।
কী ভাবছ?
লুৎফা এমনিতে কথা বলে না বেশি। ছোট মেয়েটাকে নিয়ে ঘুমোচ্ছে পাশেই। জানে না তো যে, নবাবের সঙ্গে বিয়ে না হলে তাকে এমন করে চোরের মতো চেহেল্-সুতুন ছেড়ে পালাতে হত না। নবাবের অসংখ্য প্রজাদের মধ্যেই যদি কারও বউ হত লুৎফা তো তা হলেও এত দুর্ভোগ সহ্য করতে হত না।
ঘুমোবে না?
তোমাকে আমি আসবার সময় কোনও খবর দিয়ে এলাম না মরিয়ম বেগমসাহেবা। ইচ্ছে করেই খবর দিলাম না। আমার পরে যারা চেহেলসূতুনে আসবে তারা হয়তো দয়া করে তোমার স্বামীর কাছে তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে, কিংবা হয়তো তোমাকে জারিয়া করে রাখবে। তোমাকে দিয়ে তারা তাদের পা টেপাবে। তোমাকে দিয়ে বাঁদির কাজ করাবে। তা হোক, তবু এর চেয়ে সে অনেক ভাল বেগমসাহেবা। তোমাদের সেই কাফের সাধুর গানটা আমার মনে পড়ছে কেবল, জানো! আমি কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম, কোথায় যাব নেই ঠিকানা। সত্যি, আমার সঙ্গে এলে তুমি অনেক কষ্টে পড়তে। কাল আমরা কোথায় থাকব, কী খাব, তারই ঠিক নেই। আমার জন্যে তুমি কেন কষ্ট করবে মরিয়ম বেগমসাহেবা। তুমি আমার কে? আসলে তুমি তো আমার কেউ নও!
রাত ভোর হয়ে এল, একটু ঘুমিয়ে নাও না।
মির্জা বললে–তুমি ঘুমোও, আমি জেগে থাকি
দুদিন ধরে তো জেগেই আছ, শরীর খারাপ হবে যে না ঘুমোলে
শরীরের কথা ভাববার আমার সময় নেই এখন। তুমি ঘুমোচ্ছ, ঘুমোও
লুৎফা বললে–তুমি না ঘুমোলে আমি কেমন করে ঘুমোই?
তা হলে ঘুমিও না। কে তোমাকে ঘুমোতে বলছে? আর কে-ই বা তোমাকে এত কষ্ট করে আমার সঙ্গে আসতে বলেছিল? তোমরা সঙ্গে না এলে তো আমি আরও ভাল করে জাগতে পারতুম।
লুৎফা চুপ করে রইল।
মির্জা মহম্মদ বললে–কাঁদছ? হ্যাঁ, খুব ভাল করে কাদো, খুব ভাল করে আমাকে জ্বালাও। এমন করে আমাকে না জ্বালালে আমার বউ হয়েছিলে কেন? খুব কাদো, খুব জোরে গলা ছেড়ে কাদো। লোকে যাতে জানতে পারে যেনবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালাচ্ছে, জানতে পেরে যাতে সবাই চারদিক থেকে এসে গ্রেফতার করে সেই ব্যবস্থা করো–
তারপর একটু থেমে নিজের মনেই বলতে লাগল–মানুষের কাছে আমি অপরাধ করেছি, আল্লার কাছেও আমি অপরাধ করেছি, আমার শাস্তি হবে না তো কার হবে? পৃথিবীতে জন্মানোই আমার অপরাধ হয়েছে। কিন্তু আমি কী করব বলো? আমি কি এমন করে পালিয়ে আসতুম? জেনারেল ল’ সাহেবকে দশ হাজার টাকা পাঠালুম, এখনও পর্যন্ত এসে হাজির হল না। ল’ সাহেব এলে কি এমন করে চোরের মতো পালাতে হত আমায়? মিরজাফর, দুর্লভরাম, ইয়ার লুৎফ খাঁ যতই নিমকহারামি করুক, আমার একদিকে মোহনলাল আর একদিকে ল’ সাহেব থাকলেই আমি ফিরিঙ্গি বাচ্চাদের দেখিয়ে দিতুম!
তারপর হঠাৎ লুৎফার দিকে চেয়ে বললে–তুমি কিছু বলছিলে?
লুৎফা কোনও উত্তর দিলে না।
কই, তুমি কিছু কথা বলছ না যে?
তবু লুৎফা কিছু জবাব দিলে না।
কিছু কথা বলো! কিছু কথা বলেও তো উপকার করতে পারো আমার? সেটুকুও তোমার দ্বারা হবে? তা হলে কেন আসতে গেলে আমার সঙ্গে? শুধু ঘাড়ের ওপরে বোঝা হবার জন্যে?
লুৎফার রাগ-অভিমান-অনুরাগ কিছুই যেন থাকতে নেই।
ঠিক আছে, কথা বোলো না। আমি একাই কথা বলব। আমার আমির নেই ওমরাহ নেই, আমার মসনদ নেই, সনদ নেই, আমার উজির, খিদমদগার, বাঁদি, বেগম, বন্ধু কেউই নেই। আমি দুনিয়ায় একলা এসেছি, একলাই থাকব। কারও ভালবাসারও দরকার নেই আমার। এরপর যদি আমি মারা যাই তো কেউ যেন না কাঁদে। কারও কাদবার অধিকার নেই আমার মরার পর, এই আমি বলে রাখলুম।
হঠাৎ লুৎফা নবাবের মুখে হাত চাপা দিলে।
তুমি যে কী! তোমার মুখে কি কিছুই আটকায় না?
পেছন থেকে হঠাৎ বাধা পড়ল। বুড়ো মাঝি বললে–হুজুর, রাজমহলে এসে গিয়েছি—
রাজমহল। ভালই হয়েছে। এখান থেকে সোজা আজিমাবাদে যাওয়ার রাস্তা। জেনারেল লর এইদিক দিয়েই আসবার কথা। দশ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে তাকে পূর্ণিয়ায় ফৌজদারের হাত দিয়ে। এলে এই পথেই দেখা হবে।
মির্জা মহম্মদ বললে–এইখানেই নৌকো বাঁধো বুড়ো মিঞা
লুৎফাও উঠে পড়েছিল। মির্জা মহম্মদ বললে–দেখো, হয়তো এখানে তোমার মেয়ের জন্যে দুধ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু খুব সাবধান। যেন জানতে না পারে কেউ আমাদের। যদি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে তো কী বলবে?
লুৎফা বললে–বলব আমরা পলাশপুরের লোক, আজিমবাদে ফকির সাহেবের দরগায় যাচ্ছি। দোয়া নিতে।
বাইরে তখন অল্প অল্প সকাল হয়েছে। ঘাটে তখন আর একটা বজরা বাঁধা রয়েছে। সে-নৌকোর ভেতরে দুর্গা তখন ঘুম থেকে উঠেছে। আর একটা নৌকো এসে লাগতেই দুর্গা ছোট বউরানিকে ডাকলে।
