নানিবেগম বলছে–কে বললে–এসব টাকাকড়ি মির্জার? এসব আমার! আমিই চেহেলসুতুনের নানিবেগম। দেখি কী করে তুমি আমার মালখানায় তালা দাও–
আমি তালা দেবই, আপনি সরুন নানিবেগমসাহেবা, আমি মিরজাফর সাহেবের মঞ্জুরি নিয়ে এসেছি।
রেখে দাও তোমার মিরজাফরসাহেব! ঢের ঢের অমন মিরজাফরসাহেব দেখেছি। তাকে ডেকে নিয়ে এসো দিকি আমার কাছে! দেখি তার কেমন মুরোদ।
মেহেদি নেসার সাহেব একটু যেন দ্বিধা করতে লাগল। তারপর বললে–তা হলে আপনি তালা লাগাতে দেবেন না?
নানিবেগম বললে–না।
এই আপনার শেষ কথা?
হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তো বলে দিয়েছি এই আমার শেষ কথা।
কিন্তু এর ফল ভাল হবে না নানিবেগমসাহেবা।
তার মানে?
মানে কালকেই বুঝতে পারবেন।
সমস্ত চেহেল্ সুতুনটা যেন গমগম করে উঠল মেহেদি নেসার সাহেবের গলার আওয়াজে। চেহেল সুতুনের আনাচেকানাচে যে-যেখানে ছিল সবাই ততক্ষণে এসে হাজির হয়েছে কাছাকাছি। সবাই এমনই একটা ঘটনার ভয়ই করছিল কাল থেকে। সবাই ভাবছিল একটা কিছু ঘটবে! এ যেন তারই পূর্বাভাস। নজর মহম্মদ কাঠ হয়ে শুনছিল সমস্ত, দেখছিল সমস্ত
হঠাৎ নানিবেগমসাহেবা ফেটে চৌচির হয়ে গেল বেরিয়ে যাও তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও
মেহেদি নেসারও হটবার পাত্র নয়। বললে–কে বেরিয়ে যায় সেইটেই দেখতে হবে। আমি না আপনি?
কেন আমি বেরিয়ে যাব? আমার চেহে সুতুন, আমি এখানে থাকব। কে আমাকে এখান থেকে তাড়াতে পারে দেখি? কার এত হিম্মত!
মেহেদি নেসার বললে–ঠিক আছে, কালই এর প্রমাণ হবে, এ চেহেল্-সুতুন কার। কালই আপনাকে মিরজাফর আলি সাহেবের হাতে-পায়ে ধরতে হবে। তখন বোঝা যাবে!
বলে মেহেদি নেসার সাহেব চলে গেল বাইরের দিকে। পেছন পেছন ডিহিদার রেজা আলি আর বশির মিঞা, তারাও চলে গেল।
*
পাওয়া আর না-পাওয়ার মধ্যে যতখানি ব্যবধান, সুখ আর দুঃখের মধ্যে ততখানি ব্যবধান কি আছে? পাওয়ায় যদি সুখ কিছু থাকে, তার অনেকখানি অংশ না-পাওয়ার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। আমি তোমাকে পেলাম, কিন্তু তোমাকে পাওয়া আমার ফুরিয়ে গেল না, তবেই তো আসল পাওয়া। নদী যেমন সমুদ্রকে পায়, সে পাওয়া তার ফুরিয়ে যায় না বলেই তার পাওয়া শেষ হয় না। সে কেবল সমুদ্রকে পেতেই থাকে। প্রতি দিন প্রতি রাত্রে প্রতি মূহুর্তে পেতে থাকে। সে-পাওয়াই তো সার্থক পাওয়া।
কান্ত সেই অন্ধকার চেহেল্-সুতুনের বন্ধ মহলের মধ্যে কেবল নিজের মনেই বলতে লাগল–তোমাকে নাই বা পেলাম মরালী, কিন্তু তোমাকে পাইনি বলেই তো এমন করে প্রতি মুহূর্তে তোমাকে পাচ্ছি। এই পাওয়াই তো আমার না-পাওয়ার চেয়ে বড় পাওয়া। তুমি যত দূরেই থাকো, যেখানে যেমন ভাবেই থাকো, আসলে তুমি আমার কাছে রয়েছ। যখন আমি থাকব না, তখনও তুমি আমার কাছে। কাছে থাকবে। তখন আমি তোমাকে পেয়েও পাব, হারিয়েও পাব। আমার জীবনে তুমি সব পাওয়া না-পাওয়ার উর্ধ্বে, সব চাওয়া-না-চাওয়ার বাইরে এক পরম পাওয়া হয়ে রইলে। আমার এই দেহ একদিন ধ্বংস হবে, আমার এই অস্থি-মাংস-মজ্জা একদিন নিশ্চিহ্ন হবে, কিন্তু সেদিনও তুমি আমার নিজের হয়েই থাকবে। তুমি আমার হতে চাও আর না-চাও, আমি তা নিয়ে মাথা ঘামাব না; তুমি আমার আর আমি তোমার, এই স্বপ্ন নিয়েই তোমার সঙ্গে আমি একাকার হব। এই-ই তো ভাল মরালী!
ওধারে চেহেল্-সুতুনের ভেতরে হঠাৎ যেন কীসের একটা গোলমাল উঠল।
চেহেল্-সুতুনের মধ্যে অমন গোলমাল হয়ই। কান্ত এই চেহেল্-সুতুনে অনেকবার এসেছে, এমন গোলমাল অনেকবার শুনেছে। কে যে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তা ভাবার আর দরকার নেই। খাটের ওপর শুয়ে শুয়ে চোখ বুজে শুধু মরালীর কথাই ভাবতে ভাল লাগল কান্তর। বাইরে যখন ইতিহাসের মোড় ফিরছে, তখন একজন পুরুষের এ-চিন্তার কোনও দাম নেই তাও কান্ত জানে। সে। জানে নবাব হয়তো এতক্ষণ মসনদ ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে, হয়তো ফিরিঙ্গি ফৌজ এসে যাবে এখনই। সে জানে তার আগেই হয়তো কেউ এসে তাকে কোতল করবে। শুধু তাকে একলা নয়, এই সমস্ত বেগমকেই হয়তো কোতল করবে। কিন্তু এও তো এক সান্ত্বনা যে তারা মরিয়ম বেগমকে কেউ খুঁজে পাবে না, মরালীকে কেউ খুঁজে পাবে না। মরালী যদি নিরাপদে থাকে তো আর যেখানে যা-কিছু হয় তোক। তুমি আরও দূরে চলে যাও মরালী, আরও অনেক দূরে। তুমি যত দূরে চলে যাবে, তত আমি তোমাকে কাছে পাব।
গোলমালটা যেন হঠাৎ সামনে এল। তারপর মনে হল যেন মেহেদি নেসার সাহেবের গলা, ডিহিদার রেজা আলির গলা। এখন বশির মিঞার গলাও কানে এল। হয়তো মুর্শিদাবাদের শহরের ভেতরে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে। হয়তো লুঠপাট আরম্ভ হয়েছে চেহেল্-সুতুনে।
তা হোক, তা নিয়ে কান্তর কিছু ভাবনা করবার দরকার নেই। কান্ত চোখ বুজে স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্ন দেখতে লাগল, মালদা থেকে রাজমহল; রাজমহল পেরিয়ে পদ্মা; পদ্মা পেরিয়ে সমুদ্র। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই শুধু জল আর জল। আরও এগিয়ে যাও মরালী, আরও দূরে চলে যাও। তুমি দূরে চলে গেলে তবে আমি তোমাকে কাছাকাছি পাব। আরও দূরে চলে যাও, নৌকো থামিয়ো না
কিন্তু কান্ত সেদিন জানত না রাজমহলের দিকেই ঠিক আর একটা বজরা যাচ্ছিল। বজরার ভেতর আর একটা মানুষ ঠিক কান্তর মতোই অমনি করে ভাবছিল ওই কথাগুলোই। আরও দূরে চলো, আরও দূরে। যেখানে কেউ আমাকে চিনতে পারবে না, সেই দিকে চলো।
