সামনে সামনে আসছিল পিরালি খাঁ। আর পেছনে আরও কয়েকজন। ভারী ভারী পায়ের আওয়াজ। সার আবার কাদের নিয়ে এল এখন।
কিন্তু গলার শব্দেই চেনা গেল মেহেদি নেসার সাহেব। আরও একটু কাছে আসতেই অন্য লোকদেরও চেনা গেল। মেহেদি নেসারের সঙ্গে আছে ডিহিদার রেজা আলি সাহেব। তার সঙ্গে বশির মিঞা। নজর মহম্মদ মাথা হেলিয়ে সেলাম করলে সকলকে।
মেহেদি নেসার জিজ্ঞেস করলে–এ কে?
হুজুর, এ আমার শাগরেদ, খোজা নজর মহম্মদ!
মেহেদি নেসার সাহেব তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে দেখলে নজর মহম্মদকে। ভাল করে দেখা গেল না অন্ধকারে। কিন্তু তা হোক, তবু হুঁশিয়ার করে দিলে।
বললে–তোমার শাগরেদকে হুশিয়ার করে দিয়েছ তো পিরালি। খুব হুঁশিয়ার থাকে যেন।
তারপর আরও অনেক কথা বললে। সব কথাগুলোর সারমর্ম এই যে, এখন চারদিকে অরাজক শুরু হয়ে গেছে। এই সময়ে যেন ভাল করে চেহেল্-সুতুনে পাহারা দেয় তারা। বাইরের কোনও আদমি যেন ভেতরে না ঢোকে। নবাব বেপাত্তা, সুতরাং নবাবের দুশমনরা নানান ছুতোয় ভেতরে এসে ঢুকবে। কেউ আসবে চেহেল্-সুতুনের বেগমদের লোভে, কেউ আসবে টাকাকড়ি-দৌলতের লোভ। দুনিয়ার যত মতলববাজ মানুষের এই হচ্ছে ফুরসত। এই সময়ে চুরি-রাহাজানি-বাটপাড়ি চলছে শহরে। শহরময় খুনখারাপি হচ্ছে। সেই জের চেহেল্-সুতুনের অন্দরেও আসতে পারে!
বলতে বলতে মেহেদি নেসার সাহেব এগিয়ে যেতে লাগল আরও ভেতরের দিকে।
ডিহিদার রেজা আলি সাহেব বললে–জনাব, আর সেই মরিয়ম বেগমসাহেবা, যার কথা আমি বলেছিলাম জনাবকে?
মেহেদি নেসার সাহেব বললে–তাকে আমি নজরবন্দি করে রেখেছি। পিরালি, বেগমসাহেবরা যেন কেউ না পালায়!
না হুজুর, আমার খোজারা নজর রাখছে
আর ঘসেটি বেগমসাহেবার দিকেও নজর রাখবে। পেশমন বেগম, তক্কি বেগম, বব্বু বেগম, গুলসন বেগম, যত বেগম আছে, সকলের দিকে নজর রাখবে। আমিনা বেগমসাহেবা কোথায়?মালখানার চাবি খুলতে গিয়েছিল আমিনা বেগমসাহেবা, সেই আমিনা বেগমসাহেবাকে দেখেছ তো?
জি হুজুর। নানিবেগমসাহেবা তাকে খুব কড়া হুকুম দিয়েছে। নিজের কাছে মালখানার চাবি রেখে দিয়েছে।
খুব হুঁশিয়ার, আমি আজকে মালখানায় তালার ওপর তালা লাগিয়ে যাব। চলো–
বলে আরও সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। পিরালি খাঁ শশব্যস্ত হয়ে চলতে লাগল। পেছনে ডিহিদার রেজা আলি, বশির মিঞা, তারাও চলেছে। নজর মহম্মদের ভয় করতে লাগল। মালখানার তালার ওপর তালা লাগিয়ে দেবে মেহেদি নেসার সাহেব। কিন্তু নানিবেগমসাহেবা যদি বাধা দেয়।
ভেতরে পেশমন বেগমসাহেবার ঘরের অন্দরে তখন আলো জ্বলছিল। মেহেদি নেসার সাহেব এমন করে বুক ফুলিয়ে কখনও চেহেল্-সুতুনের ভেতরে চলে না। যখন আসে তখন নানিবেগমসাহেবার ভয়ে নরম হয়ে মাথা নিচু করে আসে। কিন্তু আজ নবাব নেই, তাই বেপরোয়া হয়ে গেছে নেসার সাহেব।
পিরালি খাঁ মালখানার বাইরের তালা খুলে দিতেই মেহেদি নেসার, ডিহিদার রেজা আলি, বশির মিঞা সবাই ভেতরে ঢুকল।
হঠাৎ নানিবেগমসাহেবার গলা শোনা গেল। সর্বনাশ, কেউ হয়তো নানিবেগমসাহেবাকে খবর দিয়ে দিয়েছে। দৌড়াতে দৌড়োতে একেবারে সামনে এসে হাজির হয়েছে নানিবেগমসাহেবা।
কৌন? মেহেদি নেসার? তুমি? ক্যা কর রাহা হ্যায়?
মেহেদি নেসার কিন্তু অন্যবারের মতো দমল না নানিবেগমসাহেবাকে দেখে। বললে–মালখানায় তালা লাগিয়ে দিচ্ছি নানিবেগমসাহেবা।
আশ্চর্য, নজর মহম্মদ আজ নানিবেগমসাহেবাকে কুর্নিশ পর্যন্ত করলে না।
লেকন, চেহেল্-সুতুনের মালখানায় তালা লাগাবার তুমি কে?
মেহেদি নেসার তেমনি গম্ভীর গলাতেই জবাব দিলে শুধু চেহেল্-সুতুন নয় নানিবেগমসাহেবা, তামাম নিজামতের মালিক এখন আমরা।
মালিক তোমরা? তোমরা?
নবাব চেহেল্-সুতুন ছেড়ে চলে গেছে, এখন নিজামতের সবকিছুর জিম্মাদার আমরা।
আমরা মানে কারা?
মেহেদি নেসার বললে–আমরা মানে নবাবের যত আমির-ওমরা, তারা।
নানিবেগমসাহেবা গলা চড়িয়ে দিলে খবরদার, যতক্ষণ আমি জিন্দা আছি ততক্ষণ আমির-ওমরা কেউ কিছু নয়, মনে রেখো নেসার, আমি এখনও বেঁচে আছি। আমি যতক্ষণ আছি এখানে, ততক্ষণ কেউ মালখানায় হাত দিতে পারবে না। চেহেল্-সুতুনের দৌলত আমার দৌলত, আমিই সবকিছুর জিম্মাদার–
নজর মহম্মদ দেখলে ব্যাপার অনেক দূর গড়াবে। এ সহজে মেটবার নয়। তাড়াতাড়ি আবার ছোটমশাইয়ের কাছে ফিরে এল–বাবুজি, বাবুজি
ছোটমশাই এতক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে চুপ করে বসে ছিল। শেষকালে কি এমনি করে নিজেরও বিপদ ঘটাবে, ছোট বউরানিরও বিপদ ঘটিয়ে দেবে!
বাবুজি, আপনি বেরিয়ে যান, সব গড়বড় হয়ে গেছে।
কিন্তু মরিয়ম বেগম? মরিয়ম বেগমসাহেবার কী হবে?
কিছু হবে না বাবুজি। বেগমসাহেবাদের কারও সঙ্গে আর মুলাকাত করা যাবে না। মেহেদি নেসার সাহেব কড়া হুকুম জারি করে দিয়েছে।
মেহেদি নেসার সাহেব? মেহেদি নেসার সাহেব অন্দরে এসেছে নাকি?
জি, বড় জবরদস্ত ওমরাহ মেহেদি নেসার সাহেব।
ছোটমশাইয়ের যেন একটু আশা হল। মেহেদি নেসার তো জগৎশেঠজির দলে। জগৎশেঠজি একটু চেষ্টা করলেই তো তা হলে ছোট বউরানিকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়!
বাবুজি, আপনাকে আমি বাইরে নিয়ে যাচ্ছি, চলুন–আর দেরি করবেন না, চলুনচলুন–
ছোটমশাইকে কোনওরকমে তাড়াতাড়ি বাইরে বার করে দিয়ে এসেই আবার নজর মহম্মদ মালখানার সামনে হাজির হল। মালখানার সামনে তখন নানিবেগমসাহেবার সঙ্গে নেসার সাহেবের তুমুল তকরার চলেছে। মেহেদি নেসারের গলা যেন অন্যদিনের চেয়ে আরও বেশি চড়েছে। নবাব নেই বলে তার যেন ভয়ও নেই আগেকার মতো।
