ছোটমশাই বললে–কিন্তু যে-ইনবাব হোক, তার আগে আমার একটা ব্যবস্থা করে দিন, আমি আর এই গণ্ডগোলের মধ্যে মুর্শিদাবাদে থাকতে চাই না
আপনার কীসের ব্যবস্থা?
ছোটমশাই বললে–আপনাকে যে সেই বলেছিলাম আমার সহধর্মিণীর কথা। আমি গিয়েছিলাম সেই চকবাজারের সারাফত আলির দোকানে। সেখানে খুনোখুনি কাণ্ড দেখে ফিরে এসেছি। দেখলাম সারাফত আলিকে কে খুন করে রাস্তায় ফেলে রেখে দিয়ে গেছে
তারপর?
তারপর শুনলাম মরিয়ম বেগম নাকি ওইসব গণ্ডগোল দেখে সোজা গিয়ে ঢুকেছে চেহেল্-সুতুনের ভেতরে। আমি একবার চেহেল্-সুতুনে গিয়ে মরিয়ম বেগমের সঙ্গে দেখা করতে চাই
চেহেল্-সুতুনে আপনি কী করে যাবেন? সেখানে কি বাইরের কাউকে ঢুকতে দেয়? তার ওপর আপনি পুরুষমানুষ।
ছোটমশাই বললে–এখন না হোক, রাত্তিরের দিকে
রাত্রের দিকেই বা আপনি যাবেন কী করে?
ছোটমশাই বললে–শুনেছি তো ঘুষ দিলে নাকি সবই সম্ভব হয় চেহেল্-সুতুনের ভেতরে। সবাই তো তাই-ই বলে! আর তা ছাড়া এখন তো নবাবই নেই। এখন কি আর অত কড়াকড়ি চলছে? ওই তো মতিঝিল থেকে সব খিদমদগার পালিয়েছে, একটা জনপ্রাণীও নেই মতিঝিলে।
জগৎশেঠজি খানিকক্ষণ কী যেন ভাবলেন। বললেন–আপনি ঠিক জানেন মরিয়ম বেগমই আপনার সহধর্মিণী?
ছোটমশাই বললে–আমার দৃঢ় ধারণা তাই।
জগৎশেঠজি বললেন–তা হলে দেওয়ান মশাইকে বলুন, উনি একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন কিনা আপনার জন্যে
সত্যিই তখন জগৎশেঠজির মাথায় রাজ্যের ভাবনা। তিনি যে ওইটুকুই করেছেন তাই-ই যথেষ্ট। কিন্তু রণজিৎ রায় দেওয়ানজি সব ব্যবস্থা করে দিলেন। সন্ধে হবার পর লোক দিয়ে ছোটমশাইকে পাঠিয়ে দিলেন চেহেসতুনের ফটকে। সমস্ত অগোছালো ব্যবস্থা। রাস্তার টিমটিমে আলোগুলোও আজ জ্বলছে না। জ্বালাবার লোকই গরহাজির। ফটকের আলোলোও জ্বলেনি। খুব সাবধানে কাজ শেষ করতে হবে। কেউ যেন দেখতে না পায়। ঘুষ পেয়ে খোঁজাটার চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলজ্বল করে উঠল।
তোমার নাম কী?
খোজা নজর মহম্মদ, হুজুর।
এই বাবুজিকে একবার মরিয়ম বেগমসাহেবার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পারো?
মরিয়ম বেগমসাহেবার নাম শুনে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল নজর মহম্মদ। বশির মিঞা খুব সাবধানে রাখতে বলে দিয়েছে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে। যদি শেষকালে কিছু গড়বড় হয়?
কিন্তু হাতের মুঠোর মধ্যে তখনও আসরফিটা ফুটছে তার। একবার একটু দ্বিধা করেই নজর মহম্মদ তখুনি বললে–আচ্ছা, আইয়ে হুজুর
তারপর বললে–জরা সামহালকে–
সত্যিই ভেতরটা অন্ধকার। সুড়ঙ্গের মতো রাস্তা। ছোট ঘোট ইটের গাঁথনি। এই পথ দিয়েই একদিন কান্ত ভয়ে ভয়ে মরালীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। আবার এই পথ দিয়েই আজ ছোটমশাই চোরের মতো পা টিপে টিপে চলেছে। হয়তো এইটেই নিয়ম। ইতিহাসের পথ হয়তো চেহেল্-সুতুনের মতোই এমনই অন্ধকার, এমনই রহস্যময়। ইতিহাসও বোধহয় এমনি করে নিঃশব্দে পা টিপেটিপে অস্পষ্ট পথে পা বাড়িয়ে দেয়। তারপর যখন কেউ টের পায় না, কেউ জানতেও পারে না, তখন গন্তব্যস্থানে পৌঁছে একদিন হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করে। তখন সবাই অবাক হয়ে যায়, সবাই চমকে ওঠে।
কান্তও চমকে উঠেছিল।
কে? কৌন?
খিড়কিবন্ধ ঘরের মধ্যেও নজর মহম্মদের গলাটা চিনতে পেরেছে কান্ত।
মরিয়ম বেগমসাহেবা, মরিয়ম বেগমসাহেবা।
কান্ত বুঝতে পারলে না জবাব দেওয়া ঠিক হবে কি না। এই সময়ে কেনই বা নজর মহম্মদ ডাকছে। তাকে তাও বুঝতে পারলে না।
আমি নজর মহম্মদ, বেগমসাহেবা।
কান্ত খিড়কির ভেতর থেকেই বলে–কী দরকার?
নজর তেমনিই বাইরে থেকে বললে–একঠো বাত আছে বেগমসাহেবা, একবার খিড়কিটা খুলুন।
কী কথা আছে তোমার?
নজর মহম্মদ বললে–একবার মেহেরবানি করে খিড়কিটা খুলুন না
কান্ত ভাল করে বোরখা দিয়ে নিজের সর্বাঙ্গ ঢেকে নিয়ে দরজাটা খুলে দিলে।
*
হঠাৎ সেই অন্ধকার আবহাওয়া যেন অনেক মানুষের পায়ের শব্দে বিচলিত হয়ে উঠল। কয়েকদিন ধরেই চেহেল্-সুতুনের ভেতরে সমস্ত নিয়মকানুনকায়দা বেসামাল হয়ে পড়েছিল। নবাব যেদিন হঠাৎ এখানে এসে পড়েছিল, সেই দিন থেকেই। তারপর নজর মহম্মদের দল আর কোনও দিক সামলাতে পারছে না। যে সে এসে ঢুকে পড়ছে চেহেসতুনের ভেতরে। নবাব যে চেহেলসতুন ছেড়ে চলে গেছে, সে-খবরটাও আর চাপা থাকেনি।
পায়ের আওয়াজ পেতেই নজর মহম্মদ চমকে উঠেছে। আবার এখন কে এল?
খোজাসর্দার পিরালি খাঁ সাহেব কাল থেকেই হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। আসলে পিরালি খাঁ নয়, নানিবেগমসাহেবারই হুকুম। যে-সে এসে ঢুকে পড়বে ভেতরে–খুব হুঁশিয়ার সে রহনা পিরালি। কত মোহর, কত টাকা, কত জড়োয়া ছড়ানো আছে চারদিকে। এই সময়েই তো চুরি হয়ে যায় সব।
বাবুজি, আপনি একটু তফাত যান।
কেন? কী হল?
নজর মহম্মদ বললে–কার যেন পায়ের আওয়াজ শুনছি, হালচাল ভাল মালুম হচ্ছে না–
ছোটমশাই বললে–কোথায় তফাত যাব?
আপনি আসুন, আমার সঙ্গে আসুন।
বলে ছোটমশাইকে নজর মহম্মদ একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে বললে–এইখানে থাকুন আপনি, আমি আপনাকে পরে ডেকে নিয়ে যাব
তখন আর সময় নেই। নজর মহম্মদ এক নিমেষের মধ্যে সোজা এসে আবার নিজের জায়গায় দাঁড়িয়েছে। তার আগে মরিয়ম বেগমসাহেবার ঘরের দরজাটা বন্ধ করতে বলে দিয়ে সাবধান হয়ে নিলে। আবার কি তবে নবাব ফিরে এল নাকি?
