ছোট বউরানি আর দুর্গা অন্য বজরার ভেতর উঠতেই দুটো নৌকোই পাশাপাশি চলতে লাগল।
শুধু রাজবাড়িতে উদ্ধব দাস তখনও দু’-একজনকে জিজ্ঞেস করছে ওগো, ও প্রভু, আমাদের গোকুল কোথায় গেল গো?
কে গোকুল?
গোকুলকেই চিনতে পারে না তারা কেউ। তবুউদ্ধব দাসের মনে হতে লাগল গোকুল তো লোক ভাল। সে তো কথা দিয়ে কথা খেলাফ করবার লোক নয়। কিন্তু গেল কোথায়?
গোকুল যে কোথায় উধাও হয়ে গেল, শেষপর্যন্ত তা আর জানা হল না উদ্ধব দাসের।
হাতিয়াগড়ের ছোট বউরানিকে পাঠাবার সমস্ত বন্দোবস্ত করার পরেও কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। দেওয়ানমশাইকে পাঠিয়ে দিলেন মুর্শিদাবাদে। বললেন আপনি একবার নিজে যান মুর্শিদাবাদে। খবরাখবর সব জেনে আসুন–
কিন্তু দেওয়ানমশাই বেরিয়ে গিয়েও মাঝপথ থেকে ফিরে এলেন।
মহারাজ দেওয়ানমশাইয়ের ফিরে আসার খবর পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন–কী হল, ফিরে এলেন যে?
দেওয়ানমশাই বললেন–উকিলবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল রাস্তায়, তিনি নিজেই আসছিলেন আপনাকে খবরাখবর দিতে–তাই তার সঙ্গেই ফিরে এলাম। তিনি বললেন, মুর্শিদাবাদে হুলস্থুল কাণ্ড বেধে গেছে
কী রকম?
খানিক পরে সারদাবাবু নিজেই এলেন। সবিস্তারে সব বর্ণনা করলেন।
বললেন–ক্লাইভ সাহেবকে খুন করবার জন্য ষড়যন্ত্র করেছে রাজা দুর্লভরাম।
সেকী? খুন করবে? কেন?
দু’কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা ক্লাইভসাহেব চেয়েছে বলে। টাকার কথায় জগৎশেঠজি পর্যন্ত চটে গেছেন। সবচেয়ে চটেছে দুর্লভরাম, মিরন আর খাদেম হোসেন। মিরজাফর সাহেবের ইচ্ছে ছিল টাকাটা দিয়ে দিতে। কিন্তু আর সবাই অরাজি।
আর নবাব পালিয়ে গেছে সেখবর সত্যি?
সত্যি বলেই তো আমি শুনেছি। তবে কোনও প্রমাণ পাইনি। রাস্তায় লোকজনের ভিড়, চকবাজারে সব দোকানপাট বন্ধ। সারাফত আলি বলে একজন গন্ধতেলের দোকানদার ছিল, তাকে দেখলাম কে খুন করে রাস্তার ওপর ফেলে রেখে গেছে। তারপর আরও সব খবর শুনলাম, সত্যি-মিথ্যে বিশ্বাস হয় না। নবাব নাকি নিজের মাকে টাকা চুরি করেছিল বলে গালে চড় মেরেছে। তারপর থেকে সমস্ত রাত খাজাঞ্চিখানার টাকা সকলকে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে ফিরিঙ্গিদের হাতে না পড়ে। ওদিকে ময়দাপুরে ক্লাইভসাহেব যাকে রাস্তায়-ঘাটে পাচ্ছে তাকেই ধরছে। তাদের কাছ থেকে টাকাকড়ি কেড়ে নিচ্ছে
কৃষ্ণচন্দ্র বললেন আমি জানতুম এরকম হবে।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন কিন্তু নবাব যদি পালিয়েই থাকে তো কোথায় পালিয়েছে? কোথায় পালাতে পারে?
সারদাবাবু বললেন–তা কেউ বলতে পারছে না। কখন পালালও তা-ও কেউ জানে না। আসলে পালিয়েছে কিনা তারও তো ঠিক নেই। সবটাই তো আমার শোনা কথা। সমস্ত মুর্শিদাবাদ এখন নানারকম গুজবে ছেয়ে গেছে। আপনি এখনই একবার চলুন, আপনাকে নিয়ে যাবার জন্যেই এসেছি
কৃষ্ণচন্দ্রও বুঝলেন এসময়ে মুর্শিদাবাদে তার নিজের একবার যাওয়া উচিত। এ-সময়ে যদি কিছু ভুল পদক্ষেপ হয়ে যায় তো সে-ভুলের খেসারত তাঁকেও দিতে হবে।
তিনি উঠলেন। বললেন আমি এখনই রওনা হচ্ছি
*
আর সত্যিই সেদিন মুর্শিদাবাদে আইন-শৃঙ্খলা বলে বুঝি কিছুই ছিল না। মসনদ একদিনের জন্যে শূন্য হয়ে গেছে। নিজামত বন্ধ। কাছারি বন্ধ, খাজাঞ্চিখানা বন্ধ। কে হুকুম দেবে, কে হুকুম মানবে, তারও কিছু হদিশ নেই। যারা ফিরিঙ্গি ফৌজের ভয়ে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছে, তারা অনেকে রাস্তাতে ফিরিঙ্গি ফৌজের হাতে ধরা পড়েছে। তাদের যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে তারা। সেই ওয়াটস্ আর ওয়াল চলে যাবার পর থেকেই যেন গণ্ডগোলটা বাড়ল। জগৎশেঠজির বাড়ি থেকে মিরজাফর সাহেব চলে গেল। মিরন চলে গেল, দুর্লভরাম চলে গেল। একে একে সবাই চলে যাবার পর ছোটমশাই একলা বসে ছিল। শেষকালে একসময় জগৎশেঠজিও চলে গেলেন। রণজিৎ রায় মশাইও হোমশাইয়ের বন্দোবস্ত করে দিয়ে নিজের কাজে চলে গিয়েছিল। তারপর ভোরাত্রের দিকে খবর এসেছিল যে, নবাব নাকি চেহেল্-সুতুন ছেড়ে কোথায় চলে গিয়েছে।
আর বাড়ির ভেতরে থাকতে পারলে না ছোটমশাই। একবার গেল মতিঝিলের দিকে। রাস্তায় গিজগিজ করছে লোক। তারই সামনে মনসুরগঞ্জ হাবেলি। সেখানে মিরজাফর সাহেব উঠেছে। তার বাড়ির সামনে তখন পাহারা বসে গেছে।
আবার ফিরে এল ছোটমশাই। কী যে করবে বুঝতে পারলে না। চকবাজারে সেই খুশবু তেলের দোকানের সামনেও একবার গেল। সেই বুড়ো লোকটা তখনও সেই রাস্তার ওপরেই মরে পড়ে আছে।
ফিরে আসতেই জগৎশেঠজির সঙ্গে দেখা হল। বড় উত্তেজিত ভাব জগৎশেঠজির।
ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলে কিছু খবর পেয়েছেন?
জগৎশেঠজি বললেন–পেয়েছি। কিন্তু বড় খারাপ খবর। মিরন, দুর্লভরাম, খাদেম হোসেন সবাই ঝগড়া বাধিয়ে বসেছে। নবাব কে হবে তাই নিয়ে ঝগড়া। এখন যদি ফৌজের লোকেরা খেপে গিয়ে এ-ওর বিরুদ্ধে লাগে তা হলেই সব গোলমাল হয়ে যাবে–ওদিকে মিরজাফরের জামাই আছে। মিরকাশিম, সেও এর মধ্যে জুটেছে
তা হলে আপনি কী করবেন ঠিক করেছেন?
কিছুই এখনও ঠিক করিনি। ভাবছি ক্লাইভকে একটা চিঠি লিখে দিই যে, তিনি যেন এখন এখানে না আসেন। কেউ-না-কেউ খুন করতে পারে তাকে।
কিন্তু খুন করতে যাবে কেন ক্লাইভকে?
ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্যে। ক্লাইভের হাতে নবাব করবার ক্ষমতা রয়েছে যে। ক্লাইভ যাকে মসনদে বসাবে সে-ই তো নবাব হবে কিনা।
