গোকুল সেকথায় কান না দিয়ে বললে–তা বউ তোমার কী বলছে? সেদিন পালিয়ে গিয়েছিল কেন?
আরে, কথাই বলে না আমার সঙ্গে।
কথা বলে না? আচ্ছা, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। শোভারামের মেয়ে তো, ওকে আমি ছোট্টবেলা থেকে দেখে আসছি। তোমার সঙ্গে কথা বলবে না কেন সে? তুমি কী অপরাধ করেছ?
উদ্ধব দাস বললে–আমি যে বাউন্ডুলে মানুষ, আমাকে কি পছন্দ হয় কারও?
তা না হয় না হল, কিন্তু তোমার সঙ্গে তো তার বিয়ে হয়েছে, তুমি তো তার সোয়ামি হলে?
উদ্ধব দাস বললে–না না, জোর করে কি পিরিত হয়? না জোর করে হরিভক্তি হয়? এ তো জোর-জবরদস্তির ব্যাপার নয় গো। তার চেয়ে আমি গান বেঁধে ঘুরে বেড়াই, সে ঢের ভাল। সে সুখী হলে আমি আর কিছু চাইনে! সুখ বড় দুর্লভ বস্তু গো! ওই সুখ নিয়েই আমি একটা ছড়া বেঁধেছি, শুনবে নাকি?
গোকুল হেসে ফেললে। বললে–তোমার আর পাগলামি গেল না দেখছি। এখনও তুমি সেইরকম আছ দাসমশাই। পৃথিবীতে কত কী কাণ্ড হল, সব অদলবদল হয়ে গেল, তোমার কিন্তু বদল নেই
হঠাৎ সেরেস্তার একজন লোক এসে গোকুলকে ডেকে নিয়ে গেল ভেতরে। বললে–তোমাকে একবার দেওয়ানমশাই ডাকছেন–এসো
উদ্ধব দাসকে বসতে বলে গোকুল লোকটার সঙ্গে একেবারে দেওয়ানজির কাছারির ঘরে গিয়ে হাজির।
গোকুল যেতেই কাছারি-ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিলেন কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই।
বললেন–রাত্রে কোনও অসুবিধে হয়নি তো? ঘুম হয়েছিল বেশ?
গোকুল বললে–হ্যাঁ হুজুর, কোনও কষ্ট হয়নি। অতিথিশালায় আমার চেনা লোক বেরিয়ে পড়ল, তার সঙ্গেই এতক্ষণ গল্প করছিলাম। সে বলছিল তার বউ নাকি রাজবাড়িতে লুকিয়ে আছে–
কে? কার কথা বলছ?
আজ্ঞে ওই যে দাসমশাই। ও তো আমাদের চেনা লোক, আমাদের হাতিয়াগড়ের অতিথিশালাতেও গিয়ে ওঠে কিনা–
ওকে তুমি তোমার কাজের কথা বলেছ নাকি? কী জন্যে তুমি এসেছ টেসেছ, এইসব?
আজ্ঞে না হুজুর, কিচ্ছু বলিনি!
আর ওর সঙ্গে দেখা কোরো না। তোমায় একটা কাজ করতে হবে। সেই জন্যেই ডেকেছি। কাউকে কিছু বলবে না, কারও সঙ্গে আর দেখা করবে না। তোমার থাকার জন্যে আমি আলাদা বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। তোমার বড় বউরানির হয়তো জানা নেই, তোমাদের ছোট বউরানি আমাদের এই রাজবাড়িতেই আছেন।
আমাদের ছোট বউরানি?
হ্যাঁ, তোমাদের ছোট বউরানি, যাকে খোঁজবার জন্যে তোমার ছোটমশাই এখানে-ওখানে ঘোরাঘুরি করছেন।
তা হলে তার সঙ্গে একবার দেখা করে পেন্নাম করে আসি।
দেওয়ানমশাই বললেন না, এখন থাক, চারদিকে এখনও নবাবের চর ঘোরাগুরি করছে। তুমি বলছ বটে যে নবাব পালিয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের কাছে এখনও পাকাপাকি খবর কিছু আসেনি। ছোট বউরানি হাতিয়াগড়ে ফিরে যাবার জন্যে বড় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমি লশকর-পেয়াদা-সেপাই সঙ্গে দেব, তুমি তাঁকে নিয়ে বড় বউরানির কাছে গিয়ে পৌঁছে দেবে–পারবে তো?
কেন পারব না আজ্ঞে?
তা হলে সেই কথাই রইল। নবাব যখন নেই তখন আর কোনও বিপদ-আপদ কিছু নেই। তবু সাবধানের মার নেই। তুমি এখন আমার সেরেস্তার লোকের সঙ্গে অন্দরে যাও। আর অতিথিশালায় যেতে হবে না। সেখানেই তোমায় যা খবর পাঠাবার তা পাঠাব। যাও–
দেওয়ানজিরও বোধহয় তখন অনেক কাজ ছিল। গোকুল সেরেস্তার লোকের সঙ্গে ভেতরবাড়িতে চলে গেল। ভেতরে যেতে যেতে গোকুলের মনে হল এ কত বড় রাজবাড়ি! কোথায় যে কে থাকে, কোথায় সদর কোথায় অন্দর কোথায় সেরেস্তা কোথায় অতিথিশালা, বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।
তারপর আরও বেলা হল। সেরেস্তার কাছারিতে আরও লোকের ভিড় বাড়ল। অতিথিশালায় আরও কিছু নতুন লোক এসে ঢুকল। মুর্শিদাবাদে অত বড় কাণ্ড ঘটে গেছে, তার ঢেউ এসে লাগল কৃষ্ণনগরে, বর্ধমানে, নাটোরে, হুগলির ফৌজদারের দফতরে। সর্বত্র। সেই শেষরাত থেকেই মহারাজ আর ঘুমোতে পারেননি। মহারাজার লোক গেল মুর্শিদাবাদের উকিলের কাছে, বর্ধমানের মহারাজার কাছে, নাটোরের মহারানির কাছে, নবদ্বীপের বাচস্পতি মশাইয়ের কাছে।
শুধু উদ্ধব দাস বারকয়েক খোঁজ করলে গোকুলের। যাকেই দেখে তাকেই জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁগো প্রভু, গোকুল কোথায় গেল?
কে গোকুল?
ওই যে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের নফর!
কিন্তু কে কার খবর রাখে অতিথিশালাতে!
বেলা যখন পড়ো পড়ো তখন একটা ঝালর-ঢাকা পালকি রাজবাড়ির খিড়কির দরজা দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল উত্তর দিকপানে। পালকিটা হাঁটা-পথে গিয়ে পৌঁছোবে শিবনিবাসের ঘাটের কাছে। সেখানে মহারাজার নিজের বজরা তৈরি থাকবে। তাতেই গিয়ে উঠবেন হাতিয়াগড়ের ছোট বউরানি আর দুর্গা। ওখান থেকে নৌকোয় উঠলে বিশেষ জানাজানি হবে না।
গোকুল আগে থেকেই সেই ঘাটে আর একটা নৌকোয় তৈরি হয়ে বসে ছিল। তঙ্গে পাইকবরকন্দাজ। তারা একেবারে হাতিয়াগড়ে বউরানিকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসবে।
গোকুলের হাতে একটা চিঠিও দিয়ে দিলেন দেওয়ানমশাই। চিঠিটা সিলমোহর করা। মহারাজার গৃহিণীর জবানিতে লেখা ছিল–আদার সনি শ্ৰীমতী রাসমণিকে আজ লোজন-পাইক পেয়াদা বরকন্দাজ সহ হাতিয়াগড়ে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলাম। পৌঁছ সংবাদ দিবেন। কিন্তু আনার স্বামীর কোনও সন্ধান পাইনাই বলিয়া সে সম্বন্ধে কিছুই জানাইতে পারিলাম না। সন্ধানের ব্যবস্থা মহারাজ করিবেন বলিয়া স্থির করিয়াছেন। সন্ধান পাইলে যথাসত্বর জানাইব। ইতি
