জগৎশেঠজি বললেন–যাও, জমিদার সাহেবকে এত্তেলা দাও
আর সঙ্গে সঙ্গে হাতিয়াগড়ের জমিদার হিরণ্যনারায়ণ রায় ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। প্রথমে বুঝতে পারেননি। তারপর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল– আপনারা?
*
নয়ানপিসি তখন মরালীকে খাওয়াচ্ছিল। সারাদিন বিয়ের ধকল গেছে। উদ্ধব দাস শুভদৃষ্টির সময়েই লক্ষ করেছিল।
হরিপদ কানে কানে বলেছিল–একটু কান্নাকাটি করছে বটে, কিন্তু তা করুক, মেয়েমানুষের মন, ও দু’দিনেই ঠিক হয়ে যাবে দাসমশাই, ওর জন্যে কিছু ভেবো না
তারপর শোভারামের দিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল–এ তোমার অনেক ভাল হল শোভারাম, কলকাতার বর আসেনি, এ অনেক ভাল হয়েছে। বড়মশাই শুনলে রাগ করতেন, ম্লেচ্ছদের চাকরি, জাত-জন্ম কি আর থাকত তোমার মেয়ের?
শোভারাম বলেছিল কিন্তু মরি যে আমার বড় সোহাগি মেয়ে হরিপদ, পাশা খেলে, পান খায়, চুলে গন্ধ তেল দেয়, গান গায়
হরিপদ বলেছিল–তা পাশা খেলবে। দাসমশাইও তো শৌখিন মানুষ, জানো, রসের গান জানে কত
শোভারাম বলেছিল কিন্তু রসের গান শুনলে তো আর পেট ভরবে না। শেষে কি বাঁড়ুজ্জে মশাইয়ের মেয়ের মতো বাপের বাড়িতেই কাটিয়ে দেবে চের-জন্ম, শ্বশুরঘর করবার কপাল হবে না। আর
তারপর শোভারাম হরিপদকে জিজ্ঞেস করেছিল–আচ্ছা, মরি অত কাঁদছিল কেন বলো তো হরিপদ?
আহা, মেয়েছেলে হয়ে জন্মেছে, কাঁদবে না? মায়ের কথা মনে পড়ছিল হয়তো! বিয়ের দিনে মেয়েছেলে কাদবে না তো কি বেটাছেলে কাদবে? সেই যে কথায় বলে না, মেয়েছেলের মন যেখানে যেমন! দেখবে দাসমশাইয়ের কাছে গিয়ে তখন তোমার কাছে আসতেই চাইবেনা, দেখে নিয়ে তুমি
ঠিক এই ঘটনার পরেই কান্ত এসে গিয়েছিল। কতদূর থেকে কেমন করে হাঁফাতে হাঁফাতে সে এসেছে। ঘেমে নেয়ে চান করে উঠেছে বর। সচ্চরিত্র ঘটক রাস্তা থেকেই চিৎকার করতে করতে আসছিল–বর এসে গেছে। বর এসে গেছে, উলু দাও গো, উলু দাও
চারদিকে হইহই কাণ্ড তখন। লোকজন খেতে বসেছিল উঠোনের মাঝখানে। সিদ্ধান্তবারিধিমশাই তখন সম্প্রদান সেরে গামছা দিয়ে গায়ের ঘাম মুছছেন। সব কথা কানে গিয়েছিল মরালীর। সব দেখা দেখে নিয়েছে। অনন্তদিদির বর দেখে একদিন ঘেন্না হয়েছিল মরালীর। নন্দদিদির বিয়েও দেখেছিল। আজও অশোক-ষষ্ঠীর দিন নন্দদিদি উপোষ করে কলাগাছের পায়ে তেল-সিঁদুর দিয়ে এসে তবে জল খায়। তাদের পাশাপাশি তার নিজের বরের দিকে চেয়েও যেন কেমন ঘেন্না হল। হঠাৎ তার দুর্গাদিদির কথা মনে পড়ল। দুগ্যাদি কত ওষুধবিষুধ জানে। ছোট বউরানিকে ওষুধ দিয়ে ছোটমশাইকে বশ করে রেখেছে।
চুপি চুপি বললে–পিসি—
নয়ানপিসি বললে–কী রে? কান্না থামল তোর?
মরালী বললে–দুগ্যাদি আসেনি পিসি?
হ্যাঁ, কেন রে? ওই তো উঠোনে বসে খাচ্ছে—
একবার ডেকে দেবে পিসি?
তারপর খাওয়াদাওয়ার পর দুর্গা এল। বললে–ডাকছিলিস নাকি রে মরি আমাকে?
আদর করে মাথায় হাত বুলোত বুলোতে বললে–বেশ ভাতার হয়েছে লো তোর, দেখলুম, বেশ ভাতার।
হঠাৎ মরালীর চোখে জল দেখে বললে–ওমা, কঁদছিস কেন লা? ভাতার বুঝি পছন্দ হয়নি?
মরালী যেন ডুকরে কেঁদে উঠল। বললে–দুগ্যাদি, তুমি যে সেই আমাকে ওষুধ দেবে বলেছিলে?
কীসের ওষুধ লা?
মরালী বলে উঠল আমি মরব দুগ্যাদি, আমি বিষ খেয়ে মরব—
চুপ কর মুখপুড়ি, চুপ কর–
দুর্গা চারদিকে চেয়ে একবার দেখে নিলে। কেউ শুনতে পেয়েছে কি না কে জানে। নিজের আঁচল দিয়ে মরালীর চোখ দুটো মুছিয়ে দিলে। কোলে টেনে নিয়ে বোঝালে। বললে–মুখপুড়ি, তোর কপালে অনেক দুঃখু আছে, মেয়েমানুষের অত অসৈরন হলে চলে?
মরালী কাঁদতে কাঁদতে বললে–আমায় মরবার একটা ওষুধ দাও দুগ্যাদি, তোমার দুটি পায়ে পড়ি আমি
দুর্গা কেমন যেন বোবা হয়ে গেল। অনেককে দুর্গা ওষুধ দিয়েছে। থুনকোর ওষুধ দিয়েছে গিরিরানির মাকে, বাধকের ওষুধ দিয়েছে বৈরাগীদের বউকে, বশীকরণের ওষুধ দিয়েছে অনন্তবালাকে। আরও কত কাজে কত ছেলেমেয়ে এসেছে তার কাছে। দুর্গার ওষুধ আজ পর্যন্ত কখনও ব্যর্থ হয়নি। জলপড়া, আগুনে পোড়া, নখদর্পণ, বাঘের মুখখিলানি, বাটি চালানো ওষুধ তো কম জানে না দুর্গা। কিন্তু এমন ওষুধ তো দুর্গার জানা নেই। স্বামীকে যার পছন্দ হয় না বিয়ের রাত্রে, তার প্রতিকার কেমন করে করবে দুর্গা!
তা হ্যাঁ লো, বর বুঝি তোর পছন্দ হয়নি?
মরালী বললে–আমি গলায় দড়ি দেব দুগ্যাদি
দুর্গা বললে–মেয়েমানুষের অত পছন্দর বালাই কেন বল তো মরি? মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছিস, অত অসৈরন হলে চলে?
মরালী বললে–তা হলে কালকে আমার মরা মুখ দেখো তুমি দুগ্যাদি
দুর্গা যেন কী ভাবলে। বললে–বোস, দাঁড়া দেখি কী করতে পারি
তারপর একটু ভেবে বললে–তুই এখন থেকে পালাতে পারবি?
আমি চুলোয় যেতে পারি দু্যাদি, আমাকে তুমি বাঁচাও
আর তার পরেই সেই রাত্রে যখন বাসরঘর থেকে সবাই বাইরে খেতে গেছে, উদ্ধব দাস মরালীর হাতটা চেপে ধরে ছিল। ঠিক তখনই বলা কওয়া নেই, নিজের হাতটা টেনে নিয়ে খিড়কির দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। দুগ্যাদি বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। হাত ধরে নিয়ে বললে–চেঁচাসনে, আয়,-সব ব্যবস্থা করে রেখেছি
মাধব ঢালি পাহারা দিচ্ছিল রাজবাড়ির সদর দরজায়। একমুখ দাড়ি-গোঁফ। মাথায় গামছা বেঁধে, সড়কি আর লাঠিটা পাশে পাশে রেখে একটু বুঝি ঢুলছিল। একবার খুট করে শব্দ হতেই বাঘের মতো লাফিয়ে উঠেছে।
