কালীকৃষ্ণ সিংহ বললে–সব খবর পাওয়া যায়নি। আমাদের উকিল তো আর সেখানে ছিলেন না। খবরটা যা লোকমুখে শুনেছেন, তাই জানিয়েছেন।
আর ক্লাইভসাহেব?
সে তো সেই ময়দাপুরেই ছাউনি করে আছে।
তা শহরের ভেতরে ঢুকছে না কেন?
ভয়ও তো আছে। মিরজাফর সাহেবকে তো এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।
আর নবাব? নবাবের শেষ খবরটা কী?
দেওয়ানমশাই বললে–নবাব আর একবার চেষ্টা করছে যদি সৈন্য-সামন্ত জোগাড় করে ফৌজ তৈরি করতে পারে। তা তত টাকাও আর নেই, আর জগৎশেঠজিও সোজা বলে দিয়েছেন, তার অত, টাকা দেবার ক্ষমতাই নেই
এই পর্যন্তই কথা হয়েছিল রাত্রে। তারপর খাওয়াদাওয়া করে শুতে গেছেন অন্দরমহলে। মাথার মধ্যে কদিন ধরেই দুশ্চিন্তা ছিল। দুশ্চিন্তা ছিল রাজধানী নিয়ে, লড়াই নিয়ে, লড়াইয়ের ফলাফল নিয়ে। ভেবেছিলেন লড়াইটা মিটে গেলে দুশ্চিন্তাটা কাটবে। কিন্তু আরও যেন জটিল হয়ে গেল জিনিসটা। মসনদের ব্যাপারটা মিটল না, তবু আগে থেকেই টাকা দিতে হবে! এ তো বেশ আবদার!
দেওয়ানমশাইকে বলে রেখেছিলেন–রাত্রে যদি কিছু খবরটবর পান আমাকে ডাকনে। আমি ঘুমিয়ে থাকলেও আমাকে জানাবার ব্যবস্থা করবেন। আমি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে রইলাম।
শোবার আগে গৃহিণীকেও বলে রেখেছিলেন–রাত্রে যদি কেউ এসে ডাকে তো আমাকে জাগিয়ে দিয়ো
গৃহিণী বলেছিলেন–তোমার অত কষ্টের ঘুম, না-হয় ভোরে ঘুম থেকে উঠেই শুনো–
মহারাজ বলেছিলেন–না, হাজার হাজার লোক আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে, আমি যদি ঘুমোই তো তাদের কথা কে ভাববে?
এরপর আর বেশি কথা হয়নি। নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু গৃহিণীর ডাকে উঠে পড়েই সব ব্যাপারটা শুনলেন। হাতিয়াগড়ের বড়রানির পাঠানো চিঠিটাও পড়লেন। বহুদিন ধরে ছোটমশাইয়ের কোনও খবর পাননি। মহারানির কাছে লিখেছেন, তিনি যদি কিছু সংবাদাদি দিতে পারেন।
সেই রাত্রেই আবার শোবার ঘর ছেড়ে নীচে এলেন। দেওয়ানমশাই আগেই এসে বসে ছিল। হাতিয়াগড় থেকে আসা লোকটাও এসেছিল।
তা তুমি কী করে জানলে যে নবাব রাজধানী ছেড়ে চলে গেছে?
আজ্ঞে, মহারাজ, আমি নৌকোর মাঝিদের কাছে শুনলাম।
কখন পালিয়েছে নবাব?
তা ঠিক বলতে পারিনে হুজুর। নৌকোর মাঝিরা বলছিল মুর্শিদাবাদের ঘাটে অনেক নৌকো যেতে
দেখেছে, তাতে নাকি মেয়েছেলে ছিল, বোধহয় বেগমসাহেবা-টাহেবা কেউ হবেন। সঙ্গে লোকশকর, পেয়াদা ছিল, দেখে নবাব বলেই মনে হয়েছে তাদের।
আর কী বললে–তারা?
আর বলছিল ময়দাপরে আসবার পথে ফিরিঙ্গি সাহেবরা হাঁটা-পথে নৌকো-পথে যাকে দেখছে তাকেই ধরছে, ধরে ধরে সবাইকে তল্লাশি করছে। যার কাছে যা টাকাকড়ি আছে সব কেড়ে নিচ্ছে। একজন বেগমসাহেবাকেও নাকি ধরেছে।
চেহেল্-সুতুনের বেগমসাহেবা?
আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর। বেটাছেলের সাজপোশাক পরে যাচ্ছিল, তাকেও নাকি ধরে তল্লাশি করতে গিয়ে জানা গেছে তিনি চেহেলসূতুনের বেগমসাহেবা।
এরপর সব শুনে মহারাজ বললেন তুমি অতিথিশালায় গিয়ে থাকো আজকে, তোমার চিঠির জবাব নিয়ে যাবে রানিমার কাছ থেকে।
লোকটা চলে যাবার পর মহারাজ দেওয়ানমশাইকে বললেন–তোমার কী মনে হচ্ছে দেওয়ানশাই, কথাগুলো সত্যি?
আমার তো সত্যি বলেই মনে হচ্ছে।
মহারাজ বললেন–দেখো, সত্যি হলে সত্যিই হবে। কিন্তু সত্যি না-হলেই মঙ্গল।
কেন?
মনে হচ্ছে শেষপর্যন্ত এত টাকা উসুল হবে কার কাছ থেকে। কোটি কোটি টাকার ব্যাপার তো সহজে মিটবে না। হয়তো আমার ঘাড়েই এই সমস্ত দেনাটা বরাত দেবে।
তারপর উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–তুমি শোও গে যাও দেওয়ানমশাই, আমার আর আজ ঘুম আসবে না। আমি চললুম
.
হয়তো রাত শেষ হতে আর বাকি ছিল না। দুর্গা ভোরবেলাই উঠেছে। ছোট বউরানি তখনও ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎ দুর্গার ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল।
ও বউরানি ওঠো, ওঠো–বড় বউরানির চিঠি এসেছে গো।
তাড়াতাড়ি ধড়মড় করে উঠেছে বউরানি। বললে–কোথায়? কার কাছে চিঠি এসেছে
দুর্গা বললে–শয়তান নবাবটা মরেছে গো, এখনই রানিমা বললে–
কোন শয়তান? কার কথা বলছিস? নবাব? মুর্শিদাবাদের নবাব?
দুর্গা বললে–হাতিয়াগড়ের লোক এসেছে চিঠি নিয়ে। জগা খাজাঞ্চিবাবু পাঠিয়েছে–
কে লোক? কে?
দুর্গা বললে–তা জানিনে বউরানি, শুনছি হাতিয়াগড় থেকে বউরানির চিঠি নিয়ে এসেছে সেই কথাটা আমি তোমাকে বলতে এলাম আমি এখনই আবার যাচ্ছি দেখা করতে
রাজবাড়ির অতিথিশালায় তখন বেশ ভিড়। হাতিয়াগড়ের লোকটা রাত্রের অন্ধকারের মধ্যেই এসে ঢুকেছিল সেখানে। তখন কাউকেই দেখতে পায়নি। কিন্তু ভোরবেলাই দেখে, উদ্ধব দাস এক কোণে চুপ করে বসে আছে।
কাছে গিয়ে বললে–কী গো, দাসমশাই, তুমি? তুমি এখেনে কী করতে?
উদ্ধব দাসও চিনতে পেরেছে। বললে–গোকুল যে! তুমি কী করতে?
গোকুল বললে–আমি এসেছি রাজকার্যে। আর তুমি? তোমার শ্বশুর সেই শোভারাম, পাগল হয়ে গেছে শুনেছ তো? মেয়ের শোকে একেবারে মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। তা তোমার বউয়ের আর কোনও খবর পাওনি?
উদ্ধব দাস বললে–পেয়েছি। এখানেই আছে—
এখানে?
হ্যাঁ গো, অ্যাদ্দিন কলকাতায় সাহেবের বাগানবাড়িতে ছিল, সাহেব লড়াই করতে চলে যাবার পর এখানে এসে উঠেছে।
গোকুল অবাক হয়ে গেছে। বললে–এখানে? এই রাজবাড়িতে?
হ্যাঁ গো, হ্যাঁ, কতবার বলব তোমাকে? তুমি আজকাল কালা হয়েছ নাকি? কানেও শুনতে পাও না? তা ছোটমশাইয়ের হুকুম তামিল করো কী করে?
