কিন্তু সমস্ত রাস্তাটাই লোকে-লোকারণ্য। দলে দলে সমস্ত লোক মুর্শিদাবাদ ছেড়ে হাঁটা-পথে রওনা দিয়েছে। সঙ্গে যে যা পেরেছে নিয়ে চলেছে। ছোট ছেলেমেয়ে পোঁটলা-পুঁটলি কাঁধে। হরিনামের মালা জপছে। আর বুকের মধ্যে নিয়েছেনারায়ণশিলা। ম্লেচ্ছরা আসছে আবার। দেশ-ডুই উচ্ছন্নে যাবে। সেই ভোরবেলা থেকেই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। এত রাত হয়েছে, তখনও রাস্তায় লোকের বিরাম নেই। সবাই চলেছে পূর্বপুরুষের বাস্তুভিটে ছেড়ে।
ক্লাইভ তখনও অপেক্ষা করছিল।
ওয়াটস্ যেতেই ক্লাইভ বললে–কী খবর?
ওয়াটস্ বললে–টাকা দেবে না জগৎশেঠ।
দেবে না?
ওয়াট বললে–না, জগৎশেঠজি বললে–অত টাকা তার কাছে নেই।
ক্লাইভ বললে–তা হলে কোম্পানির যে এত টাকা খরচ হল, এ কীসের জন্যে? কাদের জন্যে? এ-টাকার দায় নেবে কে? কোম্পানি না বাংলার নবাব?
ওয়াটস্ বললে–সে কথা আমরা বলেছি, কিন্তু টাকা ওদের নেই
ক্লাইভ বললে–ওদের না থাকতে পারে কিন্তু লোন দিক, নবাবের ক্যাশ পেলে তখন আমি সব লেন মিটিয়ে দেব
ওয়াটস্ বললে–কিন্তু নবাবের কাছেও আর কিছু নেই। নবাবের যা-কিছু টাকা ছিল, সমস্ত চ্যারিটি করে দিয়েছে
সেকী?
ওয়াটস বললো, হ্যাঁ মিরজাফর আলি বলে দিয়েছে, টাকাকড়ি নিয়ে যারা পালাচ্ছে, তাদের যেন আমরা আটকাই–প্রত্যেকটা নৌকো যেন আমরা সার্চ করি, প্রত্যেককে যেন আমরা গ্রেফতার করি তাদের ধরলে আমরা অনেক টাকা পাব
পরের দিন থেকে সেই হুকুমই হল। হাঁটা-পথে, নদী-পথে নৌকোয় যারাই যাবে, তাদেরই চ্যালেঞ্জ করা হবে। কাউকে ছাড়া হবে না। নবাবের টাকা দেবার তো রাইট নেই। নবাবের টাকা তো কাস্ট্রির টাকা–
তখন থেকেই সকাল-সন্ধেরাত নৌকো গেলেই নদীর ওপর থেকে সেপাইরা চ্যালেঞ্জ করতে লাগল-হ–হল্ট–
রাস্তার লোকদেরও থামিয়ে দিয়ে গ্রেফতার করা হতে লাগল। বডি সার্চ করে টাকাকড়ি যা-কিছু পাওয়া গেল কেড়ে নেওয়া হল। তারপর সব কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দিতে লাগল। যাও, এবার খালি হাতে যাও যেদিকে চোখ যায়, চলে যাও
সমস্ত রাত ধরে পাহারা বসল গঙ্গার ধারে। অন্ধকারে নৌকো আসতে দেখলেই সেপাইরা চিৎকার করে উঠতে লাগল-হল্ট-হল্ট
কিন্তু সেদিন ভোরবেলা যখন মিরন এসে খবরটা দিয়ে গেল যে, নবাব মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তখন কর্নেল ক্লাইভ পরামর্শ করবার জন্যেই মেজর কিলপ্যাট্রিককে ডেকে পাঠিয়েছিল।
কিলপ্যাট্রিক আসতেই ক্লাইভ বললে–শুনেছ মেজর, নবাব মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে গেছে?
ঠিক সেই সময়েই হঠাৎ সেন্ট্রি-গার্ড এসে খবর দিলে কর্নেল, রাত্রে একটা নৌকো ধর পড়েছে
ক্লাইভ বললে–কত টাকা পাওয়া গেছে তাদের কাছ থেকে?
গার্ড বললে–টাকা পাওয়া যায়নি, কিন্তু মনে হচ্ছে তারা স্পাই, নবাবের স্পাই–
স্পাই?
গার্ড বললে–হা কর্নেল, ফিমেল স্পাই–পুরুষের পোশাক পরে ছদ্মবেশে পালাচ্ছিল—
ফিমেল স্পাই?
মুনশি নবকৃষ্ণও কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেল। মেয়েমানুষ-চর! পুরুষমানুষের পোশাক?
ক্লাইভ বললে–নিয়ে এসো আমার কাছে
খানিক পরেই যে সামনে এসে দাঁড়াল, তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল কর্নেল ক্লাইভ। একটু তী নজর দিয়ে দেখলে। এমনিতে তো বোঝা যায় না যে ফিমেল। ঠিক বাঙালি পুরুষদের মতোই পোশাক। পরেছে। গায়ে আবার চাদর ঢাকা।
গার্ড বললে–এ পুরুষ নয় কর্নেল, ফিমেল। মেয়েমানুষ। এর বডি সার্চ করতে গিয়ে টে পেয়েছি
ক্লাইভ উঠে দাঁড়িয়ে সামনে গেল। তারপর চাদরটা মাথা থেকে খুলে দিলে। যেন চেনা চেনা মুখট মনে হল।
ক্লাইভ বললে–তোমাকে কোথায় দেখেছি বলো তো? হোয়ার? হু আর ইউ? তুমি কে?
মরালী বললে–সকলের সামনে বলতে পারব না সাহেব। আড়ালে বলব—
আড়ালে? বেশ আড়ালেই চলো
গার্ড বললে–ওর সঙ্গে আর একটা বুড়োমানুষ আছে কর্নেল
ক্লাইভ বললে–তা থাক, পরে দেখব
বলে পাশের ঘরের দিকে গেল। মরালীও সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতর ঢুকল।
দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ক্লাইভ বললে–এখন বলল কে তুমি?
মরালী বললে–সত্যিই আমাকে চিনতে পারছেন না?
না।
মরালী বললে–আমিই পেরিন সাহেবের বাগানে আপনার দফতর থেকে একদিন আপনার চিঠি চুরি করেছিলাম
সেকী? তুমি… তুমি মরিয়ম বেগম?
মরালী বললো হ্যাঁ।
*
কৃষ্ণনগরে অনেক রাত্রে মহারাজ তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। হঠাৎ গৃহিণী ডাকলেন। সামান্য ডাকেই উঠে পড়েছেন মহারাজ।
বললেন–কী? কী হল?
গৃহিণী বললেন–এই দেখো, হাতিয়াগড়ের বড়রানির কাছ থেকে চিঠি নিয়ে লোক এসেছে, বি দিয়ে গেল এখনই, বললে–জরুরি চিঠি। লোকটা বলছে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাকি মুর্শিদাবাদ থেকে পালিয়েছে রাস্তায় শুনে এসেছে
মহারাজের তন্দ্রাটা ভেঙে গেল।
বললেন–দেখি চিঠিটা—
গৃহিণী বললেন চিঠি তোমার নামে নয়, লিখেছেন আমাকে
.
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সন্ধেবেলাই মুর্শিদাবাদের খবর পেয়েছিলেন। দেওয়ান কালীকৃষ্ণ সিংহমশাইয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ আলোচনাও করেছিলেন।
বলেছিলেন–আমি তখনই বলেছিলাম দেওয়ানমশাই, মতলব ভাল নয় ক্লাইভ সাহেবের। ওদের লড়াইয়ের খরচ আমরা কেন দিতে যাব?
দেওয়ানমশাই বলেছিলেন–ক্লাইভ সাহেবের লোক সেখানে ছিল, সে বললে–দু’কোটি কুড়ি লাখ টাকা তাদের দিতেই হবে। আসলে লড়াইটা করেছে তো আমাদেরই জন্যে। আমরাই তো তাকে ডেকে এনেছি
তা তো ডেকেছি। কিন্তু এর জন্যে এত টাকা? তা ছাড়া, কাজটা তো এখনওই শেষই হল না। এরা তো দেখছি পাকা কারবারি জাত। কাজ ফতে হবার আগেই টাকা চায়। তা খবর পেয়েছ আর কে কে ছিল?
