কোথায় কে মরে পড়ে আছে, তার খবর রাখবার তখন সময় নেই কারও।
আর নবাব? নবাব কী করছে? কী মতলব নবাবের?
জগৎশেঠজি বললেন–আমাকে নবাব ডেকে পাঠিয়েছিল, ফৌজ তৈরি করবার জন্যে। আমার কাছে টাকা চাইছিল, আমি বলেছি, আমার কাছে টাকা নেই এখন!
ওয়াটস্ সাহেব বললে–কর্নেলসাহেব আমাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে তার কিছু টাকা দরকার–হাতে কিছু টাকা নেই, লড়াইতে সব টাকা ফুরিয়ে গেছে
মিরজাফর সাহেব জিজ্ঞেস করলে–কত টাকা দরকার?
দু’কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা।
জগৎশেঠজির মুখখানা গম্ভীর হয়ে গেল কথাটা শুনে।
ওটা নবাবের কাছ থেকে দিলেই চলবে। ওই টাকাটা পেলে তবে কর্নেল সিটির দিকে আসবেন।
মিরজাফর আলি বললে–কিন্তু টাকাটা পরে দিলে চলবে না?–নবাবকে গ্রেপ্তার করার পর আমি আদায় করে দেব।
রাজা দুর্লভরাম এতক্ষণে কথা কইলে! বললে–এত টাকা নবাবের সিন্দুকে নেই
সেকী? মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছে দু’কোটি কুড়ি লাখ টাকা নেই?
থাকলে তো নবাব এখনই ফৌজ বানিয়ে আবার লড়াই শুরু করে দিত!
কিন্তু টাকাটা যে চাই-ই কর্নেলের। একটু তাড়াতাড়িই চাই। নইলে আপনাদেরই ডেঞ্জার। মঁসিয়ে ল হয়তো দু-একদিনের মধ্যেই এসে যাবে এখানে।
মিরজাফর আলির ভয় হয়ে গেল কথাটা শুনে। ল’সাহেব আসছে?
তাড়াতাড়ি জগৎশেঠজির দিকে চেয়ে বললে–আপনি টাকাটা দিয়ে দিন জগৎশেঠজি, আমি নবাব হলে সব টাকা আপনার শোধ করে দেব, আপনাকে কথা দিচ্ছি–
রাজা দুর্লভরাম বললে–আর যদি টাকা না দিতে পারি আমরা তো কর্নেল মুর্শিদাবাদে আসবেন না?
ওয়ালস্ বললেন –না
ছোটমশাই এতক্ষণ একপাশে বসে ছিল। বললে–জগৎশেঠজি, টাকাটা আপনি দিয়েই দিন, আমার নিজের টাকা থাকলে আমি দিয়ে দিতাম
জগৎশেঠজি তখনও চুপ করে আছেন। মনে মনে ভাবছিলেন, একজন নবাব লড়াইতে হেরে টাকা চাইছে তার কাছে, আর-একজন লড়াইতে জিতে টাকা চাইছে। এই এরই কাছে একদিন সবাই দরবার করেছে নবাবকে জব্দ করবার জন্য। এই একেই তারা সবাই মিলে বাংলা মুলুকে ডেকে এনেছে। এরও চাই টাকা!
ওয়াটস্ আর ওয়ালস উঠল।
বললে–তা হলে স্যার আমরা উঠি
জগৎশেঠজি রূঢ় গলায় বললো, হ্যাঁ উঠুন আপনারা
মিরজাফর আলি জগৎশেঠজির কাছে সরে এসে বললে–জগৎশেঠজি, আমি কথা দিচ্ছি, আমি নবাব হয়ে আপনাকে সব টাকা শোধ করে দেব, আপনি টাকাটা দিয়ে দিন
ছোটমশাইও বললে–হ্যাঁ জগৎশেঠজি, আপনি টাকাটা দিন নইলে ল’সাহেব এসে পড়লে আবার যে কে সেই অবস্থা হবে
জগৎশেঠজি পাথরের মতো নির্বিকার হয়ে তখনও চেয়ে আছেন। চেয়ে আছেন না ভাগ্যের পরিহাসের কথা ভাবছেন, কে জানে! এই এঁদেরই তিনি বাংলা মুলুকের ভাগ্যনিয়ন্তা করে ডেকে এনেছেন এত আদর করে। মিরজাফর সাহেব এই এঁদেরই পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।
বাইরে ভিখু শেখ হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছে–কৌন হ্যায়?
রাত নয়, অন্ধকার নয়, কিছু নয়। তবু এত হুশিয়ারি ভাল লাগে না বশির মিঞার।
বশির মিঞা রেগে বললে–আমি রে বাবা, আমি। বাঘ নই, ভাল্লুক নই, আমি বশির মিঞা
পাঞ্জা হ্যায়?
অর্থাৎ ভেতরে ঢোকবার মঞ্জুরি আছে কিনা!
বশির মিঞা বললে–এই দেখ বাবা, এই দেখ, পাঞ্জা দেখ–খাস নিজামতের মোহরার মনসুর আলি মেহের সাহেবের মঞ্জুরি
ভিখু শেখ আর কিছু বললে–না। কুত্তিকা বাচ্চারাও আজকাল পাঞ্জা আনছে সঙ্গে করে। দুনিয়া বেহেঁশ হয়ে গেছে। যা, অন্দর যা ভাগ
তারপর সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভিখু শেখ দুনিয়াদারির বেহাঁশি দেখে তাজ্জব হয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল।
আর ভেতরে তখন সবাই মনসুর আলি মেহের সাহেবের চিঠি পড়ে আরও তাজ্জব হয়ে গেছে।
মোহরার সাহেব লিখছে–নবাব খাজাঞ্চিখানার তহবিল থেকে সব টাকা দান-খয়রাত করবার হুকুমজারি করেছে। যে এসে চাইছে, তাকেই টাকা দেওয়া হচ্ছে। তহবিলের টাকা দেওয়া আরম্ভ হয়েছিল বিকেলবেলা, এখনও দেওয়া শেষ হয়নি। আর ঘড়ি দুই পরে তহবিলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আপনাকে সংবাদটা জানালাম, কিংকর্তব্য জানাবেন
ওয়াটস্ আর ওয়ালস্ কিছুই বুঝতে পারেনি এতক্ষণ।
জিজ্ঞেস করলে–কী হয়েছে?
মিরজাফর তখনও চিঠিটা বারবার পড়ছে।
হঠাৎ কী করবে যেন মাথায় কিছু এল না। সব টাকা উড়িয়ে দিয়ে তবে কি পালিয়ে যেতে চায় নবাব?
ওয়াটস্ আবার জিজ্ঞেস করলে কী হয়েছে জেনারেল?
মিরজাফর বললে–নবাব সব টাকা বিলিয়ে দিচ্ছে সকলকে, যত টাকা আছে নিজামতে সব দান-খয়রাত করে দিচ্ছে
এতক্ষণে যেন বুঝতে পারলে তারা। তা হলে মুর্শিদাবাদ ক্যাপচার করে তাদের বেনিফিট কী হবে?
কিছুই না। একেবারে ফাঁকা সিন্দুক পড়ে থাকবে। যদি পারো এখনই হামলা করতে বলো কর্নেল সাহেবকে। আর যেন দেরি না করেন।
সত্যিই দু’জন ফিরিঙ্গি তখন ভাবনায় পড়েছে।
বশির মিঞা বললে–সবাই টাকা-মোহর নিয়ে নৌকো করে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালাচ্ছে হুজুর, আমি দেখে এসেছি–
তখন আর কোনও বুদ্ধি মাথায় আসছে না কারও। সমস্ত পরিকল্পনা যেন গোলমাল হয়ে গেছে। যাও, এখনই চলে যাও সাহেব। এখনই কর্নেলকে গিয়ে বলো যেন আর দেরি না করে। রাস্তায় যাকে পাবে, তাকেই যেন গ্রেফতার করে। নদীতে নৌকো দেখলেই ধরতে হুকুম দাও। সবাই নিজামতের টাকা নিয়ে পালাচ্ছে। আর দেরি কোরো না, যাও–যাও
ওয়াটস্ আর দেরি করেনি। সঙ্গে ওয়ালও তাড়াতাড়ি ঘোড়ায় উঠে সোজা দৌড় দিয়েছে কাশিমবাজারের দিকে। কাশিমবাজার পেরিয়েই ময়দাপুর।
