সচ্চরিত্র বললে–কিন্তু মা, তোমাকে চিনতে পারবে কী করে? তুমি তো এখন বেটাছেলে সেজে আছ?
মরালী বললে–না চিনতে পারলে তো ভালই, কিন্তু চিনতে পারলেও ক্ষতি নেই—
কেন?
ওই ক্লাইভ সাহেবের ছাউনিতেই হাতিয়াগড়ের ছোটরানি অনেকদিন ছিল, ওদের খুব যত্নে রেখেছিল সাহেব। ওদের মুখেই আমি সাহেবের প্রশংসা শুনেছি
ততক্ষণে কতকগুলো ফিরিঙ্গি নৌকো ঘাটে ভিড়তেই সামনে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
হ্যান্ডস আপ! হ্যান্ডস আপ
সচ্চরিত্র মানে বুঝতে পারলে না।
হাত উঠাও, হাত উঠাও-হাত উপরে উঠাও
মরালী নিজের দুটো হাত ওপরে উঁচু করে তুলল। সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ তার দেখাদেখি হাত ওঠাল। মাঝিরাও উঠে হাত তুলে দাঁড়াল।
তারপর সেপাইরা সামনে বন্দুক উঁচু করে ধরে বললে–ওঠো, ওপরে চলো
আগে মরালী—
তার পেছনে সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ।
আর তার পেছন পেছন মাঝিরা।
সবাই সেই অন্ধকারের মধ্যে পা ফেলে ফেলে উঁচু পাড় ভেঙে ডাঙার ওপরে উঠতে লাগল।
*
জগৎশেঠজির হাবেলির ভিখু শেখ সেদিন একটু বেশি গরম হয়ে গিয়েছিল। কদিন ধরে যেন সব নিয়মমাফিক চলছে না। যে-সময়ে হাবেলিতে লোক আসা নিয়ম, সেসময়ে আসছে না। যে-হাবেলিতে ভিখু শেখ পাহারাদার, সে যে-সে হাবেলি নয়, এইটেই ছিল তার ইজ্জত। সেই ইজ্জতেই যেন কদিন থেকে আঘাত লেগেছে।
কৌন হ্যায়? কৌন?
তারপর যখন দেখেছে মিরজাফর সাহেব, তখন মাথা নিচু করে কুর্নিশ করেছে।
আবার খানিক পরেই আর একজন।
কৌন হ্যায়? কৌন?
তারপর যখন দেখেছে রাজা দুর্লভরাম, তখন মাথা নিচু করে কুর্নিশ করেছে।
এমনি করে লোক আসার যেন আর বিরাম নেই। এক এক করে সারা মুর্শিদাবাদের তামাম রেইস আদমি এসে হাজির হয়েছে মহিমাপুরে। কেউ আর পাঞ্জা দেখায় না। পাঞ্জা দেখাবার কিংবা পাঞ্জা দেখবার দরকারই হয় না। আর শহর মুর্শিদাবাদও হয়েছে তেমনি। শহরে যত বেকার আদমি সব বিলকুল রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। ক্যা হুয়া? হুয়া হ্যায় ক্যা?
ভিখু শেখ নিজের মনে নিজেকেই প্রশ্ন করে। সবাই কি পাগল হয়ে গেল? সবাই দিমাগ হারিয়ে ফেললে?
কৌন হ্যায়?
চারদিকে যেন সবাই দিওয়ানা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোক দেখেই নেশার ঘোরে ভিখু শেখ চিৎকার করে ওঠে–কৌন হ্যায়?
ওটা যেন ওর বুলি। বলতে বলতে মুদ্রাদোষে পঁড়িয়ে গেছে। মানুষের ছায়া দেখলেও বলে, মানুষের গন্ধ পেলেও বলে। কোথা থেকে হঠাৎ এত মানুষের আমদানি হল শহরে, তা সে বুঝতে পারে না। ভোররাত থেকে আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে, তা তখনও থামেনি।
এই মহিমাপুর-মহারাজার হাবেলির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভিখু শেখ তার জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে, তার চোখের আড়ালে এই দুনিয়াটা কত তাড়াতাড়ি আসমান-জমিন বদলে যাচ্ছে। বুঝতে পারেনি যে, শুধু বন্দুক দিয়ে পাহারা দিলেই সবকিছু নিরাপদ থাকে না। বুঝতে পারেনি যে তার দৃষ্টি আর তার বন্দুকের আড়ালে আর-একটা দুনিয়া আছে, যেখানে আর-একজন অদৃশ্য ভিখু শেখ আরও কঠোর আরও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে মানুষের মনের হাবেলির সব ফটকগুলো পাহারা দিচ্ছে। ভিখু শেখ সেই ভিখু শেখকে চেনে না বলে জগৎশেঠজির হাবেলির ফটক পাহারা দেয়, আর চিৎকার করে বলে–কৌন হ্যায়?
কিন্তু না-জানাই বোধহয় ভিখু শেখদের পক্ষে মঙ্গল। জানলে অমন বিশ্বস্ত হয়ে আর পাহারাও দিত না। অমন কথায় কথায় চেঁচাতও না। জগৎশেঠজির বাস্তব-সংসারটাও ভিখু শেখদের অভাবে অচল হয়ে যেত। ভিখু শেখরাও চাকরি ছেড়ে দিয়ে মুলুকে ফিরে গিয়ে উপোস করে মরত।
কিন্তু এসব কথা ভিখুদের শেখানোও হয় না; ভিখু শেখরাও এসব কথা শিখতে চায় না। ভিখ শেখরা বলে তুমি আমার মালিক, আমি তোমার সেবা করেই জীবন সার্থক করব। আমার চোখের সামনে আমার গাফিলতিতে হাবেলির মালিক বদলিয়ে যাবে, তা আমি সহ্য করব না।
তবু ইতিহাসের অমোঘ পরিহাসে এক-একবার ভিখু শেখদের চোখ খুলে যায়। তারা দেখে, তাদের পাহারা দেওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ কখন রাজ্যপাট বদলে গেছে, হঠাৎ কখন মসনদ জগৎশেঠজির হাতছাড়া হয়ে গেছে।
১৭৫৭ সালের ২৫ জুন সেই ঘটনাই ঘটল।
সকালবেলা মিরজাফর আলি শহরে ফিরে এসেই খবর পেলে, জগৎশেঠজিকে ডেকে পাঠিয়েছে নবাব। রাজা দুর্লভরামও আর দেরি করেনি। সবাই জগৎশেঠজির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
চেহেল্-সুতুনের আমদরবার থেকে ফিরতেই ভিখু শেখ এক লাফে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ ঠুকেছে।
কে কে আছে ভেতরে?
দেওয়ান রনজিৎ রায় বললে–রাজা দুর্লভরাম, মিরজাফর আলি সাহেব আর হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই
সেই যে দরবার বসেছিল তাদের, সে আর খতম হয় না। ভিখু শেখ সেই তখন থেকেই ফটকে পাহারা দিচ্ছে। তারপর দুপুর হল, বিকেল হল, একসময়ে সন্ধেও হল। পুবদিকে সূর্যটা উঠে আবার পশ্চিম দিকে ডুবেও গেল। কিন্তু দরবার শেষ হল না।
সন্ধের অন্ধকারে এল মিরন। আর তারপরে এসে হাজির হল ফিরিঙ্গি ফৌজের ওয়াটস্ আর তার সঙ্গে আর-একজন।
জগৎশেঠজি চিনতে পারলেন না তাকে। জিজ্ঞেস করলেন–ইনি কে?
ওয়াটস্ বললে–ইনি মিস্টার ওয়ালস, কম্যান্ডার ক্লাইভের সেক্রেটারি
ক্লাইভ কখন আসবেন?
আমাদের কাছ থেকে সিটির হালচাল কী রকম শুনে তবে আসবেন, তিনি এখনও ময়দাপুরে ক্যাম্প করে আছেন। আমরা গিয়ে সব রিপোর্ট দেব। রাজধানীর কী অবস্থা এখন? রাস্তায় রাস্তায় তো গোলমাল দেখলাম। একটা দোকানের সামনে একটা বুড়ো লোকের ডেডবডি পড়ে থাকতে দেখলাম–কে ও?
