সচ্চরিত্র বলেছিল–কেন, সন্দেহ করবে কেন?
মাঝিরা বলেছিল–আজ্ঞে মিঞাসাহেব, নিজামতের চরেরা সন্দেহ করবে, ভাববে সোনাদানা নিয়ে পালাচ্ছে। চার দিকে বড় চর লেগেছে
তা তাই-ই সই। সেই রাত্রের দিকেই নৌকোটা ছেড়েছিল। হাতিয়াগড়ের দিকে যেতে হবে। একটু তাড়া আছে। তার বেশি কিছু খুলে বলেনি সচ্চরিত্র। নৌকোটা ছপাত ছপাত করে দাঁড় বেয়ে বেয়ে চলেছে। মরালীর মুখে কথা নেই। একটার পর একটা গ্রাম ছেড়ে চলেছে আর কেবল মনে পড়েছে কান্তর কথা। কোথায় রইল সে। কোথায় কে তাকে ধরে রাখলে? এতদিনের সম্পর্কটা দিনে দিনে বড় জটিল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ চলে যাবার মুখে যে এতটা টান পড়বে তা বুঝতে পারেনি আগে।
সচ্চরিত্র একবার শুধু বললে–তুমি একটু ঘুমোতে চেষ্টা করো না মা
মরালী বললে–ঘুম যে আসছে না
সচ্চরিত্র বললে–চেষ্টা করলেই ঘুম আসবে। আর বাবাজির জন্যেই ভেবেই বা কী করবে, ভগবানের যদি ইচ্ছে থাকে তো বাবাজির মঙ্গলই হবে। বাবাজি তো কোনওদিন কারও ক্ষতি করেনি।
হঠাৎ একটা জায়গায় আসতেই মনে হল কে যেন চিৎকার করে উঠল।
হল্ট-হল্ট
মরালী ভয়ে চমকে উঠেছে।
ও কী বলছে ঘটকমশাই? ও কারা?
নৌকোটার মাঝিরা অতটা খেয়াল করেনি। তারা চালিয়েই যাচ্ছিল।
আবার পাড়ের ওপর থেকে চিৎকার এল হল্ট হল্ট
.
চারদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে। দুর্যোগের সময় নৌকোতে আলো জ্বালতে বারণ করেছিল সচ্চরিত্র। আগেই বলে দিয়েছিল–একটু সাবধানে নিয়ে যাবে বাবা আমাদের দিনকাল ভাল নয়–
দিনকাল যে ভাল নয় তা মুর্শিদাবাদের মাঝিরাও জানত। কদিন থেকেই কোনও সোয়ারি নেই। আর মাল আসা-যাওয়া তো বন্ধই হয়েছে আগে থেকে। ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই বাধবার সময় থেকে। যারা কারবার করে, তাদের মাল কেনবার খদ্দের নেই। যারা খদ্দের, তারাও মাল কিনে ঘরে তুলতে ভরসা পায় না। মাল শুধু তো কিনলেই চলবে না, তাকে আবার বেচতেও হবে। কিন্তু কাকে বেচবে? যারা বেশি মুনাফা করবে বলে মাল লুকিয়ে রেখেছে, তারাও ভরসা পাচ্ছে না বেচতে। যদি দাম পড়ে যায়! আরও কিছু দাম বাড়ক, তখন বেচব। আবার তা ছাড়াও, আজ নাহয় নবাব সরকার আছে, কিন্তু ফিরিঙ্গিরা যদি হঠাৎ এসে পড়ে এখানে, তখন টের পেলে মাল কেড়ে নিতেও পারে। তখন দামও পেলাম না, মুনাফাও পেলাম না, অথচ মালও খোয়া গেল।
তাই মাঝিরা রাত্রে যাতায়াতের সময় আলো নিবিয়ে দিয়ে অন্ধকারে চলাফেরা করছিল।
কিন্তু এমন যে হবে, তা আগে কল্পনা করা যায়নি।
ওপর থেকে তখনও শব্দ আসছে–হল্ট
এ তো ফিরিঙ্গিদের গলা। এ ভাষাও তৌফিরিঙ্গিদের।
সচ্চরিত্র ভয় পেয়ে গিয়েছিল। মাঝিদের দিকে চেয়ে বললে–নৌকো ঘোরাও গো তোমরা, নৌকোর মুখ ঘোরাও–
মাঝিরা কথার মানে বুঝতে পারেনি।–কী বলছে ওরা খসাহেব? কে ওরা?
সচ্চরিত্র বললে–মানে কি আমিই বুঝেছি? নৌকো ঘোরাও ফিরিঙ্গি-ঘাঁটি ওটা—
মাঝিরা বললে–নৌকো ঘুরিয়ে কোন দিকে যাব? আবার সেই মুর্শিদাবাদ?
তা, কী আর করা যাবে? মরলে নবাবের হাতেই মরা ভাল। ফিরিঙ্গিদের হাতে মরতে যাই কেন বুড়ো বয়সে।
মরালী এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছিল। বললে–না, নৌকো ঘোরাতে হবে না, পাড়ে ভেড়াও
সচ্চরিত্র বললে–কেন মা, নৌকো পাড়ে ভেড়াতে বলছ কেন? শেষকালে যে ফিরিঙ্গি বোম্বেটেদের হাতে পড়ব?
মরালী বললে–তা হোক ঘটকমশাই, এখন পালাতে গেলে বিপদ হবে। আমার মনে হচ্ছে আমরা ফিরিঙ্গি সেপাইদের হাতে পড়েছি।
ফিরিঙ্গি সেপাই! কথাটা শুনেই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই ভয়ে শিউরে উঠল।
মরালী মাঝিদের জিজ্ঞেস করলে–এটা কোন জায়গা, তোমরা জানো?
মাঝিরা বললে–বাবু, এ তো ময়দাপুর।
তা হলে মরালী যা ভেবেছিল তাই-ই ঠিক হয়েছে। ক্লাইভ সাহেব ফৌজ নিয়ে তো এখানেই ঘাঁটি করে রয়েছে। কথাটা চকবাজারের রাস্তার লোকের মুখেই তো শুনে এসেছে সে।
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই তখন থরথর করে কাঁপছে। মরালী বুড়োমানুষকে এক হাত দিয়ে ধরলে।
বললে–আপনি কিছু ভাববেন না ঘটকমশাই, আমি তো আছি। ভয় কী?
সচ্চরিত্র বললে–আমি তো তোমার জন্যেই ভাবছি মা। যদি ওরা জানতে পারে তুমি মেয়েমানুষ, তা হলে কি আর বেটারা ছেড়ে কথা বলবে?
মরালী বললে–সে জানতে পারবে না ঘটকমশাই।
মাঝিরা তখন নৌকো পাড়ে ভেড়াচ্ছিল। পাড়ের ওপর অনেকগুলো লোক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। তারাও আস্তে আস্তে নদীর কিনারায় নেমে আসছে।
সচ্চরিত্র বললে–ওরা যদি তোমার গায়ে হাত দেয়, তা হলে কিন্তু আমি সহ্যি করব না, তা বলে রাখছি মা–
মরালী বললে–আপনি উত্তেজিত হবেন না। আপনি বেশি কথাও বলবেন না। ঠান্ডা হয়ে থাকবেন, যা বলবার আমিই বলব।
সচ্চরিত্র বললে–তুমি ওদের চেনো না মা, তাই অমন কথা বলছ। ওদের বিশ্বাস নেই, ওরা গোরু-শোর খায়, তা জানো?
মরালী বললে–হ্যাঁ তা জানি, ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে আমার জানাশোনা আছে
জানাশোনা আছে মানে?
মরালী বললে–একবার আমি বরানগরে ক্লাইভ সাহেবের ছাউনিতে গিয়েছিলাম। লোকটা ভাল।
ভাল মানে? তুমি বলছ কী?
মরালী বললে–ভাল মানে ভাল। বাইরে থেকে যা শোনা যায়, তার সবটুকু সত্যি নয়। হাজার হোক ফিরিঙ্গি হলেও লোকটা মানুষ তো বটে!
তুমি ওকে মানুষ বলো? ফিরিঙ্গিরা দেশের কত ক্ষেতি করেছে, তা জানো?
সব জানি বলেই ওই কথা বলছি ঘটকমশাই। বুদ্ধিতে আমার সঙ্গে পারবে না। একবার ওর দফতর থেকেই ওরই সামনে থেকে একটা জরুরি চিঠি চুরি করে এনেছিলাম। দেখুন না, আমাকে দেখলে কী বলে?
