ঢোলসহরত শুনে মানুষজন আর বাগ মানে না। সবাই ছুটল খাজাঞ্চিখানার দিকে। নিজামতের খাজাঞ্চিখানার ক’জনই বা লোক। হাজার হাজার লোক গিয়ে হাজির হয়েছে সেখানে। যে যা পারছে টাকা বুঝে নিচ্ছে। না থাক পাওনা, মুফত টাকা যখন পাওয়া যাচ্ছে তখন নিয়ে নাও। ফিরিঙ্গি ফৌজ তো আসবেই। তার আগে কিছু টাকা নিয়ে যেদিকে দুচোখ যায় সেই দিকেই পালাব।
যারা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে দূরে পালিয়ে যাচ্ছিল, পালিয়ে যাবার জন্যে নৌকোয় উঠেছিল, তারাও নেমে পড়ল। টাকা দিচ্ছে, নিতে হবে না? টাকা যে জীবনের চেয়েও দামি গো।
মানুষের লোভ, মানুষের পাপ, মানুষের প্রবৃত্তি সব যেন সেদিন সহস্রবাহু হয়েই গ্রাস করেছিল মুর্শিদাবাদকে। একদিন যারা বর্গির অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্যে নিজামতের মুখের দিকে চেয়ে আশায় বুক বেঁধেছিল, সেদিন তারাই আবার নিজামতের মুখে পদাঘাত করতে দ্বিধা করলেন। তাদের কাছে নিজামতও যা, ফিরিঙ্গি-কোম্পানিও তাই। কেউ আমাদের আপন নয়। রাজার যেদিন সুদিন ছিল তখন আমাদের কথা ভাবেনি, এখন রাজার দুর্দিনে আমরাই বা তার কথা ভাবব কেন? আমরা সাধারণ প্রজা, আমাদের নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের নিজেদেরই দেখে নিতে হবে। আর নবাবের সুখসুবিধে? সেটা নবাব নিজেই বুঝুক। তুমি কি আমাদের কথা কখনও ভেবেছ? আমাদের দুঃখকষ্ট কখনও দূর করবার চেষ্টা করেছ?
রাত যখন চার প্রহর তখনও খাজাঞ্চিখানায় মানুষের ভিড় কমে না। দাও, আমাকে আগে দাও। পেছন থেকে আর একজন বলে আমাকে আগে! তারপর সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে আমাকে আগে! এমন দিন হয়তো আর আসবে না। এমন রাতও হয়তো ইতিহাসে কখনও পুনরাবৃত্তি হবে না। খাজাঞ্চিখানার টাকা ও প্রজাদেরই টাকা। ওতে আমার আর এতটুকু অধিকার নেই। আমি তোমাদের নবাব। তোমাদের দুঃখের দিনে আমি তোমাদের দেখিনি। আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু এখন আমাকে একটু ন্যায় করতে দাও। তোমাদের দান করে একটুখানি পুণ্যসঞ্চয় করতে দাও। তারপর আমার। যা-কিছু আছে, সব তোমাদের দেওয়া শেষ হয়ে গেলে আমি এই মসনদ ছেড়ে চলে যাব। তোমাদের আশীর্বাদ চাই না, তোমাদের করুণাও চাই না, তোমাদের স্নেহ-ভালবাসা-মমতা, কিছুই আমি চাই না। হালিশহরের সেই এক কবি ছিল, সে আমাকে যে-গান শুনিয়েছে, সেই গান শোনার পর থেকেই আমি সব ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলাম। আজকে আমার সেই যাবার দিন এসেছে। তোমরা যত খুশি নিয়ে নাও, যার যত খুশি। খাজাঞ্চিখানার দরওয়াজা তোমাদের জন্যেই আমি খুলে রেখেছি। কেউ বোলো না যে আমি পাইনি, আমার কিছু পাওয়া হয়নি, নবাব আমাকে কিছুই দেয়নি।
হঠাৎ চেহেল্-সুতুনের ভেতরে সে রাত্রে একটা পেঁচা ডেকে উঠল।
নবাব চারদিকে চাইলে। লুৎফার বোধহয় একটু তন্দ্রা এসেছিল। গায়ে হাত লাগতেই জেগে উঠেছে।
একী, তুমি?
আমি চললুম।
একলা কোথায় যাবে?
যেদিকে পথ খোলা পাব।
কিন্তু তোমাকে আমি একলা ছেড়ে দিতে পারব না। আমি তোমার সঙ্গে যাব।
কেন তুমি আমার সঙ্গে যাবে? আমি তো তোমাকে কোনওদিন ভালবাসিনি। আমি তো রাত্রে কোনওদিন তোমার ঘরেও শুতে আসিনি। আমি তোমার কাছ থেকে বরাবর মুখ ফিরিয়ে রেখেছি। তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদাটুকু পর্যন্ত আমি দিইনি!
লুৎফা বললে–তা হোক, আমি যাই তোমার সঙ্গে। তুমি মানা কোরো না
তা হলে চলো!
টিমটিম করে একটা তেলের আলো জ্বলছিল চেহেল্-সুতুনের একটা ছোট্ট কুলুঙ্গিতে। তার সামনে একটা ছায়া নড়ে উঠতেই পিরালি খাঁ চমকে উঠেছে–কৌন হ্যায়?
আমি।
পিরালি গলা শুনেই কুর্নিশ করলে। নবাব।
মরিয়ম বেগম কোন মহলে?
পিরালি বললে–মরিয়ম বেগমকে আজ সকালবেলা মেহেদি নেসার সাহেব মতিঝিল থেকে ধরে এনে এখানে নজরবন্দি করে রেখেছে সঁহাপনা!
একবার আমাকে নিয়ে চলো তো মরিয়ম বেগমসাহেবার কাছে?
পিরালি বললে–দরজায় তালা দেওয়া আছে। নজর মহম্মদের কাছ থেকে চাবি এনে খুলে দিচ্ছি। জাঁহাপনা
বলে দৌড়ে অন্ধকারের মধ্যে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু তখনই আবার মনে হল, কেন আবার তাকে কষ্ট দেওয়া। হিন্দুর বউ সে, হিন্দুর মেয়ে। নিজের জীবনের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে কেন আবার তাকে জড়াবে! আমি চলে গেলেই যদি মুর্শিদাবাদে শান্তি আসে তো আসুক। আমিই তো আসল পাপী, তাই আমিই চলে যাচ্ছি। তোমরা ওদের কষ্ট দিয়ো না মিরজাফর আলি সাহেব। ওদের কোনও দোষ নেই। ওরা আমার বেগম ছিল। আমার অপরাধের জন্যে ওদের তোমরা শাস্তি দিয়ো না। আল্লার নাম করে বলছি আমি চিরকালের মতো দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি, আর কখনও ফিরে আসব না, ফিরে আসতে চেষ্টাও করব না।
কান্ত ঘরের ভেতরে চুপ করে শুয়ে ছিল। ঘুম আসছিল না। হঠাৎ দরজার তালা খোলার শব্দে উঠে বসেছে। কে?
কোনও উত্তর নেই।
কান্ত আবার বললে–কে?
আর কোনও সাড়া-শব্দ নেই।
শুধু অন্ধকার ঘরের ভেতর থেকে মনে হল যেন কয়েকটা ফিসফিস শব্দ, কতকগুলো খসখস পায়ের আওয়াজ ঘরের পাশ দিয়ে কোথায় দূরে গিয়ে মিলিয়ে গেল। আর খানিক পরেই আবার একটা পেঁচার ডাক। চেহেল্-সুতুনের ভেতরেও পেঁচা আছে নাকি?
*
মুর্শিদাবাদ ঘাট থেকেই নৌকো নিয়েছিল সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ। কিন্তু সহজে কি নৌকো পাওয়া যায়। মাঝিরা বলে দিনমানে নৌকো ছাড়লে কেউ সন্দেহ করবে, রাতের বেলায় ছাড়ব–
