অনেকগুলো জিনিসই আস্তে আস্তে সরিয়ে ফেলেছিল আমিনা। কেউ জানতে পারেনি।
হঠাৎ পেছন থেকে নানিবেগমসাহেবার গলা পেয়ে চমকে উঠে চুপ করে দাঁড়াল।
একী, তুই? তুই এখানে? মালখানার চাবি পেলি কোত্থেকে?
নানিবেগমসাহেবা নিজের চোখ দুটোকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
এ তুই কী করেছিস আমিনা? মির্জার জিনিস তুই চুরি করেছিস? তোর পেটের ছেলের জিনিসে হাত দিচ্ছিস?
কিন্তু আমিনাও চিৎকার করতে জানে!
ছেলে? আমার পেটের ছেলে? আমার ছেলে তার মার দিকে কখনও ফিরে দেখেছে?
বলছিস কী তুই? তুই যে আমাকে অবাক করলি আমিনা? তুই বলছিস কী? মির্জা তোর পেটের ছেলে নয়?
আমিনাও গর্জে উঠল–মির্জা যদি আমার পেটের ছেলে হবে তো সে তার মা’র দিকটা দেখেছে। কখনও? মা’র সুবিধে-অসুবিধের কথা কখনও ভেবেছে?
সেকী রে? সে তোরও সুবিধে-অসুবিধে দেখেনি কখনও? তুই মির্জার মা হয়ে এই কথা বলতে পারলি?
আমিনা বললে–বলব না? জানো, তোমার মির্জা আমার কত টাকার লোকসান করিয়েছে? আমার আশি হাজার টাকার সোরা সমস্ত আটকে গেল মির্জার জন্যে। এখন ওই সোরা আমি কার কাছে বেচব?
নানিবেগমসাহেবা গালে হাত দিলে তা হারে, মির্জার এই বিপদের দিনে তোর আশি হাজার টাকার সারাটাই বড় হল? মির্জা কিছু নয়? মির্জা কেউ নয়?
দেখতে দেখতে বুঝি আরও কয়েকজন বেগম ধারেকাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারাও মা-মেয়ের ঝগড়া শুনতে লাগল। চেহেসতুনের বাঁদি খোজারাও এসে হাজির হল। মা আর মেয়ে যত গলা চড়ায় ততই ভিড় জমে যায় মালখানার সামনে।
হঠাৎ ঠিক সেই সময়েই গোলমাল শুনে খাসদরবার থেকে মির্জা মহম্মদ সেখানে এসে হাজির। হয়েছিল।
নানিবেগমসাহেবা প্রথমে বুঝতে পারেনি। কেমন করেই বা বুঝবে। নিজের মায়ের কাণ্ড দেখে হয়তো হতবাক হয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্যে। নবাবি যার মাথার ওপর তার বুঝি মুখে কিছু বলতে নেই। মুখে কিছু বললেই সব অপরাধ তারই ঘাড়ে পড়ে।
শুধু বলেছিল–নানিজি, আমার বুকের ওপর আজ ছুরি বসিয়ে দিতে পারো তুমি?
নানিবেগম আঁতকে উঠেছিল কথাটা শুনে।
আহা, তুই কী বলছিস মির্জা? তোর মুখে কি কিছু আটকায় না?
মির্জা বলেছিল–আমি ঠিক কথাই বলছি নানিজি! জগৎশেঠজির কী দোষ, মিরজাফর সাহেবের বা উমিচাঁদজির কী দোষ, ফিরিঙ্গির বাচ্চা ক্লাইভেরই বা কী দোষ। সব দোষ আমার নানিজি, সব দোষ আমারই। আমার বুকে ছুরি বসিয়ে দিলেই এখন আমি শান্তি পাই
নানিজি মির্জাকে দুই হাতে ধরে ঠেলে দিয়ে বলেছিল–তুই তোর মহলে যা মির্জা। তোর মাথায় এখন সব গোলমাল হয়ে গেছে, তোর মতির ঠিক নেই এখন
মির্জা বলেছিল–ঘরে বাইরে কোথাও আমার জন্যে এতটুকু শান্তি নেই নানিজি! কোথাও গিয়ে আমি শান্তি পাব না–এতক্ষণ বোধহয় ক্লাইভ মুর্শিদাবাদে আসবার জন্যে রওয়ানা দিয়েছে। আমি কী করি নানিজি? আমি কী করি?
কেন? জগৎশেঠজি তোকে টাকা দিলে না?
মির্জা বললে–না। বললে–অত টাকা এখন দিতে পারবে না।
তারপর হঠাৎ নিজেকে নানিজির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলে। বললে–ঠিক আছে, নানিজি, আমি কারও দয়া-মায়া চাই না। কারও কাছে জীবনে কখনও ভিক্ষে চাইনি। কেউ আমাকে ভালবাসেনি, আমি কারও কাছ থেকে ভালবাসা চাইওনি। কেউ যখন আমার নয় আমিও কারও নই। কারও জন্যে আমি ভাবব না। আমার যা খুশি তাই করব
বলে তাড়াতাড়ি বাইরের দিকে চলে গেল।
নানিজি পেছন থেকে ডাকলে–মির্জা, মির্জা, ওরে শোন, শোন মির্জা
কিন্তু মির্জা তখন চেহেল্-সুতুন পেরিয়ে বাইরে চলে গেছে।
নানিবেগম হঠাৎ চারদিকে চেয়ে চিৎকার করে উঠল–তোরা এখানে কী দেখছিস দাঁড়িয়ে? তোরা কী দেখছিস? যা এখান থেকে সবাই, বেরিয়ে যা সামনে থেকে যা, বেরিয়ে যা
পেশমন বেগম, তক্কি বেগম, বব্বু বেগম, শিরিনা, সাকিনা, মামুদা, জবিন, সবাই সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
তারপর আমিনার দিকে চেয়ে নানিবেগম বললে–পোড়ারমুখি, তুই ডাইনি, আমার পেটে তুই ডাইনি জন্মেছিলি। কেন তুই মরলি না? কেন তুই মরতে পারলি না মেঘনার দরিয়াতে? তোর মুখ দেখলেও পাপ হয়। মা হয়ে তুই ছেলের মরা-মুখ দেখতে চাস, তোর মরণ হয় না? তুইকী? তুই মানুষ না জানোয়ার?
আমিনাও কম নয়। আমিও কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল। হঠাৎ পিরালি খাঁ দৌড়োতে দৌড়োতে এল।
নানিবেগমসাহেবা, নবাব খাজাঞ্চিখানায় গেল।
কেন রে, সেখানে কী করছে?
নবাব মোহরার সাহেবকে হুকুম দিয়ে দিয়েছে নিজামতে যার যত টাকা বকেয়া পাওনা আছে, সব দিয়ে দিতে। চকবাজারের রাস্তায় পেয়াদারা চাড়া পিটিয়ে দিতে গেছে।
কথাটা শুনে নানিজির যেন বাকরোধ হয়ে গেল। আর কোনও কথা বেরোল না মুখ দিয়ে। সত্যিই তখন চকবাজারের রাস্তার মানুষরাও অবাক হয়ে গেছে তাড়া পেটানোর শব্দ শুনে।
কী গো? কী বলছে পেয়াদারা?
যে-যেখানে ছিল, সবাই দৌড়ে কাছে এল।
নবাব মির্জা মহম্মদ হেবাৎ জঙ সিরাজ-উ-দ্দৌলা আলমগিরের হুকুমনামা
কী হুকুমনামা হে–কী হুকুমনামা?
যার যা বকেয়া পাওনা আছে, নিজামতের খাজাঞ্চিখানায় গেলেই আজ সব পাওনা শোধ হবার হুকুমনামা বেরিয়েছে। খাজাঞ্চিখানা খোলা আছে, মুর্শিদাবাদের মানুষজন সেখানে হাজির হয়ে পাওনা-গন্ডা বুঝিয়া লইবা…
আধা বাংলা আধা-উর্দুতে সকলের বোধগম্য করে পেয়াদারা চিৎকার করছে আর ডিম ডিম করে ঢোলসহরত দিচ্ছে।
