হঠাৎ পালকিটা যেন একটু দুলে উঠল।
কোথায় এল সে? নহবতটা যেন ঠিক মাথার ওপরেই বাজছে। তবে বোধহয় চেহেসূতুনের ভেতরে ঢুকল এতক্ষণে পালকিটা।
বশির মিঞার গলা শোনা গেল।
নজর মহম্মদ।
ওদিক থেকে নজর মহম্মদের জবাব এল।
কেয়া বাত?
মতিঝিল থেকে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে এনেছি পালকি করে, মেহেদি নেসার সাহেবের হুকুম। একে তালা বন্ধ করে এর মহলে রেখে দিবি।
কেন, কী কসুর করেছে মরিয়ম বেগমসাহেবা?
বশির বুঝি রেগে গেল। বললে–সে খবরে তোর কাম কী? মেহেদি নেসার সাহেব হুকুম দিয়েছে, তুই বিলকুল তামিল করবি-যা
নজর মহম্মদের মেজাজটা বোধহয় তখন চড়া ছিল। বললে–লেক বেগমসাহেবা ভেগে গেলে আমার কিছু কসুর নেই!
কেন, ভাগবে কেন? ঘরে তালা বন্ধ করে রাখলে ভাগবে কী করে?
আরে জনাব, চেহেল্-সুতুনের ভেতরে ইনকিলাব শুরু হয়ে গেছে। ঘসেটি বেগমসাহেবা ভি ভেঙ্গে গিয়েছিল।
কে বললে? বশির মিঞা শুধু একলাই চমকায়নি, বোরখার ভেতরে কান্তও চমকে গিয়েছিল খবরটা শুনে।
বশির মিঞা বললে–তারপর? তারপর কী হল?
হুজুর, নবাব তো চেহেল্-সুতুনে এসেছে। খাস-দরবারে জলুস হচ্ছে। সবাই চুরি ভি করছে!
বশির মিঞা বোধহয় আরও অবাক হয়ে গেল। চুরি? কে চুরি করছে? কী চুরি করছে?
হুজুর, আমিনা বেগমসাহেবা বমাল গ্রেফতার হো গিয়া!
বশির মিঞা বললে–সেকী রে? বলছিস কী তুই নজর?
হাঁ জি, আমিনা বেগমসাহেবা মালখানার সিন্দুক খুলে জেবর-এর সবকিছু চুরি করছিল, অচানক ধরা পড়ে গেছে। ইনকিলাব শুরু হয়ে গেছে চেহেলসূতুনে, সেই জন্যেই তো বলছিলাম।
তা বাব কোথায়? নবাব কিছু বললে না?
নজর মহম্মদ বললে–নবাব তো খাসদরবার থেকে বেরিয়ে এখন বেগমমহলে এসেছে, নানিবেগমসাহেবার মহলে ঢুকেছে
বশির মিঞারও বোধহয় তখন আর সময় ছিল না। বললে–আমি চললুম, তুই মরিয়ম বেগমসাহেবকে সামলে রাখিস, যেন খোয়া যায় না
বশির চলে গেল। পালকিটা তারপর আরও এগিয়ে গিয়ে থামল এক জায়গায়। সেখানে পালকিটা থামতেই দুটো দরজা খুলে গেল।
নজর মহম্মদ বললে–আইয়ে বেগমসাহেবা
কান্ত বোরখাটা ঢেকে নিয়ে নজর মহম্মদের পেছন পেছন একটা ঘরে গিয়ে পৌঁছোল। সেই মরালীর ঘরখানা। এই ঘরটাতেই কতদিন লুকিয়ে লুকিয়ে এসেছে সে। এই নজর মহম্মদই কতদিন তাকে ঘুষ পেয়ে এখানে নিয়ে এসে তুলেছে। তারপর অনেক রাত পর্যন্ত মরালীর সঙ্গে কাটিয়ে দেবার পর আবার। সুড়ঙ্গের পথে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
নজর ঘরের ভেতরে পৌঁছে দিয়েই বাইরে চলে গেল। যাবার আগে বললে–আপনার যদি কিছু জরুরত থাকে তো হুকুম করবেন আমাকে, আমি তামিল করব। কিছু দরকার আছে?
কান্ত বললে–না
নজর মহম্মদ বললে–বাইরে থেকে আমি তালা-চাবি বন্ধ করে যাচ্ছি—
বলে বাইরের দরজায় চাবি বন্ধ করে চলে গেল।
কান্ত বোরখাটা খুলে আয়নার সামনে নিজের চেহারাটা দেখলে। ঠিক যেমন করে মরালী মরিয়ম বেগম সাজত তেমনি করেই সাজিয়ে দিয়েছে তাকে। যদি কেউ দেখতেও পায় হঠাৎ চট করে চিনতে পারবে না।
কান্ত খাটের ওপর গিয়ে শুয়ে পড়ল। খানিকক্ষণের জন্যে সে নিশ্চিন্ত। খানিকক্ষণের জন্যে অন্তত কেউ তাকে আর বিরক্ত করবেনা। আর কোনওরকমে যদি দুটো দিন এমনি করে এখানে কাটিয়ে দিতে পারে তো ততক্ষণে মরালী মুর্শিদাবাদ ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যেতে পারবে। অনেক দূর। এমন জায়গায় চলে যাবে যেখানে নবাব সিরাজ-উ-দৌলা নেই, মেহেদি নেসার নেই। সফিউল্লা, ইয়ারজান, কেউ নেই। জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, নন্দকুমার কেউ নেই যেখানে, সেখানে গিয়েই মরালী তার সংসার পাতবে। সুখে শান্তিতে দিন কাটাবে সে। আর কেউ তাকে বিরক্ত করবে না তার রূপের জন্যে, তার যৌবনের জন্যে, তার বয়েসের জন্যে। তার অসহায়তার সুযোগ নিয়ে যেখানে কেউ তাকে অত্যাচার করবেনা।
তুমি চলে যাও মরালী। যত তাড়াতাড়ি পারো চলে যাও। আমার কথা ভেবো না। আমি তোমার জন্যে সব কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করব। আমার কোনও কষ্ট হবে না। আমাকে যদি এরা কোতল করে তবু আমি এই ভাবতে ভাবতে বিদায় নেব যে তুমি সুখে আছ, তুমি শান্তিতে আছ।
হঠাৎ কান্তর মনে হল চেহেল্-সুতুনের মধ্যেও যেন গোলমাল শুরু হয়েছে। অনেক মানুষের গলার আওয়াজ কানে এল। অনেক বেগম, অনেক খোঁজার গলা। কিন্তু কারও গলাই চিনতে পারল না।
তবুকান্ত সেই দিকে কান পেতে রইল।
২.১৬ নানিবেগমসাহেবা
নানিবেগমসাহেবার শরীরে বিশ্রাম নেই, চোখে ঘুম নেই। সেই যে শেষ রাত্রের দিকে মতিঝিলে গিয়েছিল মরিয়ম বেগমকে দেখতে, তারপর মির্জা এসেছে। কিন্তু মির্জার সঙ্গে ভাল করে কথা বলবার আগেই সে চলে গিয়েছিল খাস-দরবারে। তারপর হঠাৎ পিরালি খাঁ’র কাছ থেকে খবর পেয়েই দৌড়ে এসেছিল মালখানার ঘরে। সত্যিই, পিরালি খাঁ যা বলেছে তাই।
তুই? তুই এখানে?
নিজের পেটের মেয়ে আমিনা। মির্জারই মা। সেই আমিনারই কিনা এই কাণ্ড?
আমিনা বেগম প্রথমটায় হকচকিয়ে গিয়েছিল। মালখানার চাবি কোথা থেকে জোগাড় করে একেবারে সিন্দুকটা খুলে ফেলেছিল। এ টাকা কি শুধু তার ছেলের? শুধু মুর্শিদাবাদের নবাবের? নবাবের নিজামতেরই টাকা এগুলো? এর ভেতরে যা কিছু সম্পত্তি আছে সব তো বেগমদেরই। বেগম, চেহেলসূতুন, সবকিছুর জন্যেই মুর্শিদাবাদের নবাবরা জমিয়ে রেখে গেছে এই মালখানায়।
