ম্যাড্রাসে ওই লোকটা বলেছিল–তুমি বড় হতে চেয়ো না ক্লাইভ। বড় হওয়া মানেই সাকসেসফুল হওয়া। সাকসেসফুল হওয়া মানেই যন্ত্রণা পাওয়া। তুমি সাধারণ হতে চেষ্টা করো, স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করো, সহজ হতে চেষ্টা করো। তবেই শান্তি পাবে
হঠাৎ বাইরে বিগল বেজে উঠল।
কেউ এল নাকি মুনশি?–অর্ডার্লি!
অর্ডার্লি ঘরে এসে স্যালিউট করলে।
হুজুর, মিরজাফর আলি সাহেব তাঁর ছেলে মিরন আলিকে হুজুরের সঙ্গে দেখা করতে পাঠিয়েছেন।
ক্লাইভ বললে–ভেতরে নিয়ে এসো
মিরন ভেতরে এসে কুনিশ করে দাঁড়াল।
কী খবর মিরন আলি?
হুজুর, নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। আমার বাপজান মিরজাফর আলি সাহেব সেই খবর দিতে পাঠিয়েছেন আপনার কাছে।
নবাব! নবাব পালিয়েছে? কোথায়?
তা জানি না। চর গেছে চারদিকে তালাস করতে।
ক্লাইভ উঠল। কোথায় গেল তার ক্লান্তি, কোথায় গেল তার স্বপ্ন। অর্ডার্লিকে ডেকে বললে–মেজর কিলপ্যাট্রিক সাহেবকে সেলাম দেও–
অর্ডার্লি কুর্নিশ করে বাইরে হুকুম তামিল করতে চলে গেল।
*
ডিহিদার রেজা আলি এমন সময় মুর্শিদাবাদে এসেছিল, যখন তার না এলেও চলত। কিন্তু না এলে বোধহয় আর উদ্ধব দাসের বেগম মেরী বিশ্বাস’ কাব্য লেখাও হত না।
মতিঝিল থেকে যখন সবাই চলে গেছে, একটা খিদমদগারও নেই, ইব্রাহিম খাঁ-ও চলে গেছে চাবির গোছ রেখে, তখন কান্ত ঘরের মধ্যে একলা চুপ করে বসে ছিল।
না, সে কিছুতেই এখান থেকে যাবে না। তার জন্যে যদি মরালী নিঃশব্দে মুক্তি পায় তো পাক। মরালীর জন্যে সব শাস্তি সে মাথা পেতে নেবে। নিয়ে তার সব অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবে! কেন সে পালাবে? প্রাণের ভয়ে? নিজের প্রাণটাই তার কাছে বড় হল?
বহুদিন আগের একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ল। চকবাজারের রাস্তায় একদিন সেই গনতকারটা তার হাত দেখে বলেছিল–যার সঙ্গে আপনার বিয়ে হবার কথা ছিল, তার সঙ্গে আবার বিয়ে হবে বাবুজি।
আরও একটা কথা বলেছিল সে। বলেছিল–জল থেকে একটু সাবধান থাকবেন বাবুজি, জলেই আপনার ভয়
তা হোক, নিজের জন্যে আর তার ভয় নেই। ভয় মরালীর জন্যে! মরালী সুখী হোক, মরালী বিপদমুক্ত হোক। তা হলেই সে হাসিমুখে মৃত্যু বরণ করবে। সে জলই হোক আর আগুনই হোক!
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হল। কান্ত তাড়াতাড়ি বোরখায় মুখ ঢেকে ফেললে।
দরজা খুলতেই কান্ত দেখতে পেলে, ভেতরে ঢুকছে মেহেদি নেসার সাহেব, ডিহিদার রেজা আলি আর বশির মিঞা।
বোরখার আড়াল থেকে তিনজনকে দেখে কান্তর বুকটা প্রথমে আঁতকে উঠেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই মনে হল কীসের ভয় তার! সে তো মরতেই এসেছে। মৃত্যুর ভয় থাকলে সে তো আগেই পালিয়ে যেত মতিঝিল থেকে। সে ত মরালীর জন্যেই মরছে। মরালী যদি বাঁচে, মরালী যদি রক্ষে পায়, তা হলে তো তার মরেও সুখ!
মেহেদি নেসার সাহেব বোধহয় খুব ব্যস্ত ছিল। কিন্তু ডিহিদার রেজা আলি সাহেবই তাকে জোর করে ধরে এনেছে।
মেহেদি নেসার বললে–ওই মরিয়ম বেগমসাহেবা?
বশির মিঞা বললে–হ্যাঁ, খোদাবন্দ তো নিজেই মরিয়ম বেগমসাহেবাকে এখানে রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন।
ডিহিদার রেজা আলি বললে–লেকন জনাব, হাতিয়াগড়ের আসলি রানিবিবি এ নয়—
কেন?
ডিহিদার বললে–হাতিয়াগড়ের রাজাসাহেব বাত-খেলাপি করেছে নিজামতের সঙ্গে। আসলি রানিবিবি বলে নকলি রানিবিবি চালিয়ে দিয়েছে।
মেহেদি নেসার বললে–সুবুত কোথায়? প্রমাণ তো চাই, শুধু বললে–তো চলবে না।
ডিহিদার বললে–সুবুত আমার কাছে আছে জনাব। দফতরেমনসুর আলি মেহের সাহেবের কাছে সে সুবুত রেখে দিয়েছি। আমি জনাবকে দেখাতে পারি। আসলি বলে ঝুটা চালিয়ে দিয়েছে রাজাসাহেব।
বশির মিঞা বললে–খোদাবন্দ হুকুম দেন তো এই একে পুছতে পারি।
দুর বেত্তমিজ, ওকে জিজ্ঞেস করলে তো ও ঝুট বলবে।
ডিহিদার বললে–তা হলে জনাব, ওকে চেহেল্-সুতুনে বন্ধ করে রেখে দিন।
কেন? এখানে মতিঝিলে কীসের ক্ষতি?
ডিহিদার রেজা আলি বললে–না জনাব, মতিঝিলে এখন কোনও খিদমদগার নেই, ফটকের পাহারাদার ভি নেই, সবাই ভেগে গেছে। যদি এখান থেকে ভেগে যায়?
মেহেদি নেসার বললে–বোত আচ্ছা, মরিয়ম বিবিকে চেহেসূতুনের পিরালি খাঁ কি নজর মহম্মদের হাতে জিম্মা দিয়ে আয়–তারপর আমার হাত খালি হলে আমি দেখব। জনাব এখন খিঁচড়ে আছে, জগৎশেঠজি ভি খিঁচড়ে আছে, আমার এখন অনেক কাজ
বলে পেছন ফিরল। ডিহিদার বশির মিঞাকে ইঙ্গিত করতেই সে মরিয়ম বেগমের দিকে চেয়ে বললে–আইয়ে বেগমসাহেবা, মেরা সাথ আইয়ে
কান্ত ভাল করে নিজেকে বোরখার আড়ালে ঢেকে নিয়ে উঠল। তারপর তিনজনের পেছন পেছন চলতে লাগল।
চবুতরায় নেমে একটা পালকি দাঁড়িয়ে ছিল। তাতেই উঠতে বললে। কান্ত পালকির ভেতর উঠে বসতেই পালকির পাল্লা দুটো বশির মিঞা বন্ধ করে দিয়েছে। তারপর আর কিছু দেখা যায় না। পালকিটা দুলতে দুলতে চলতে লাগল।
তারপর একটা সময়ে নহবতের সুরটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। বোঝা গেল চেহেল-সূতুনের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে তাকে। আস্তে আস্তে বাইরের লোকজনের হল্লা-চিৎকার কমে এল।
কোথায় কোন জায়গায় তাকে রাখবে কে জানে। জানাজানি হয়ে গেলে তাকে বন্দি করে রাখতে পারে, কোতল করেও ফেলতে পারে!
পালকির ভেতরে বসে বসেই কান্ত বোরখার মধ্যে ঘেমে নেয়ে উঠল। তবু তুমি কিছু ভেবো না মরালী। আমার জন্যে তুমি কিছু ভেবো না। আমি যেখানে যেমন ভাবেই থাকি, তোমার মঙ্গল কামনা করব। আমি মনে অন্তত এই ভেবে শান্তি পাব যে, তুমি সুখী হয়েছ। যদি পারো, তুমি এই মুর্শিদাবাদ থেকে চলে যেয়ো। আর যদি সেই উদ্ধব দাসকে খুঁজে পাও তো তাকে নিয়েই সংসার করে সুখী হবার চেষ্টা কোরো।
