ক্লাইভ হুংকার দিয়ে উঠল–কী বলতে এসেছ, বলে শিগগির, আমার সময় নেই–
লোকটা হেসে উঠল–মানুষ যখন সাকসেসফুল হয়, তখন তার সময় থাকেই না কর্নেল। তবু সময় করে নিতে হয়। সেই কথাটা বলতেই আমি এসেছি। একদিন তোমার কিছু ছিল না। একদিন তোমার টাকা ছিল না, বন্ধু ছিল না, সংস্থান ছিল না। সেদিনের কথা কি তোমার মনে পড়ে?
কিন্তু মনে পড়ে লাভ কী? সে কথা কেন মনে করতে যাব এখন?
আমি যে সেই কথা মনে পড়িয়ে দিতে এসেছি কর্নেল। মনে পড়া যে ভাল।
কেন মনে পড়া ভাল? আমি নিজের ক্ষমতায় ভাগ্যের মাথায় উঠেছি। কেন আমি সে কথা মনে রাখব? কেন মনে রেখে মন খারাপ করব?
লোকটা বললে–আমি জানি, তুমি ওই কথাই বলবে। কিন্তু এটা চিনতে পারো?
রবার্ট ক্লাইভ দেখেই চিৎকার করে উঠলো—না না না
আর সেই চিৎকার শুনে অর্ডালিটা দৌড়ে ঘরে এসেছে–হুজুর
ওদিক থেকে কিলপ্যাট্রিক, আয়ার কুট সবাই ঘুম ভেঙে দৌড়ে এসেছে।
হোয়াটস আপ কর্নেল? কী হয়েছে? কী হয়েছে কর্নেল?
ক্লাইভ লজ্জায় পড়ে গেল। এমন করে ভয় পাওয়া উচিত হয়নি ক্লাইভের। পলাশির ব্যাটল জয় করে ভীরুর মতো চেঁচিয়ে উঠেছে সে। ও লোকটা কেন আসে? কেন ওটা দেখায় তাকে? ওটা তো শুধু একটা তাস!
আবার সবাই যে-যার ঘরে ফিরে গেছে। আগের দিন যুদ্ধ করে সবাই ক্লান্ত হয়ে আছে। মিছিমিছি আবার সকলের ঘুমের ব্যাঘাত হল। আবার লিখতে চেষ্টা করলে ক্লাইভ। ডেসপ্যাঁচটা লিখতে বসেও নানারকম বাধা আসে।
জোর করে কলম চালিয়ে যেতে লাগল–প্লাসির ব্যাট-এ আমরা জিতেছি। নবাব পালিয়ে গেছে মুর্শিদাবাদে। আমি আর্মি নিয়ে তার পেছন পেছন চলেছি। আমাদের পক্ষে মারা গেছে সাতজন হোয়াইট ইংরেজ, আর ষোলোজন সেপাই। আর ইজিয়োরড হয়েছে তেরোজন গোরা আর ছত্রিশজন সেপাই। নবাবের জেনারেল মিরজাফর আলি আমার সঙ্গে দাউদপুরে দেখা করেছিল। পাছে সে আমাকে সন্দেহ করে তাই আমি তাকে আলিঙ্গন করে পাশে বসিয়েছি। বলেছি–তোমাকেই আমি মুর্শিদাবাদের নবাব করব জেনারেল। আমার কথা শুনে মিরজাফর আলি খুব খুশি। আমি তাকে মুর্শিদাবাদে গিয়ে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার কী মতলব তা জানিয়ে আমাকে খবর দিতে বলেছি। আমি এখন আমি নিয়ে ময়দাপুরে ক্যাম্প করে আছি। মিরজাফরের লেটার এলে তবে আমি বেঙ্গলের ক্যাপিটেলে নিজে যাব।
চিঠিটা খামের মধ্যে পুরে মুখটা বন্ধ করে দিলে। সকাল হলেই চিঠিটা পাঠিয়ে দিতে হবে হোমে। আর একটা চিঠি পেগিকে লিখলে হত। কিন্তু সেপরে দিলেও চলবে।
তারপর ক্লাইভ বিছানার ওপর গা এলিয়ে দিলে। আলোটা জ্বলুক। ওটা জ্বললে তবু মনে হয় যেন সে বেঁচে আছে। অন্ধকার হলে যেন বড় ভয় করে ক্লাইভের।
কিন্তু কোথা দিয়ে যে কখন তন্দ্রা এসেছিল তার খেয়ালই নেই। হঠাৎ চোখ চাইতেই নজরে পড়ল। বাইরের সেই অন্ধকার আকাশটা কখন আলোয় আলো হয়ে গেছে।
অর্ডার্লি।
অর্ডার্লি দৌড়োতে দৌড়োতে ঘরে এসেছে। হরিচরণটা নেই। সেটা সেই বেঙ্গলি লেডিজদের নিয়ে চলে গেছে। তার জায়গায় এই নতুন অর্ডার্লিটা এসেছে।
হুজুর, কলকাতা থেকে মুনশি এসেছে।
মুনশি? নিয়ে এসো ভেতরে।
কলকাতার কেল্লা থেকে সারা পথ নৌকোয় এসে ঠিক সময়েই মুনশি দাউদপুরে এসেছিল। সেখানে এসে শুনেছিল সাহেব মনিব ময়দাপুরের দিকে গেছে। রাত্রেই এসে পৌঁছেছিল এখানে। কিন্তু রাত্রে আর কাউকে বিরক্ত করেনি। ছাউনির বাইরেই চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে ছিল।
সাহেবের ঘরের ভেতরে ঢুকে সাহেবের পায়ের ধুলো নিয়ে টিপ করে একটা প্রণাম করলে। তারপর পায়ের ধুলোটা মাথার টিকিতে ছোঁয়ালে!
ক্লাইভ বললে–কী মুনশি, কী খবর?
নবকৃষ্ণ মুনশি বললে–হুজুর, আজ পনেরো দিন আমি মা-সিংহবাহিনীর পুজো করেছি। কাল হঠাৎ মায়ের মাথা থেকে পুজোর ফুল পড়ল
ফুল পড়ল মানে?
হুজুর, আমার মানত ছিল কিনা। মাথার ফুল পড়লে তবে বুঝব যে হুজুর লড়াইতে জিতেছেন। আমার মা-সিংহবাহিনী জাগ্রত মা কিনা।
ক্লাইভ হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেল। রাত্রের স্বপ্নের কথাটা মনে পড়ল। মুনশিকে স্বপ্নের কথাটা বলবে নাকি!
বললে–আচ্ছা, মুনশি তুমি স্বপ্ন দেখো?
আজ্ঞে, স্বপ্ন? রোজ দেখি!
কী স্বপ্ন দেখো?
নবকৃষ্ণ বললে–আজ্ঞে, স্বপ্ন দেখি যেন হুজুর রাজরাজ্যেশ্বর হয়েছেন, আর আমি পদতলে বসে হুজুরের সেবা করছি
না না, ও স্বপ্ন নয়। অন্য কোনও স্বপ্ন দেখো না?
না হুজুর, রোজ ওই একই রকম স্বপ্ন দেখি!
ক্লাইভ বারবার দ্বিধা করতে লাগল। তারপর বলে ফেললে–আচ্ছা, রাত্রে কোনওদিন স্বপ্নে তোমার ঘরে কেউ ঢোকে না?
রাত্রে কেন কেউ ঘরে ঢুকবে হুজুর। আমি তো ঘরের দরজা বন্ধ করে শুই।
ক্লাইভ বললে–কিন্তু স্বপ্নে দরজা বন্ধ থাকলেও কেউ ঘরে ঢুকতে পারে তো?
তা তো পারে।
তা সেইরকমভাবে ঢুকে তোমাকে কেউ কিছু দেখায় না?
কী দেখাবে হুজুর?
ধরো তাস!
তাস?
মুনশি নবকৃষ্ণ অবাক হয়ে গেল। সাহেবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাস। শুধু একটা তাস। কুইন অব স্পেডস। ইস্কাবনের বিবি!
নবকৃষ্ণ আরও অবাক হয়ে গেল সাহেবের কথা শুনে।
যাক গে, ওসব তুমি বুঝবে না মুনশি! সত্যিই তো। ধ্বই কি সব বোঝে! ওই সাকসেস। কেন যে সাকসেস বারবার মানুষের মূর্তি ধরে ক্লাইভের সামনে এসে ওই তাস দেখায়! কে জানে, হয়তো সাকসেস মানেই ইস্কাবনের বিবি। সাকসেস মানেই কুইন অব স্পেড়। সাকসেস মানেই কি তবে মায়া। সাকসেস হওয়া কি তবে ভাল নয়! সাকসেস মানেই কি তার ডেথ! সাকসেস মানেই কি তবে মৃত্যু।
