মিরজাফর আলিও সুরে সুর মিলিয়ে বললে–হুজুরের অনেক কষ্ট হল, আর কষ্ট দিতে চাই না
কিন্তু আমি আপনাদের কী মদত দিতে পারব?
হলওয়েল সাহেব বললে–আপনি শুধু একটু নবাবকে বুঝিয়ে বললেই আমাদের উপকার হবে
কী বুঝিয়ে বলব?
যেন আমাদের ওপর আর টরচার না হয়, অত্যাচার না হয়। তারপরে গলাটা একটু নিচু করে বললে–নবাব আমাদের চারিদিকে স্পাই লাগিয়েছেন, আমাদের এখানকার কাশিমবাজার কুঠির ওয়াটস, কলেট, ব্যাটসনকে ধরে নিয়ে গিয়ে নজরবন্দি করে রেখেছিলেন, তাদের দিয়ে জোর করে বন্ড লিখিয়ে নিয়েছেন, মুচলেকায় সই করতে হয়েছে তাদের। তাদের জেনানাদের পর্যন্ত ইনসাল্ট করেছেন-নবাবের অর্ডারে কোম্পানির কুঠির সব মাল লুঠ করেছে। নিজামতের লোকেরা…
বলতে বলতে হলওয়েল সাহেব বোধহয় উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। মিরজাফর বললে–আস্তে সাহেব, আস্তে, অত চেঁচিয়ো না, কেউ শুনতে পাবে–
জগৎশেঠজি বললেন–না, বলুন আপনি। তারপর?
সে ইতিহাস তো এক দিনের নয়, এক যুগেরও নয়। ১৭৩০ সালে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌল্লার জন্ম। তারও আগের কাহিনী সব। তখন এই জগৎশেঠ মহাতাপজিও জন্মাননি। মহারাজ স্বরূপচাঁদও জন্মাননি। তখন থেকেই তো ফিরিঙ্গি কোম্পানির আমদানি হয়েছে হিন্দুস্থানে। তখন থেকেই বিষনজরে পড়েছিল কোম্পানি। আওরঙ্গজেব মারা যাবার পর থেকে পাঁচজন মাত্র বাদশা হয়েছে। বলতে গেলে দিল্লির মসনদ তখন ফাঁকা। মারাঠারা উঠেছে পশ্চিমে আর শিখরা উঠতে চেষ্টা করছে। উত্তরে। এই অবস্থায় আমরা নিশ্চিন্তে কেমন করে ব্যাবসা করব হুজুর।
রাত আরও গভীর হয়ে আসছে। পালকি-বেহারারা বাইরে বসে বসে ঢুলছে। বশির মিঞা আর থাকতে পারলে না। তার নিজের বিড়ি তখন খতম হয়ে গেছে। বেহারাদের কাছে গিয়ে বললে–ভাইয়া, বিড়ি আছে তোমাদের কাছে?
ভিখু শেখ ধমক দিয়ে উঠল ফটক থেকে–এই উন্মুখ, চিল্লাও মাত
গদির ভেতরে তখন জগৎশেঠজি বললেন–আপনারা মিথ্যে কথা কেন বললেন নবাবকে?
কী মিথ্যে কথা?
আপনারা কেল্লা বানাচ্ছেন কলকাতায়, এ-খবর নবাব পেয়েছিলেন। নবাবের চিঠির উত্তরে
আপনাদের ড্রেসাহেব লিখলেন–গঙ্গার ধারে পোস্তা ভেঙে যাওয়ায় মেরামত করছেন! এটা তো মিথ্যে কথা!
হলওয়েল সাহেব কী বলতে যাচ্ছিল, জগৎশেঠজি বাধা দিয়ে বললেন–আর কাশিমবাজার কুঠির ওয়াটস্ সাহেবের মুচলেকা আপনারা মেনে নিলেন না কেন? আর একটা কথা
জগৎশেঠজির কাছে সব খবরই আসে। বোঝা গেল তার জানতে কিছুই বাকি নেই।
ঢাকার নায়েব রাজা রাজবল্লভের ছেলে কেষ্টবল্লভকে আপনারা কলকাতায় থাকতে দিলেন কেন? তার সঙ্গে অত টাকাকড়ি ছিল। আপনারা তার কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে নবাবের সঙ্গে বেইমানি করলেন কেন? রামরাম সিংয়ের ছেলে নারাণ সিংকে আপনারা ধরে রাখলেন কেন? তাকে অপমান করলেন কেন? উমিচাঁদ একটা ঠগ, ওকে আপনারা অত আমল দেন কেন? কলকাতার সোরার কারবারি বেভারিজ সাহেবের সঙ্গে উমিচাঁদের অত দোস্তালি কেন?
মিরজাফর এতক্ষণ চুপ করে ছিল। বললে–হুজুর, এইসব কথার জবাব দেবার জন্যেই আমরা এসেছি আপনার কাছে আপনি নবাবের তরফের কথাগুলো শুনেছেন, এবার আমাদের তরফের কথাও শুনুন।
জগৎশেঠজি বললেন–বলুন–আমি যখন জবান দিয়েছি, তখন কাউকেই আমি এসব কথা বলব–এক আমি ছাড়া কেউই এসব জানবে না।…
কী বিড়ি রে? বড় কড়া মাল মালুম হচ্ছে—
ভিখু শেখ বন্দুক নিয়ে এগিয়ে এসেছে এই কুত্তা, নিকাল ইহাসে–
হঠাৎ বোধহয় বাইরের রাস্তার দিকে নজর পড়েছে। আর একটা পালকি। ঘন ঘন দম ফেলবার শব্দ কানে আসতেই ভিখু শেখ পেছন ফিরল। আজ হল কী! এত পালকি আসছে এখানে।
পাঞ্জা!
পাঞ্জা দেখালে আর ভিখু শেখের করবার কিছু নেই। পাঞ্জা দেখলে ভিখু শেখ বন্দুকটা জমিনের ওপর রেখে খাড়া হয়ে দাঁড়ায়। পালকিটা দেউড়ির ভেতরে ঢুকল। বশির মিঞা তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল। কোথাকার কে ভেতরে ঢুকছে নির্বিবাদে পাঞ্জা দেখিয়ে। পালকি থেকে পালকির দরজা খুলে কে নামল একজন। ঢাকাই মসলিনের পিরান গায়ে। চটকদার চেহারা। নেমে সোজা সিঁড়ি দিয়ে দরদালানের দিকে এগিয়ে গেল। বশির মিঞা কিছু বলতে পারলে না। ভদ্রলোক ভেতরে যেতেই পালকি-বেহারাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে–এ কৌন হ্যায় ভাইয়া? জমিনদার?
ভিখু শেখ ওধার থেকে আবার ধমক দিয়ে উঠল–এই কুত্তা, ফিন?
জগৎশেঠজির কাছে খবর গেল। খতটা দেখে বললেন–এখন তো দেখা হবে না। বলে দে, কাল সকালে দেখা করতে
মিরজাফর জিজ্ঞেস করলে কে হুজুর, এত রাত্তিরে?
হাতিয়াগড়ের জমিদার!
মিরজাফর যেন হাতে ইদের চাঁদ পেয়ে গেল। বললে–হাতিয়াগড়ের জমিদার? ও এলে কোনও লোকসান নেই হুজুর, ওকে আসতে বলুন, হাতিয়াগড়ের রাজা আমাদের দলে–
যে-লোকটা চিঠি নিয়ে এসেছিল সেও থমকে দাঁড়াল।
মিরজাফর আবার বলতে লাগল–শুধু হাতিয়াগড় নয় হুজুর, সবাই আমাদের দলে। নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, নাটোরের মহারানি, সবাইকে আপনার কাছে নিয়ে আসব হুজুর। হাতিয়াগড়ের জমিদারের কাছেও যে ফৌজি-সেপাই গিয়ে পরোয়ানা দিয়ে এসেছে
কেন?
হাতিয়াগড়ের রাজার কাছেই আপনি সব শুনতে পাবেন হুজুর। আমি নিজে মুসলমান হয়ে বলছি, নবাবের কাছে হিন্দু মুসলমান খ্রিশ্চান কিছু নেই, তামাম বাংলা মুলুক নবাবের দুশমন হয়ে গেছে!
