কিন্তু ওদের কী হবে ঘটকমশাই? ওই ছোট বউরানির? আমি হাতিয়াগড়ে গেলে যদি কারও নজরে পড়ে যাই?
সচ্চরিত্র বললে–তোমার বাপের কাছে তুমি থাকবে, কে তোমায় দেখবে? আর এদিকে নিজামতের তো এই অবস্থা, নবাবি থাকে কি না তাই দেখো আগে–
তা হলে তাই-ই চলুন
সচ্চরিত্র বললে–তা হলে আমার সঙ্গে এসো, সোজা মুর্শিদাবাদের ঘাটে গিয়ে নৌকো ধরব। জলপথে যাওয়াই ভাল, ওখানে মাঝিটাঝিদের সঙ্গেও আমার ভাব আছে, আমি সরাবখানার ভাঁড়ারি বলে–চলো–
মরালী সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর সঙ্গে মতিঝিলের বাইরে এল। তখন রাস্তায় আরও ভিড়। মুর্শিদাবাদের মানুষ তখন দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
*
লক্কাবাগের প্রান্তরে তখন বাংলা মুলুকের ভাগ্যনির্ণয় শেষ হয়ে গেছে। তখনও রক্তের দাগ লেগে আছে জল-কাদার মাটিতে। যে-আমগাছগুলো কত বছর ধরে কত পাখিকে আশ্রয় দিয়েছে, কত ফল ফলিয়েছে, কত বর্ষা শীত বসন্তের নীরব সাক্ষী হয়ে মানুষের উত্থান-পতনের ইতিহাস লক্ষ করেছে তারাও সেদিন রেহাই পায়নি। কোনওটার গায়ে বুলেটের গর্ত, কোনওটার ডালপালা আগুনে পুড়ে গেছে, কোনওটা দিশি কামারের তৈরি কামানের ঘায়ে উপড়ে গেছে।
ময়দাপুরের ছাউনিতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন একমনে ক্লাইভ হাতে কাগজ কলম নিয়ে ভাবছিল। সেই লঙ্কাবাগের কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছিল তার।
সব জিনিসের যেমন একটা শেষ আছে, দুর্ভানারও যে একটা শেষ থাকবে তাতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে? ময়দপুরের আকাশটার দিকে চেয়ে দেখতে দেখতে রবার্ট ক্লাইভ কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
খবরটা প্রথম দেয় মেজর কিলপ্যাট্রিক।
স্যার, নবাব পালিয়ে গেছে! তখন মাথার ওপর আকাশটা ভেঙে পড়লেও বোধহয় অমন করে চমকে উঠত না সেন্ট ফোর্ট ডেভিডের কম্যান্ডার।
বললে–হোয়াট?
চমকে উঠেছিল কিলপ্যাট্রিক। ক্লাইভকে এত উত্তেজিত হতে দেখেনি কখনও আগে। তখন চারদিকে সোলজারদের চিৎকার আর কাতরানি। খালের জল লাল হয়ে গেছে নিরীহ সেপাইদের রক্তে। চারদিকের গাছের ডাল থেকে ধোঁয়া উঠছে। সেই আগুন, হত্যা আর মৃত্যুর মধ্যে হঠাৎ জীবনের সংবাদ এলে চমকে ওঠারই তো কথা।
আর ইউ শিয়োর? তুমি ঠিক শুনেছ?
আশ্চর্য! আশ্চর্যই বটে! এই ময়দাপুরের ছাউনিতে সবাই যখন প্রাণভরে ঘুমোচ্ছে তখন সেই কথাগুলো ভাবতে ভাল লাগে বই কী। ক্লাইভ আবার গিয়ে উঠল সেই বাড়িটার ছাদে। নবাবের সেই শিকার করবার বাড়িটার ছাদে। সত্যিই নবাবের ছাউনিটা দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। সেখানে যেন অনেক হট্টগোল। এলোপাতাড়িভাবে নবাবের জেনারেলরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে।
কিলপ্যাট্রিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। বললে–মিরজাফর তার কথা রেখেছে কর্নেল
কিন্তু ওদিক থেকে ফরাসি জেনারেল সিনফ্রে তখনও পুরো দমে লড়াই করে চলেছে। তাদের এক-একটা গোলা এসে সামনের সেপাইদের সামনে ফেটে পড়ছে।
ক্লাইভ বললে–কুইক কিলপ্যাট্রিক এবার আমাদের আমি নিয়ে ওদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে-চলো
কিলপ্যাট্রিক মেজর হলে কী হবে, আসলে ছেলেমানুষ। শুধু ছেলেমানুষই নয়, সংসারী মানুষ। সংসারী মানুষরা লাভ-লোকসান খতিয়ে বিচার-বিবেচনা করে কাজ করে। কিন্তু অত বিচার-বিবেচনা করতে গেলে কি যুদ্ধ করা চলে? তুমি যদি অত বিচার-বিবেচনা করে চলো তো সংসারী মানুষ হিসেবে তোমার উন্নতি হবে। কিন্তু জীবনটা তো সংসার নয় মেজর। তোমরা সুখী হবে, তোমরা হয়তো চাকরিতেও উন্নতি করবে। আজ মেজর আছ, কাল হয়তো কর্নেলও হবে। কিন্তু এম্পায়ার? এম্পায়ার তৈরি করতে হলে সেই আমাকেই দরকার হবে যে!
কাল তোমরা সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলে। আমি যখন নবাবের আর্মিকে অ্যাটাক করবার জন্যে তোমাদের অর্ডার দিলুম, তোমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলে কিলপ্যাট্রিক। আমাদের আর্মি ছোট, আমাদের সেপাই কম, আমাদের গুলি-গোলাবারুদ কম। তোমরা ভেবেছিলে আমরা ওদের আর্মির চাপে পিষে গুঁড়িয়ে যাব। কিন্তু এখন?
আজ এই ময়দাপুরে এসে সবাই তোমরা ঘুমোচ্ছ। কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই কেন বলতে পারো?
না, আমাদের এ-প্ৰশ্নর জবাব দেবার দরকার নেই। এর জবাব দেবে হিস্ট্রি। হিস্ট্রিই একদিন উত্তর দেবে আমি কাল ভাল করেছিলাম না খারাপ করেছিলাম। আর তা ছাড়া এ তো যুদ্ধ নয় মেজর। ইন্ডিয়ানরা যদি যুদ্ধই করত তো কোথায় থাকতে তুমি, কোথায় থাকত কোম্পানি, আর কোথায় থাকতাম আমি। এতক্ষণ আমার ডেডবডি ভাসত লাগের খালে।
কে?
ক্লাইভের মনে হল কে যেন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কে তুমি? হু আর ইউ?
বাইরে অর্ডার্লিটা পর্যন্ত এমন অঘোরে ঘুমোচ্ছ যে ঘরে কে ঢুকল তা টের পায়নি।
সেন্ট ফোর্ট ডেভিড জয় করার পরও একবার এমনি হয়েছিল। যখন মনটা একলা থাকে, তখনই কে যেন এসে সামনে দাঁড়ায়।
কে তুমি? হু আর ইউ?
বেশ লম্বা-চওড়া ম্যানলি চেহারা। দেখে মনে হয় ইউপিয়ান। কেন এমন হয়? কেন এরা আসে? কেন এসে বারবার তাকে বিরক্ত করে?
আমাকে চিনতে পারছ না কম্যান্ডার? আমি আগে অনেকবার এসেছি যে তোমার কাছে?
ক্লাইভ কোমরের পিস্তলটায় হাত দিলে।
ওখানে হাত দিয়ো না কম্যান্ডার। ওতে আমার কিছুই হবে না। আমি মরি না।
কিন্তু হু আর ইউ? কেন তুমি আমার কাছে আসো বারবার?
লোকটা বললে–আমি সাকসেস!
সাকসেস?
হ্যাঁ, যে-লোক ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়, আমি তাদের সঙ্গেই দেখা করি। দেখা করে সাবধান করে দিই। সাবধান করে দেওয়াই যে আমার জ কর্নেল। তুমি এবার বড় হয়েছ। তুমি ম্যাড্রাসের সেন্ট ফোর্ট ডেভিড জয় করেছ, চন্দননগরের ফোর্ট জয় করেছ, এবার বেঙ্গলও নিয়ে নিলে।
