জগৎশেঠজির তাঞ্জাম আসছিল মতিঝিলের সামনে দিয়ে। মরালী আর সচ্চরিত্র সরে দাঁড়াল।
ঘটকমশাই বললে–শুনেছ মা, নবাব নাকি জগৎশেঠজিকে ডেকে পাঠিয়েছিল টাকার জন্যে।
আপনাকে কে বললে? কার কাছ থেকে শুনলেন?
নেয়ামত। ওই তো আমার মালিক। নবাব লক্কাবাগ থেকে একলা ফিরে আসার পর নেয়ামতও সেখান থেকে একটা ঘোড়া নিয়ে নবাবের পেছন পেছন চলে এসেছে। সে যে একটু আগে মতিঝিলে এসেছিল–
কী বললে–সে?
সে-ই তো আমাকে চলে যেতে বললে। বললে–ফিরিঙ্গি ফৌজ নবাবের পেছনে পেছনে মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছোচ্ছে। বললে–মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে যেতে। এখন এই বুড়ো বয়েসে কোথায় যাই বলো তো মা? আমার আছে কে যে তার কাছে যাব? তাই তো সেই কথা ভাবতে ভাবতেই যাচ্ছিলুম, এমন সময় তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল
ততক্ষণে মতিঝিলের ভেতরে এসে গিয়েছিল দুজনে।
ফাঁকা মতিঝিল, ফাঁকা চবুতরা, ফাঁকা দালান! সমস্ত হাবেলিটা যেন খাঁ খাঁ করছে।
মরালীই আগে আগে উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।
ওপরের অলিন্দ পেরিয়ে একেবারে শেষ ঘরখানার সামনে গিয়ে দেখলে দরজা বন্ধ।
সচ্চরিত্র বললে–দরজা খোলাই আছে মা, ধাক্কা দাও, দরজা খুলে যাবে
কিন্তু দরজাটা খুলতেই অবাক হয়ে গেল মরালী! কোথায়? কান্ত কোথায়?
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাইও অবাক হয়ে গেছে, কোথায় গেল? কান্তবাবাজি কোথায় গেল?
সচ্চরিত্র বললে–এই তো আমি এখনই দেখে গেলাম বাবাজিকে। এই তো আমার সঙ্গে কথা হল
কী কথা হল?
আমি বাবাজিকে বললাম–বাবাজি, এখন কেউ নেই, আমি পালিয়ে যাচ্ছি, তুমিও যেদিক পানে দু’চোখ যায় পালিয়ে চলো। তা আমার কথা শুনলে না। বললে–আপনি একলা চলে যান ঘটকমশাই, আমি যাব না। আমি চলে গেলে মরালীকে ওরা ধরে ফেলবে। তা তবু কত করে বললাম, কিছুতেই শুনলে না। তখন দরজার চাবিটা খুলে দিয়ে আমি বাবাজিকে রেখে চলে গেলাম
মরালী জিজ্ঞেস করলে আপনি এখান থেকে চলে যাবার পর আর কেউ এসেছিল?
সচ্চরিত্র বললে–কে আর আসতে যাবে মা এখানে। কারও তো এদিকে নজর দেবার সময় নেই। এখন যে সবাই চেহেল সূতুনের দিকে নজর দিচ্ছে। সেখানে যে যা পারে হাতাচ্ছে। শুনলাম নাকি ঘসেটি বেগমসাহেবা, যাঁকে নবাব নজরবন্দি করে রেখেছিলেন, তিনি এই ফাঁকে গয়নাগাটি নিয়ে পালিয়েছেন।
মরালী চমকে উঠল। জিজ্ঞেস করলে–ঘসেটি বেগমসাহেবার কথা আপনাকে কে বললে?
কে আবার বলবে মা। সকলের মুখে মুখে তো ওই এক কথা! আরও শুনছি নবাবের মা আমিনা বেগমসাহেবাকে নাকি নবাব নিজে হাতেনাতে ধরে ফেলেছে
কেন?
তিনি নাকি চেহেল্-সুতুনের মালখানা থেকে সোনা-জহরত গয়নাগাটি সরাচ্ছিলেন। তাকে নাকি কোতল করা হয়ে গেছে।
আপনি ঠিক শুনেছেন?
সচ্চরিত্র বললে–তা কী করে বলব মা। লোকের মুখে যা যা শুনলাম তাই তোমাকে বলছি। ওইসব শুনেই তো প্রাণটা ভয়ে কাঁপতে লাগল। অবাক কাণ্ড মা, একদিন জাত গিয়েছিল বলে নিজেই ইছামতীতে ডুবে মরতে গিয়েছিলাম, এখন আবার সেই পোড়া প্রাণটার জন্যে পালিয়ে বাঁচবার চেষ্টা করছি
তা হলে এখন কী করব? কী করা যায় বলুন তো?
সচ্চরিত্র বললে–আমিও তো তাই ভাবছি মা, কান্তবাবাজিকে আমি পইপই করে পালিয়ে যেতে বললাম, তখন গেল না। এখন কী যে হল কে জানে!
মরালী বললে–শেষপর্যন্ত আপনি চলে যাবার পর হয়তো চলেই গেছে–
না, তা তো যাবার মতো ছেলে নয় আমার বাবাজি।
মরালী জিজ্ঞেস করলে কী করে বুঝলেন?
সচ্চরিত্র বললে–আমাকে যে বাবাজি সব বলেছে মা। তোমার সঙ্গে বিয়ে হয়নি বলে বাবাজির মনে বড় কষ্ট ছিল যে। আমি বলতাম বাবাজিকে, সবকিছুর জন্যে আমিই দায়ী বাবাজি, তোমাদেরও বিয়েটা হল না, আমারও সর্বনাশ হয়ে গেল।
তারপর একটু থেমে সচ্চরিত্র বলতে লাগল–আর একটা কী কথা জানো মা, বাবাজি আমাকে বরাবর বলত–আমিই মরালীর জাত খেয়েছি পুরকায়স্থমশাই, আমিই চেহেল্-সুতুনে মরালীকে এনে পুরেছি
মরালী বললে–কিন্তু যা হয়ে গেছে তা নিয়ে কেন ভাবত ও?
সচ্চরিত্র বললে–সেই কথা কে বলে বাবাজিকে! বাবাজি কেবল সেই কথা ভেবে ভেবে মনমরা হয়ে থাকত। আমি কতবার বলতাম–তোমার কী ভাবনা বাবাজি, তোমার বয়েস আছে, তুমি আর একটা বিয়ে করে নিয়ে আবার ঘরসংসার করো গে, কিন্তু কার কথা কে শোনে।
চলুন ঘটকমশাই, এখানে দাঁড়িয়ে কোনও লাভ নেই।
সচ্চরিত্র বললে–কিন্তু তুমি কোথায় যাবে মা এখন?
আপনি? আপনি কোথায় যাবেন?
আমার কথা ছেড়ে দাও মা, আমি আবার একটা মানুষ! আমার প্রাণটার ভারী তো দাম। তুমি কোথায় যাবে বলো?
মরালী বললে–আমার কথা আপনাকে আর ভাবতে হবে না ঘটকমশাই, আপনি আপনার কথা ভাবুন
সচ্চরিত্র বললে–তা কি কখনও হয় মা? তোমাকে এ-সময়ে কি একলা ছেড়ে দিতে পারি? মুসলমান হয়ে গিয়েছি বলে কি আমি মানুষ নই মা? আমারও তো হিন্দু মেয়ে আছে–
তা হলে আপনি কোথায় যাবেন?
সচ্চরিত্র বললে–তুমি যেখানে যাবে না, আমি সেখানেই যাব
মরালী বললে–আমার তো কোনও যাবার জায়গাও নেই ঘটকমশাই, আমি হাতিয়াগড় থেকে এসেছিলুম, চেহেসতুনে ঢুকে আপনার মতোই একদিন জাত খুইয়েছিলুম, এখন আবার সেই চেহেলসুতুনও যে গেল। আমি এখন কোথায় যাই?
সচ্চরিত্র বললে–আমার কথা যদি শোনো মা, এখন তোমার এই মুর্শিদাবাদে থাকা উচিত নয়, শুনেছি ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে। এ সময়ে তারা এসে যদি নবাবের নিজামত কেড়ে নেয় তো মহামারী কাণ্ড হবে মা-তার চেয়ে মা তুমি হাতিয়াগড়ে চললা, আমি তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি
