মরালী আড়ষ্ট হয়ে গেল কথাটা শুনে। সন্দেহ করছে নাকি?
জনাব কি নয়া এসেছেন মুর্শিদাবাদে?
মরালী আর দাঁড়াল না সেখানে। একবার পেছন ফিরে দেখে নিলে লোকটা তাকে দেখছে কিনা। তারপর আবার সামনের দিকে চলতে লাগল। চড়া রোদ উঠেছে আকাশে।
কিন্তু খবরটা তখন মুখে মুখে ফিরছে।
কী বললেন জনাব?
হাঁ জি, নবাব খতম, নিজামত ভি খতম
তার মানে?
তারপর সব খবরটা বেরিয়ে এল। নবাব লড়াইতে হেরে গেছে। যা শুনেছিল, সব তা হলে সত্যি। ফিরিঙ্গি ফৌজ মুর্শিদাবাদে আসছে। তা হলে কী হবে? সেই ক্লাইভ সাহেব এসে নবাব হবে মুর্শিদাবাদের? এই মুর্শিদাবাদের মসনদে বসবে?
সঙ্গে সঙ্গে আবার ফিরল। সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের দিকে আবার চলতে লাগল। ফিরিঙ্গি ফৌজ আসবার আগেই যা-কিছু বন্দোবস্ত সব শেষ করে ফেলতে হবে। ঘসেটি বেগমসাহেবাও হয়তো সেই ঘুপচি ঘরের ভেতরে বসে বসে ভাবছে! নজরকুলি খাঁ-কে ডেকে দেবার কথা ছিল, তার জন্যে অপেক্ষা করছে।
কিন্তু কাছাকাছি আসতেই নজরে পড়ল খুশবু তেলের দোকানের সামনে অনেক মানুষের ভিড়। ওখানে কী হচ্ছে। তবে কি জানাজানি হয়ে গেছে যে, ঘসেটি বেগমসাহেবা বাদির পোশাক পরে ওখানে লুকিয়ে আছে?
কী ভেবে মরালী সেখানেই খানিক দাঁড়িয়ে পড়ল। ওখানে আর যাওয়া চলে না। তা হলে কোথায় যাবে?
আবার চলতে লাগল উলটো দিকে। উলটো দিকের পথও তো মহিমাপুরে যাবার পথ। জগৎশেঠজির বাড়ির পথ। জগৎশেঠজির কাছে যাবে? জগৎশেঠজিকে গিয়ে সব বলবে? এখন সত্যি কথাটা বলতে আর দোষ কী? এখন তো জানাজানি হলে আর কিছু ভয় নেই। এখন যদি জগৎশেঠজিকে গিয়ে একবার ছোটমশাইকে খবর দিতে বলে, তা কি আর তিনি দেবেন না?
জগৎশেঠজিকে গিয়ে স্পষ্টই বলে দেবে আমি আসল মরিয়ম বেগম নই, আসল মরিয়ম বেগম মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে আছে–আপনি হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইকে একবার খবরটা পাঠান–
আর তা ছাড়া এখন যদি মেহেদি নেসার সাহেব জানতেও পারে যে, রানিবিবি সেজে শোভারাম বিশ্বাসের মেয়ে চেহেল্-সুতুনে এসেছিল, তাতেও কোনও ক্ষতি নেই। এখন তো সব ফিরিঙ্গি রাজত্ব হয়ে যাচ্ছে। এখন তো নবাব হবে ক্লাইভ সাহেব!
মুখটা ফেরাতেই হঠাৎ দেখলে সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই—
একী, আপনি?
হ্যাঁ মা, আমি
কোথায় যাচ্ছেন?
সচ্চরিত্র বললে–আমি মা চলে যাচ্ছি মতিঝিল ছেড়ে, শুনলাম নাকি ফিরিঙ্গি ফৌজ মুর্শিদাবাদে আসছে?
তা আর সবাই কোথায়?
কেউ নেই মা, সবাই চাকরি ছেড়ে পালিয়েছে। আমিই বা আর থাকি কেন? একবার মোছলমান হয়েছি, এবার হয়তো আবার খিরিস্টান হতে বলবে–
বলে ইব্রাহিম খাঁ হাউহাউ করে কেঁদে উঠল।
আর কান্ত? সে কোথায় রইল?
সচ্চরিত্র বললে–আমি বাবাজিকে অনেক করে বললাম আমার সঙ্গে আসতে। কিন্তু এল না
কেন?
বাবাজি বললে–না, মেহেদি নেসার যদি জানতে পারে মরিয়ম বেগমসাহেবা পালিয়ে গেছে তো মরালীর ওপর অত্যাচার করবে। তার চেয়ে আমি এখানেই থাকি।
মরালী বললে–তা এখন তো আর কেউ নেই সেখানে, তবু কেন রইল?
ও মা, শুধু তোমার জন্যে। শুধু তোমার বিপদের কথা ভেবেই বাবাজি একলা পড়ে রইল। আমি কত করে পালিয়ে যেতে বললাম, তবু শুনলে না। তোমার কথা ভেবে ভেবেই বাবাজি অস্থির। কেবল বলছে, মরালীর যেন কোনও ক্ষতি না হয়, আমার যা হয় হোক–একেবারে আস্ত পাগল।
মরালী বললে–চলুন, আপনিও আমার সঙ্গে চলুন, আমি নিজে গিয়ে তাকে বার করে আনছি।
সচ্চরিত্র বললে–তাই চলো মা, তাই চলল। আমার কথা তো বাবাজি শুনবে না, এখন তোমার কথা যদি শোনে–
মরালী তাড়াতাড়ি মতিঝিলের দিকে চলতে লাগল। পেছন পেছন সচ্চরিত্র পুরকায়স্থও চলল।
মতিঝিলের সামনে-পিছনে তখন মানুষের মিছিল, কিন্তু ভেতরটা ফাঁকা, আগে অন্যদিন যেখানে খিদমদগারদের জটলা চলত, চবুতরার আশেপাশে যেখানে নবাব-বেগমদের তাঞ্জাম-পালকি-হাতি-ঘোড়ার জটলা হত, সেখানেও কেউ নেই।
মরালীর মনটা তখনও পড়ে ছিল সেই সারাফত আলির দোকানে। মাত্র কিছুক্ষণের জন্য ছিল সেখানে। কিন্তু তারই মধ্যে দেখে এসেছিল কোথায় কোন ঘরে কেমন করে কান্ত থাকে। অন্ধকার ঘুপচি ঘরখানা। বাইরের আলো বাতাস ঢোকে না সেখানে। তবু ওইখানেই দিনের পর দিন কাটিয়েছে।
আচ্ছা, ঘটকমশাই, ওখানে অত ভিড় ছিল কেন বলুন তো?
কোথায় মা?
ওই যে সারাফত আলি সাহেবের খুশবু তেলের দোকানের সামনে?
সচ্চরিত্র বললে–কী করে বলব মা, আজকে তো সব জায়গাতেই ভিড়। সবাই-ই তো মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালাচ্ছে। ফিরিঙ্গি ফৌজের ভয়ে কেউ আর এখানে থাকতে চাইছেনা।
ফিরিঙ্গিরা এসে অত্যাচার করবে নাকি?
না, তার জন্যে নয় মা। সবাই কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়েছে যে। ভিস্তিরা আজ সকাল থেকে জল দেয়নি, যে-হাতিগুলো আছে পিলখানায় তারা খেতে পর্যন্ত পায়নি কাল থেকে। মুর্শিদাবাদের ঘাটে মদের জালার চালান এসেছে। কিন্তু আনতে যেতে পারিনি
কেন, আনতে যেতে পারেননি কেন?
মতিঝিলের সরাবখানা কার ওপর ছেড়ে দিয়ে যাব? দেখছনা মা, সকালবেলা নহবতমঞ্জিল থেকে বাজনা শুরু হয়েছিল, তারপর হঠাৎ বলা-নেই কওয়া-নেই থেমে গেল। এমন কখনও আগে হয়েছে? এমন কখনও আগে হতে শুনেছ?
আশেপাশের লোকগুলো যে-সব আলোচনা করছে তাও কানে এল। কেউ বলছে ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে, কেউ বলছেনবাব জগৎশেঠজিকে ডেকে পাঠিয়েছে আবার ফৌজ তৈরি করবার জন্যে! ফৌজ। তৈরি করে কি নবাব আবার নতুন করে লড়াই করতে যাবে?
