ইনসাফ মিঞা তখন জয়জয়ন্তীর কোমল নিখাদে সবে নেমেছে। সেই নিখাদটা নিয়ে সে কায়দা করে আবার গান্ধারে যাবে, হঠাৎ ছোটে শাগরেদ বললে–উস্তাদজি উ কৌন ভাগ আতি হ্যায়?
ওপর থেকে নীচের সব দেখা যায়। নিচু হয়ে দেখলে।
কিন্তু ইনসাফ মিঞা বাধা পেয়ে খেপে গেছে। একেই মেজাজ বিগড়ে আছেনবাবের ব্যাপার নিয়ে। টোড়ি থেকে জয়জয়ন্তী বাজাতে হয়েছে, তার ওপর ছোটে শাগরেদের এই বখেড়া। বাজনা থামিয়ে একটা ধমক দিয়ে উঠল–চোপরাও বেল্লিক
রসের বাধা পড়লে গুণীর মুখ দিয়ে তো গালাগালি বেরোবেই।
কিন্তু ওদিকে তখন সারাফত আলি সাহেবের খুশবু তেলের দোকানের সামনে ভিড় আরও বেড়ে গেছে। দুটো ষাঁড়ে লড়াই লাগলেও চকবাজারের রাস্তাতে এমনি মানুষের ভিড় জমে। আর এ তো মোগলে-পাঠানে লড়াই। বুড়ো আর জোয়ানে। বুড়ো সারাফত আলির মেহেদি রং-লাগানো দাড়িটা। ধরে নজরকুলি তখন প্রাণপণে টানছে। আর সারাফত আলিও জোরে জাপটে ধরে আছে নজরকুলি খাঁ-কে–
যত জড়াজড়ি চলেছে, তত ভিড় বাড়ছে মানুষের।
বাদশা ছোটমশাইয়ের সঙ্গে আসছিল। দূর থেকে তার নজরে পড়েছে। ফিরিঙ্গি ফৌজের কথাটা কানে আসতেই যে-যেদিকে পারে দৌড়োচ্ছিল। বাদশাও দৌড়োচ্ছিল খুশবু তেলের দোকান লক্ষ্য করে।
ছোটমশাই সেই বয়েসে বাদশার সঙ্গে দৌড়িয়ে পারবে কেন?
বাদশা একবার পেছন ফিরে ডাকলে–জলদি আইয়ে বাবুজি–জলদি
ছোটমশাই বললে–একটু আস্তে, একটু আস্তে চলো
ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে, তুরন্ত চলে আসুন—
কিন্তু অত তাড়াহুড়ো সহ্য হবে কেন ছোটমশাইয়ের। একদিন হলেও নাহয় সহ্য হত, কিন্তু এ যে ক’ মাস ধরেই এইরকম চলছে। তবু যদি লোকটার সঙ্গে গেলে একটা কিছু হদিস পাওয়া যায়, তাই প্রাণ বার করে বাদশার সঙ্গে সঙ্গে আসছিল।
হঠাৎ বাদশা দোকানের কাছাকাছি এসে অত মানুষের ভিড় দেখে অবাক হয়ে গেছে। এই একটু আগেই যখন সে দোকান থেকে চলে গিয়েছিল বাবুজিকে ডাকতে, তখনও তো এত হল্লা ছিল না। কী হল আবার? ফিরিঙ্গি ফৌজ আসবার খবর পেয়ে সবাই বুড়ো সারাফত আলির দোকানের সামনে এসে জুটেছে নাকি?
ছোটমশাইও দেখেছে। এত ভিড় হল কেন? তবে কি মরিয়ম বেগমসাহেবা ধরা পড়ল?
ও বাদশা, ওখানে তোমাদের দোকানের সামনে অত হল্লা কেন?
বাদশা সেকথার উত্তর না দিয়ে একেবারে জটলার পেছনে এসে দাঁড়াল। তারপর ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করলে
কেয়া হুয়্যা ভাইয়া? ইহা কেয়া হোতা হ্যায়?
কিন্তু কে আর তখন বাদশার কথার উত্তর দেবে। তারা সবাই হুমড়ি খেয়ে তামাসা দেখছে। মজাটার কিছু অংশও যেন ফসকে না যায়।
কিন্তু বাদশা ভাল করে কিছু দেখতে পাবার আগেই ফয়সালা হয়ে গেছে। চরম ফয়সালা। সারাফত আলি নজরকুলি খাঁর ধাক্কা খেয়ে তখন সেই যে মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ল আর উঠতে পারলে না। শুধু শেষ নিশ্বাস ফেলবার আগে একবার বলতে চেষ্টা করলে ইয়া আল্লা–
কিন্তু বোধহয় তখন তার অন্তিম অবস্থা। সেই শব্দটুকু উচ্চারণ করবার শক্তিটুকুও তার নেই। সেই যে বুড়ো মুখ গুঁজড়ে পড়ে রইল আর উঠল না।
নজরকুলি তখন বিজয়ীর মতন তার গায়ের ওপর দু’চারটে লাথি মারলে। তাতেও সাড়া নেই সারাফত আলির। সারাফত আলি যেন তখন নিজের আরক খেয়ে অজ্ঞান-অচৈতন্য হয়ে সেখানে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
বাদশা এতক্ষণে বুঝতে পারলে। কোনওরকমে ভিড় ঠেলে যখন ভেতরে যেতে পারলে, ততক্ষণে সব শেষ সব খতম–
নজরকুলি খাঁ এদিক-ওদিক চাইতে লাগল। মেহের? মেহের কোথায় গেল?
কে একজন বদ ছোকরা বুঝি রসিকতা করে বললে–পঞ্জি ভাগ গয়ি–
আর ছোটমশাই! ছোটমশাই যখন দেখলে বুড়ো সারাফত আলি, খুশবু তেলের দোকানের মালিক, খুন হয়ে গেছে, তখন ভয়ে আঁতকে উঠল।ঝগড়াটা কাকে নিয়ে? মরিয়ম বেগমসাহেবাকে নিয়ে নাকি?
সামনের একজনকে ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলে মেয়েটা কে?
জনাব, সে চেহেলসূতুনের এক বাঁদি
কোথায় গেল সে?
জনাব, সে ভাগ গয়ি।
ভাগ গয়ি মানে? কোথায় ভাগ গয়ি? কোন দিকে?
ওই দিকে। ওই চেহেল সুতুনের দিকে। ছুটতে ছুটতে আবার চেহেল্-সুতুনের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে।
যেন বাজ ভেঙে পড়ল ছোটমশাইয়ের মাথায়। মতিঝিল থেকে বেরিয়ে আর কোনও উপায় না দেখে ছোটবউ হয়তো কান্তবাবুর সঙ্গে এখানেই এসেছিল। ভেবেছিল এখানে এসে তারপর কোনওরকমে খবরটা পাঠাবে হাতিয়াগড়ে। তা আর হল না। তার আগেই খুশবু তেলের দোকানের মালিক টের পেয়ে গেছে। তারপর মারামারি হাতাহাতি খুননাখুনি শুরু হয়ে গেছে। সেই ফাঁকে আর কোনও উপায় না পেয়ে আবার চেহেল্-সুতুনের ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে
তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বেরোল ছোটমশাই!
আর দেরি করা চলে না। খবরটা গিয়ে দিতে হবে জগৎশেঠজিকে। আবার মহিমাপুরের দিকে চলতে লাগল ছোটমশাই—
*
মরালী খুশবু তেলের দোকান থেকে বেরিয়ে নজরকুলি খাঁ’র বাড়ির দিকেই যাচ্ছিল। কিন্তু নহবতমঞ্জিলে আবার বাজনার শব্দ শুনে কেমন যেন সন্দেহ হল। আবার নহবত বেজে উঠল কেন? নবাব কি তবে লড়াইতে জিতেছে। নবাবের ফৌজ লড়াই জিতে ফিরে আসবার খবর পৌঁছে গেছে?
সারা মুর্শিদাবাদ যেন পাগল হয়ে উঠেছে ভোরবেলা থেকে।
একজন বুড়োমন লোক দেখে মরালী জিজ্ঞেস করলে কী হয়েছে শহরে? আপনি জানেন কিছু?
লোকটা মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখলে ভাল করে। তারপর নিঃসন্দেহ হয়ে বললে–জনাব কোন মুলুকের লোক?
