লোকগুলো হো হো করে হেসে উঠল। বেগমসাহেবাদের খেদমত করেছে, খোশামোদ করেছে তা কী হয়েছে? বেগমসাহেবাদের খেদমত করা কি গুনাহ?
আলবাত গুনাহ! হাজারবার গুনাহ! বেগমসাহেবরা তো হাজি আহম্মদের বংশের নবাবের মা, নবাবের মাসি, নবাবের আওরত!
লোকগুলো আরও জোরে হেসে উঠল। নবাব নিয়ে এত জোরে হাসি-ঠাট্টা-তামাসা করবার সাহস কালকেও ছিল না কারও। অথচ এক রাত্রের মধ্যে কী আমূল পরিবক্স হয়ে গেল। শুধু নবাব নয়, নবাবের মা, নবাবের বেগম নিয়েও হাসি-ঠাট্টা-তামাসা। এ যেন কাল কেউ কল্পনাও করতে পারত না।
থুঃ থুঃ থুঃ–সেই প্রকাশ্য দিনের আলোয় সারাফত আলি সাহেব হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসল। আর কিছু করতে পেরে ঘসেটি বেগমের মাথার ওপর থুঃ থুঃ করে থুতু ফেলতে লাগল। যেন ঘসেটি বেগমের মাথার ওপর থুতু ফেললেই হাজি আহম্মদের বংশের ওপর চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়া যাবে।
সারাফত আলি সাহেবের কাণ্ড দেখে চকবাজারের রাস্তার মানুষ যেন এক বিনা-পয়সার মজা পেয়েছে। তারা হেসে গড়িয়ে পড়ল। সারাফত আলি সাহেবের দেখাদেখি তারাও থুতু ফেলতে লাগল ঘসেটি বেগমের মাথার ওপর।
সারাফত আলি সাহেবের আনন্দ আর ধরে না। বললে–ফেকো থুক, থুক ফেকো
অর্থাৎ–আরও থুতু ফেলল। আরও প্রতিশোধ নাও। আমার বিবির ওপর হাজি আহম্মদ যে অত্যাচার করেছে, তোমরা সকলে মিলে দল বেঁধে তার প্রতিশোধ নাও। এই নিজামত, এই নবাব, এই মুঘল-শক্তির মাথার ওপর তোমরা থুতু ফেলল। আবার পাঠান রাজত্ব আসুক, ফিরিঙ্গি রাজত্ব আসুক, আবার মারাঠি রাজত্ব আসুক। আমি সব সহ্য করব মুখ বুজে। কিন্তু হাজি আহম্মদের বংশকে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসতে দেব না। আমি অনেক আরক খাইয়েছি ওই বেগবাদিদের, অনেক আসরফি খরচ করেছি এদের মারতে। এতদিন এদের কাউকে হাতের কাছে পাইনি, আজ পেয়েছি। আজকে একেই, এই বাঁদিকেই খতম করি
থুঃ থুঃ থুঃ—
হঠাৎ ঘসেটি বেগম কাকে দেখে চিৎকার করে উঠল–নজর-নজর–আমার নজর
নজরকুলি খাঁ রাজনীতিও বোঝে না, রানিনীতিও বোঝে না। একটা নীতিই শুধু সে বোঝে, সে হল নারীনীতি। জীবনে কোনও সুখকেই সে সুখ বলে মনে করে না, একমাত্র নারীসুখ ছাড়া। আল্লাহ তাকে মেয়েমানুষ-ভোলানো রূপ দিয়েছিল। সেইটেই ছিল তার মূলধন। সেই মূলধন ভাঙিয়েই সে একদিন সুখের সিংহাসনে বাদশা হয়ে বসেছিল। এই ঘসেটি বেগমসাহেবাই একদিন তার রূপ-যৌবন দেখে তাকে মতিঝিলের বিছানায় পাশে নিয়ে শুয়েছিল। কিন্তু যেদিন নবাব মির্জা মহম্মদ মতিঝিলে হামলা। করে ঘসেটি বেগমকে পাকড়াও করে নিয়ে আসতে গিয়েছিল, সেদিন থেকেইনজরকুলি খাঁর জীবনের সব সুখ চলে গিয়েছে। ঘসেটি বেগমের দেওয়া সোনাদি-মোহর নিয়ে চলে গিয়েছিল কাশী। কিন্তু জুয়াতে আর ভাঙে সব হারিয়ে আবার মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছিল। সেই মোহর নেই, সেই রূপ নেই, সেই আগেকার যৌবন নেই তখন। কিন্তু যৌবনের নেশা তখনও যায়নি। সেই রাত হলেই। মেহেরউন্নিসার কথা মনে পড়ত আর চকবাজারে বস্তির মধ্যে গিয়ে বাজারের ভাড়া করা মেহেরউন্নিসাদের সঙ্গে শুয়ে পুরনো আস্বাদ বাজিয়ে নিত।
সেদিনও নজরকুলি বস্তিতে রাত কাটিয়ে ফিরছিল অন্য দিনের মতো। কিন্তু রাস্তার মধ্যে গোলমাল, হল্লা আর ভিড় দেখে থমকে দাঁড়াল। কে? সারাফত আলি সাহেবকার মাথায় থুতু ফেলছে অমন করে! ভেতরে কে?
উঁকি মেরে দেখতে গিয়েই মেহেরউন্নিসার গলার আওয়াজ এল নজর–নজর–মেরা নজর–
এতক্ষণে সারাফত আলি সাহেব নজর দিয়ে দেখলে নজরকুলির দিকে।
মেহের, মেহের, মেরা মেহের
মেহেরউন্নিসার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল নজরকুলি খাঁ। কিন্তু বুড়ো সারাফত আলি সাহেব। তার চুলের মুঠিটা ধরে ফেলেছে।
দুশমন, বেত্তমিজ কাহিকা
কিন্তু নজরকুলিই বা কম যায় কীসে। একদিন তার স্বাস্থ্য ছিল, একদিন শ্বেতপাথরের মতন চকচকে ছিল তার পেশিগুলো। তখন মুর্শিদাবাদের মেয়েরা তার দিকে লোভাতুর দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে থাকত। তারপর জুয়া, রাত-জাগা আর অত্যাচারের ফলে সে চেহারার বাহার আর নেই। কিন্তু তবু যা আছে, তাতে তখনও বুড়ো সারাফত আলিকে কাবু করা যায়।
নজরকুলি খাঁ-ও সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠেছে তবে রে বুড়ো মিঞা
আর তারপর সেই সকালবেলা চকবাজারের রাস্তার ওপরেই দু’জনের মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এতদিন শুধু দূর থেকেই সারাফত আলি সাহেব মনে মনে পুড়েছে, এতদিন শুধু দূর থেকেই সারাফত আলি অভিশাপ দিয়েছে নিজামতকে। আর আজ যেন লড়াই করবার মতো একটা লোক পেল প্রথম। বুড়ো হাড়ে যতটা শক্তি ছিল, সব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নজর কুলির ওপর ।
আর চারপাশে যারা মজা দেখছিল, তারা তখন তামাসা পেয়ে লাফিয়ে উঠেছে লে ঝটাপট–লে ঝটাপট-লে
যখন নজরকুলি খাঁ আর সারাফত আলি জড়াজড়ি করে রাস্তার ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে, আর লোকগুলো সবাই সেই দিকে দেখতে ব্যস্ত, তখন ঘসেটি বেগম এক ফাঁকে লুকিয়ে পড়ল। তারপর ভিড়ের মধ্যে দিয়ে একেবারে বাইরে বেরিয়ে এল সকলের চোখের আড়ালে। আর তারপর যেদিকে পারলে ছুটে চলতে লাগল।
দু’-একজন বুঝি দেখতে পেয়েছিল।
ওরে, বাঁদিজি ভাগ রহি হ্যায়
ছুট ছুট–পাকড়ো, পাকড়ো
কিছু লোক বাঁদির পেছন পেছন ছুটতে লাগল। কিন্তু ঘসেটি বেগমসাহেবার তখন চরম বিপদ। তিরের মতো ছুটতে ছুটতে চলেছে সে। আর কোনও দিকে তার যাবার নিশানা নেই–সামনেই চেহেলসূতুনের ফটক ভোলা পড়ে রয়েছে। পাহারাদার নেই। তার ভেতরেই সোঁ সোঁ করে ঢুকে পড়ল।
