কিন্তু বয়েসও তো হচ্ছে! যত বয়েস হচ্ছে ততই কুঁজো হয়ে পড়ছে। মনে হয় আর বোধহয় কিছু দেখে যেতে পারবে না। এই চেহেল্-সুতুন, এই নিজামতের বরবাদি এ-জিন্দগিতে বোধহয় আর দেখা হল না।
সকালবেলাই একটা বেত্তমিজ এসে মেজাজটা বিগড়ে দিয়ে গিয়েছিল। সারাফত আলি সাহেব ভেবেছিল সকালবেলাই বুঝি খুশবু তেলের খদ্দের এসেছে। কিন্তু না, খদ্দের নয়, কান্তবাবুকে খুঁজতে এসেছে
হিসেব করতে করতে হঠাৎ মনে হল চকবাজারের রাস্তায় গোলমালটা যেন আবার বেড়ে উঠল।
ক্যা হুয়া?
রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলে তোকজন দৌড়োচ্ছ আর বলছে–ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে–ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে
ফিরিঙ্গি ফৌজ আতা হ্যায়!
বুড়ো লাফিয়ে উঠল। লাফিয়ে উঠতে গিয়ে হিসেবের খাতাটা কোল থেকে ছিটকে পড়ল মাটিতে। তা পড়ুক।
বাদশা, বাদশা
বাদশার সাড়াশব্দ নেই। এক ডাকে বেল্লিকটা জবাব দেবেনা কখনও। সোজা ভেতরের দিকে গিয়ে ডাকলে-বাদশা, বাদশা, এ বাদশা
কোথাও নেই বাদশা। কোথায় গেল বেত্তমিজটা! লোকগুলো কী বলছে সেইটে জানতে হবে। ফিরিঙ্গি ফৌজ কি সত্যিই আতা হ্যায়? কখন আসবে? কখন এসে নিজামতে চড়াও হবে, জানা দরকার।
হঠাৎ বুড়োর মনে হল কাবাবুর ঘরের ভেতরে কে যেন বসে আছে। মানুষের মতো মালুম হচ্ছে।
কৌন? কৌন ইহা? কৌন তুম? কান্তবাবু?
কিছু জবাব নেই কারও। সারাফত আলি সাহেব আস্তে আস্তে ঘরের দরজাটা হাট করে খুলে ভেতরে ঢুকল।
ঘসেটি বেগম তখন ভয়ে কাঁপছে।
কৌন তুম? তুম কৌন হো?
তবু জবাব নেই। সারাফত আলি সাহেব একেবারে মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ল।
বলে–কৌন তুম?
সেই ছোট ঘুপচি ঘরের মধ্যে ঘসেটি বেগম তখন ঘামছে। বোরখার ভেতরে তার হাতের পুঁটলিটা বারবার হাত থেকে খসে যাবার জোগাড় হচ্ছিল।
সারাফত আলি সাহেবের দৃষ্টি ক্ষীণ হতে পারে, কিন্তু নেশার ঘোর তখন কেটে গেছে।
বললে–জবাব দেও, কৌন তুম? ইহা ক্যায়সে আয়ি
তবু জবাব দিতে ঘসেটি বেগমের ভয় হল। যদি জানাজানি হয়ে যায় শহরে যে ঘসেটি বেগম এই খুশবু তেলের দোকানে লুকিয়ে আছে, তা হলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। নজরকুলি খাঁ যদি এর মধ্যে এসে পড়ে, তা হলেই সে যেন বেঁচে যায়। কিন্তু এত দেরিই বা করছে কেন সে এখানে আসতে! তবে কি মরিয়ম কোনও খবর দেয়নি তাকে? না, নজরকুলি এখনও বাড়ি ফেরেনি। রাত্রে কোথায় যায় সে? যদি কোথাও গিয়েই থাকে তো এত দেরি করে কেন বাড়ি ফেরে?
সারাফত আলি আর দেরি সহ্য করতে পারলে না।
জীবনে অনেক প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ স্পৃহা বুকের মধ্যে পুষে রেখে রেখে বুড়ো হয়ে গেছে। সে। অনেক আরক অনেক তামাক অনেক আগরবাতি হজম করে ফেলেছে মিছিমিছি। পাঠান দেশ থেকে পায়ে হেঁটে হেঁটে বাংলা মুলুকে এসেছে শুধু কি এই আরক আর তামাকের আর ধূপের কারবার করবার জন্যে? এতদিন যে রাগ পুষে রেখেছে বুকের মধ্যে সে কি শুধু নিজের মনে মনে পুড়ে ছাই হবার জন্যে?
জবাব দেও–দেও জবাব!
আর দেরি করলে না সারাফত আলি। এক টানে ঘসেটি বেগমের বোরখাটায় টান দিলে, আর ঘসেটির মুখখানা স্পষ্ট বেরিয়ে পড়ল সারাফত আলির ঝাপসা দৃষ্টির সামনে।
মুখখানা দেখে চিনতে পারলে না বুড়ো৷ একেবারে মুখখানার কাছে নিজের গোঁফ-দাড়িওয়ালা মুখখানা নিচু করে নামিয়ে নিয়ে এল।
বললে–কৌন হ্যায় তুম?
আমি বাঁদি হুজুর, চেহেল্-সুতুনের বাঁদি!
চেহেলসূতুনের বাঁদি তো এখানে কেন? ইহা কেঁও?
ঘসেটি বেগম ভয়ে ভয়ে বললে–হুজুর, চেহেল্-সুতুনে ইনকিলাব শুরু হয়েছে
ইনকিলাব?
হ্যাঁ হুজুর, ইনকিলাব শুরু হয়েছে। লুঠপাট-খুনজখম চলছে, আমি ঘসেটি বেগমসাহেবার বাঁদি রাবেয়া। মেরা নাম রাবেয়া খাতুন, তাই পালিয়ে এসেছি
ঘসেটি বেগম?
ঘসেটি বেগমের নামটা শুনেই সারাফত আলির পাঠানি রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। কী করবে বুঝতে পারলে না হঠাৎ। তার পরে একটু সংবিৎ ফিরতেই ঘসেটি বেগমের চুলের মুঠি ধরলে। বললে–চল, আমার সঙ্গে চল। ইনকিলাবের সময় তুই কেন বাঁচবি? তোকেও মরতে হবে। চল আমার সঙ্গে ঘসেটি বেগমের সঙ্গে তোরও কবর দেব–
ঘসেটি বেগমের বাঁদি যে কী অপরাধ করেছে, তার কোনও প্রমাণ নেই। তোক বাঁদি, কিন্তু এই বাঁদিরাই তো বেগমসাহেবাদের খেদমত করে। এই বাঁদিরাই হাজি আহম্মদের ছেলের বউদের তদ্বির-তদারক-খোশামোদ করে। সেই বউরাই তো মুর্শিদাবাদের নবাবকে পয়দা করেছে। হাতের কাছে বেগমদের না পেয়ে যেন বাদিদের ওপর অত্যাচার করেই সারাফত আলি তার নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে চাইছে।
ডাকলে–বাদশা-বাদশা
ডেকেই কিন্তু মনে পড়ল, বাদশা বাড়িতে নেই। কোথাও গেছে। তা হলে নিজেকেই যেতে হয়।
হঠাৎ ঘসেটি বেগমের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে তাকে বাইরে নিয়ে এল সারাফত আলি। বেশ দিন হয়ে গেছে তখন। রাস্তায় লোকজন জমে গেছে। চেহেল্-সুতুনের বোরখা-পরা মেয়েমানুষকে রাস্তায় হিড়হিড় করে টানাটানি করতে দেখে ভিড় জমে গেল চারপাশে।
কেয়া হুয়া আলিসাহেব?
সারাফত আলি বুড়ো মানুষ। আগেকার মতো শরীরে তাকত নেই। কিন্তু রাগ আছে। রাগের তেজও আছে। চিৎকার করে উঠল–চল, উল্লুকা-পাঠঠা।
চারপাশের মানুষ আবার জিজ্ঞেস করলে–কী হয়েছে আলিসাহেব?
আরে জনাব, এ-হারামজাদি বাঁদি চেহেলসুতুনের বেগমসাহেবাদের খেদমত করেছে, বেগমসাহেবাদের হুকুম তামিল করেছে, বেগমসাহেবাদের তদ্বির-তদারক-খোশামোদ করেছে এবাদি হারামজাদি আছে–
