কিন্তু এখন কোথায় যাওয়া যায়? জগৎশেঠজি তো নবাবের আমদরবারে গেছে। সেখানে নবাব হয়তো আবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে। আবার ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করে সব অপমানের প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে। কিন্তু তারই মধ্যে যদি বউকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা যায়। দরকার হলে ঘুষ দেবে। জগৎশেঠজির কাছ থেকে নয়তো ধার করে টাকা নেবে।
মতিঝিলের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল ছোটমশাই।
ফটকে অন্য দিনের মতো কোনও পাহারাদার নেই। নহবত-মঞ্জিলে নহবত থেমে গিয়েছিল, কিন্তু আবার বাজতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু তোকজন নেই কেন?
একবার মনে হল এই সুযোগে ঢুকে পড়বে নাকি ভেতরে? কিন্তু যদি ধরা পড়ে যায় তখন? তখন তো জবাবদিহি দেবার আর কেউ থাকবে না। ভেতরে মতিঝিলটার দিকে চেয়ে দেখলে। ঝিল পেরিয়ে বিরাট প্রাসাদ। এই বাড়ি তৈরি হবার সময় থেকেই দেখে আসছে ছোটমশাই।
বাবুজি।
চমকে উঠেছে ছোটমশাই। পেছন ফিরে দেখলে কে একজন তাকে ডাকছে। অচেনা মুখ।
তুমি কে?
লোকটি বললে–আমি বাদশা হুজুর। বাঁদিজি আমাকে পাঠিয়েছে
বাঁদিজি? কোন বাঁদিজি? কোথাকার বাঁদিজি?
লোকটা যেন খুলে বলতে চাইছে না সব। কিংবা বলতে ভয় পাচ্ছে।
শেষকালে বললে–আপনি আমাকে চিনতে পারছেন তো?
ছোটমশাই বললে–না
আমি সেই সারাফত আলি সাহেবের খুশবু তেলের দোকানের নোকর বাবুজি। আপনি একটু আগে সেখানে কান্তবাবুকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। আমি সেখান থেকেই আসছি
ছোটমশাই বললে–তা কান্তবাবু কি ফিরে এসেছে?
না, লেকন বাঁদিজি আছে।
কে বাঁদিজি?
কান্তবাবুর সঙ্গে এক বাঁদিজি এসেছিল, চেহেল সুতুনের বাঁদিজি, সেই বাঁদিজি আপনার নাম জিজ্ঞেস করতে পাঠিয়েছে।
ছোটমশাই অবাক হয়ে গেল।
বললে–কিন্তু চেহেল্-সুতুনের বাঁদিজি তোমাদের দোকানে এল কেন?
তা জানি না বাবুজি। কান্তবাবু বলেছে চেহেল সুতুনের বাঁদিজি, তাই বলছি। আমি তার মুখ ভি দেখিনি, বোরখায় ঢাকা আছে–
ছোটমশাইয়ের মনটায় কেমন দোলা লাগল। বোরখা পরে আছে। চেহেল সুতুনের বাঁদিজি! এমন তো হয় না। এমন তো হবার কথা নয়। নিশ্চয় কোনও রহস্য আছে এর পেছনে। তবে কি কান্তবাবু তার স্ত্রীকে মতিঝিল থেকে বোরখা পরিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে এসে লুকিয়ে রেখেছে ওখানে?
এ বাঁদিজি কি তোমাদের দোকানে আগে কখনও এসেছে?
না হুজুর, বাঁদিজিরা দোকানে আসবে কেন? চেহেল্-সুতুনের খোজারা আসে মাল গন্ত করতে!
তুমি জানো কিছু বাঁদিজি কেন এসেছে?
না হুজুর, তা মালুম নেই, বাঁদিজি আজ সকালেই কান্তবাবুর সঙ্গে এসেছে। আপনাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছে আপনার নাম কী
তোমার বাঁদিজি কি আমাকে চেনে? আমাকে দেখেছে?
তাও মালুম নেই হুজুর।
ছোটমশাই কী যেন ভাবলে। হয়তো চেহেল্-সুতুনের বাঁদিকে জিজ্ঞেস করলে মরিয়ম বেগমের সম্বন্ধে কিছু জানা যাবে। চেহেল্-সুতুনের বাঁদি যখন, তখন নিশ্চয়ই মরিয়ম বেগমকে চেনে।
তুমি বাঁদিজির কাছে আমাকে একবার নিয়ে যেতে পারবে?
বাদশা বললে–হুকুম না পেলে কী করে নিয়ে যাব হুজুর? বেগর অনুমতিতে আমি কী করে আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব? আপনার কী দরকার বলুন?
কী দরকার, সেটা বাঁদিজিকে বলব, তোমাকে বলা যায় না!
তা হলে আমি বাঁদিজিকে গুছিয়ে বলব।
ছোটমশাই বললে–তার চেয়ে এক কাজ করো, আমি তোমার সঙ্গে দোকান পর্যন্ত যাই, তুমি ভেতর থেকে বাঁদিজিকে জিজ্ঞেস করে আমাকে এসে ডেকে নিয়ে যেয়ো
বাদশা বললে–তা চলুন, তবে বেশি গোলমাল করবেন না হুজুর, সারাফত আলি সাহেব বড় গোসা করবে, বড় বদরাগী মানুষ
চলো
বলে ছোটমশাই আবার চকবাজারের দিকে চলতে লাগল বাদশার সঙ্গে সঙ্গে। আগের দিন সারারাত ঘুম হয়নি, সমস্ত দিনটাও বিশ্রাম হয়নি। তার ওপর মানসিক যন্ত্রণারও শেষ নেই। তারপর আজ ভোর থেকেই ঝঞ্ঝাট চলেছে। মুর্শিদাবাদের ভিত পর্যন্ত নড়ে গেছে যেন। হাতিয়াগড়ের মতো মুর্শিদাবাদেরও যেন সর্বনাশ ঘনিয়ে এসেছে।
হঠাৎ রাস্তার লোকগুলো যেন একটু বেশি চঞ্চল হয়ে উঠল। ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে। ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে। হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার।
যে যেদিকে পারছে দৌড়োত লাগল।
বাদশা থমকে দাঁড়াল। হোমশাইও খানিক থমকে দাঁড়াল। ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে। তা হলে তো ক্লাইভ সাহেবও আসছে।
সেই ১৭৫৭ সালের ২৪ জুন সমস্ত বাংলা মুলুক যেন আশায় আনন্দে উৎসাহে আত্মহারা হয়ে উঠল। আসছে, আসছে, ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে। ফিরিঙ্গি ফৌজ আসছে।
বাদশাও দৌড়োতে লাগল সকলের দেখাদেখি। ছোটমশাইও বাদশার পেছন পেছন জোর কদমে পা বাড়িয়ে দিলে। ক্লাইভ সাহেব আসছে। আর কিছু ভয় নেই আর কিছু দুঃখ নেই। এবার আর সুন্দরী মেয়ে-বউদের লুকিয়ে রাখতে হবে না। টাকা কড়ি-গয়না-মোহর আর মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে না।
বাদশা পেছন ফিরে চিৎকার করে ডাকলে জলদি আসুন হুজুর, জলদি
ছোটমশাই তখন ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছে। তবু কোনওরকমে শরীরটাকে টেনে নিয়ে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলতে লাগল।
*
সারাফত আলি সাহেব সকালবেলার দিকে একটু তাজা থাকে। আগের রাত্রের নেশা তখন সবটাই কেটে যায়। সকালবেলার দিকে খুশবু তেলের দোকানে তেমন খদ্দের আসে না। কিন্তু তাতে কিছু ক্ষতি হয় না সারাফত আলি সাহেবের। খদ্দের না থাকাই ভাল। আর নেশার জিনিসের কারবার আলি সাহেবের, নেশার জিনিস সকালবেলা কে কিনবে? তখন মালের হিসেব রাখবার সময়। লাভ-লোকসানের কথা বড় একটা ভাবে না সারাফত আলি সাহেব। লাভ-লোকসানের কথাই যদি ভাববে তত দিল্লি ছেড়ে এখানে এই বাংলা মুলুকে–এই মুর্শিদাবাদে দোকান করতে আসবে কেন সে?
