মির্জা বললে–না, নানিজি, আম-দরবারে আমি সকলকে বসিয়ে রেখে এসেছি, তারা সবাই অপেক্ষা করছে, আমি আসি। জানি কিছু হবে না। যার মা নিজের ছেলের জিনিস চুরি করে, যার মাসি শত্রু, তার কোনও আশা নেই। তবু একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি। জগৎশেঠজি অনেক ডাকাডাকির পর শেষপর্যন্ত এসেছে
বলে আর দাঁড়াল না সেখানে। আবার ফিরে গেল আম-দরবারে।
*
বুড়ো সারাফত আলির তখনই সন্দেহ হয়েছিল। ভোরবেলা যখন চকবাজারের রাস্তায় প্রথম হল্লা শুরু হয় তখন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। তারপর যত বেলা বাড়তে লাগল ততই বাড়তে লাগল গোলমাল। একবার যেন আশা হল। হাজি আহম্মদের বংশটা তবে কি বরবাদ হল নাকি।
বাদশা।
বাদশা কাছে আসতেই মিঞাসাহেব বললে–এ কীসের গোলমাল রে?
হুজুর, নবাব লড়াই থেকে ফিরে এসেছে
অ্যাঁ?
আনন্দে খুশিতে যেন ডগমগ করে উঠল। নবাব হেরে গেছে? আল্লাহ্ তার আর্জি শুনেছে?
ওপাশে দোকানের সামনে কে একজন এসে দাঁড়াল। সারাফত আলি লোকটার দিকে চেয়ে দেখলে। শরিফ খানদানি আদমি বলে মনে হল যেন। আরক কিনতে এসেছে নাকি?
কী চাই? আগরবাতি? তাম্বাকু? খুশবু তেল?
ছোটমশাইয়ের এখানে আসতে একটু সংকোচই হয়েছিল। প্রথমত তাঞ্জাম নেই, হাতি নেই, হেঁটে আসা। তারপর সেই মহিমাপুর থেকে চকবাজার পর্যন্ত সমস্ত রাস্তাটায় কেবল মানুষের ভিড়। কত রকম লোক কত রকম কথা বলছে। কেউ বলছে নবাব লড়াইতে হেরে ফিরে এসেছে, কেউ বলছে নবাব বন্দুকের চোট খেয়েছে। কেউ আবার বলছে নবাব মারা গেছে। কেউ কারও কথা বিশ্বাস করছে না। কেউ বলছে ফিরিঙ্গিফৌজ এখনই মুর্শিদাবাদে এসে পড়ল বলে।
না, ধূপ চাই না।
তা হলে খুশবু তেল? ভরি দু’মোহর
ছোটমশাই বললে–না, এখানে কান্তবাবু বলে কেউ থাকে? কান্ত সরকার? আমি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
বাদশা বললে–না বাবুজি, কান্তবাবু এখনই এসেছিল, একটু আগেই বেরিয়ে গেছে। আপনি কোত্থেকে আসছেন? আপনার নাম কী?
ছোটমশাই কী বলবে বুঝতে পারলে না। তারপর বললে–আমার নাম বললে–চিনতে পারবে না। কন আসবে কান্তবাবু?
আপনি একটু বসবেন?
বুড়ো সারাফাত আলির ভাল লাগল না কথাটা। বললে–কেন বসবে? কাহে বৈঠেগা? তুমি কে? তুম কৌন হে? কাহাসে আয়া হো? বাবুজি তুমহারা কৌন লগতা হ্যায়?
এতগুলো কথা বুড়োটার মুখ থেকে শুনতে হবে ভাবতে পারেনি ছোটমশাই। অথচ রাগারাগি করাও যায় না। মুখ বুজে সহ্য করাই ভাল।
বললে–আমার সঙ্গে তার নিজের একটা দরকার ছিল।
সারাফত আলি তখন বাদশাকে বলছে–যাকে-তাকে দোকানে বসতে বলছিস কেন? তোর দোকান? এ আমার দোকান, আমি এর মালিক, আমি যাকে এখানে বসতে দেব সে এখানে বসবে। আপনি এখন যান, এখানে কারও সঙ্গে দেখা হবে না।
ভেতর থেকে সমস্ত কথাগুলো শুনছিল ঘসেটি বেগম। একবার মনে হল নজরকুলি খাঁ নাকি? নজরকুলি খাঁ খবর পেয়েছে নাকি যে তার মেহেরুন্নিসা এখানে এসে উঠেছে?
একবার মনে হল চিৎকার করে বলে-নজর, এই যে আমি এখানে
কিন্তু আবার মনে হল, সে কী করেই বা জানবে যে তার মেহের এখানে এসে উঠেছে।
যে-লোকটা এতক্ষণ কথা বলছিল সে বোধহয় এখন চলে গেছে। আর কারও কথা শোনা গেল না। কিন্তু এমন করে এখানে চুপ করে বসে বসে সময় নষ্ট করেই বা কী হবে?
দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলে, সেই বাদশা রান্না করবার জোগাড় করছে। দরজার কাছে এসে ডাকলে বাদশা
বাদশা ডাক শুনে কাছে এল।
তোমার নাম বাদশা তো? ও কে এসেছিল বলতে পারো? এতক্ষণ কার গলা শুনছিলাম?
নাম জানি না বাঁদিজি, ও শায়েদ এমনি রাস্তার লোক, ওকে ডাকব?
ঘসেটি বেগম বললে–না, ডাকতে হবে না, তুমি গিয়ে ওকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারো? জিজ্ঞেস করে এসো গিয়ে ওর নাম কী।
বাদশা বললে–যাচ্ছি বাঁদিজি, আমি এখনই জিজ্ঞেস করে আসছি
ছোটমশাই তখনও বেশি দূরে যায়নি। রাস্তায় তখনও ভিড় হচ্ছে। সবার মুখেই আতঙ্কের ছায়া। সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠেছে নিজামতের ভবিষ্যতের ভাবনায়।
ছোটমশাই কোনদিকে যাবে বুঝতে পারলে না। যখন চারদিকে গোলমাল, এই সময়ে মতিঝিলে গিয়ে দেখা করলে ক্ষতি কী? এখন কি আর পাহারাদার কেউ আছে সেখানে?নবাব তো লক্কাবাগ থেকে পালিয়ে এসেছে একলা। এখন তো ফৌজের সেপাই-সার্ভি সবাই সেখানে। এখন যদি কেউ চেহেল্-সুতুন থেকে। পালিয়ে বাইরে চলে আসে কে দেখতে পাবে? এই সময়টাই তো ভয়ের। এই সময়েই তো বেগমরা বাঁদিরা নবাবের সম্পত্তি লুটপাট করে নিয়ে পালায়। কতবার এইরকম হয়েছে আগে। এক-একজন নবাব মসনদ ছেড়েছে আর সেই সুযোগে কত চুরি কত রাহাজানি হয়ে গেছে নবাবের হারেমে।
মতিঝিলে যাবে নাকি একবার?
কিন্তু সেই দাড়িওয়ালা বুড়ো খিদমদগারটা! বুড়োটা কিছু কথা বলেনি। কোনও কথার জবাব দেয়নি, শুধু দরজাটা খুলে দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। কেন যে সে ছোটমশাইকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল তারও কোনও উত্তর দেয়নি। ছোটমশাইকে মতিঝিল থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে তার কী লাভ? কে তাকে পায়ে ধরেছিল ছোটমশাইকে ছেড়ে দিতে!
ছোটমশাই তবু জিজ্ঞেস করেছিল তাকে–মরিয়ম বেগমসাহেবা কোথায়, কোন ঘরে?
বুড়োটা জবাব দেয়নি।
তার সঙ্গে একবার আমার দেখা করিয়ে দিতে পারো তুমি?
তবু বুড়োটা কিছু বলেনি।
তারপর আর কোনও উপায় না দেখে ছোটমশাই একেবারে সোজা জগৎশেঠজির বাড়ির দিকে চলে গিয়েছিল।
