নবাব কথাগুলো বলছে আর সমস্ত দরবার-ঘরটা গমগম করে উঠছে।
দূর থেকে জগৎশেঠজি সব শুনছিলেন। নবাবের সামনে অনেক ভিড়। মুর্শিদাবাদের কেউ আর আসতে বাকি নেই। এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে মেহেদি নেসার আর একপাশে হাতিয়াগড়ের ডিহিদার রেজা আলি। তার পাশে ইরাজ খাঁ, তার পাশে গোলাম হোসেন, তার পাশে..
আমি তাই আজ তোমাদের সকলকে আমার সামনে ডেকে পাঠিয়েছি। বিপদ যে সামনে এগিয়ে আসছে তা তোমরা বুঝতে পারছ। আর বিপদের দিনে যে আপন-পর ভাবলে চলে না তাও তোমরা জানো। এ-বিপদ যেমন আলিবর্দি খাঁ’র আমলে এসেছিল সে-বিপদ নয়। এরা পশ্চিম থেকে এসে দেশ লুঠপাট করে আবার নিজের দেশে ফিরে যাবে না। এরা মসনদ নিয়ে নেবে। হিন্দুস্থান নিয়ে নেবে। এরা দিল্লির বাদশার মসনদ কেড়ে নিয়ে তামাম হিন্দুস্থানে কায়েম হয়ে বসবে। আমি এই দুই হাত জোড় করে তোমাদের বলছি, তোমরা আমাকে ফৌজ দাও, টাকা দাও, সোনা দাও, তোমাদের যা কিছু আছে সব দিয়ে আমার মুর্শিদাবাদের মসনদ বাঁচাও। আমাকে বাঁচালে তোমরাও বাঁচবে, আমার মসনদ থাকলে তোমাদের মুর্শিদাবাদও থাকবে। আমি আল্লার নামে শপথ করে বলছি, মসনদ যদি এবার বাঁচে তো এ তোমাদের কাউকে দিয়ে আমি চলে যাব। দুরে কোথাও চলে গিয়ে আল্লার নাম করব-বলো তোমরা আমায় মদত দেবে? বলল তোমরা আমার পাশে থাকবে?
নবাব তখনও জগৎশেঠজিকে দেখতে পায়নি, তখনও একমনে কথা বলে চলেছে
হঠাৎ চেহেল্-সুতুনের ভিতর থেকে যেন কী-এক চিৎকার গোলমাল কানে এল।
নবাব অন্যমনস্ক হয়ে গেল কে? কার গোলমাল? কীসের আওয়াজ?
শুধু নবাব নয়, মেহেদি নেসারও যেন কান পেতে রইল সেইদিকে। ডিহিদার রেজা আলিও অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আম-দরবারে যত আমির-ওমরাও ছিল সবাই-ই যেন একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। এমন তো হয় না? তবে কি চকবাজারের রাস্তার লোকজন সবাই চেহেল্-সুতুনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে?
জগৎশেঠজিও কেমন অবাক হয়ে গেলেন।
পাশে তখনও দাঁড়িয়ে আছে মনসুর আলি মেহের সাহেব। জিজ্ঞেস করলেন–ও কীসের আওয়াজ?
মোহরার সাহেবও বুঝতে পারছিল না। কান পেতে রইল। চেহেল্-সুতুনের হারেম থেকে এমন শব্দ তো কখনও আসে না।
জগৎশেঠজির কী যেন সন্দেহ হল।
জিজ্ঞেস করলেন–ফিরিঙ্গিরা এসে পড়ল নাকি?
কথাটা মনে লাগল মোহরার সাহেবের। বললে–দাঁড়ান, দেখে আসি—
বলে মনসুর আলি মেহের সাহেব কোথায় চলে গেল।
নবাব বোধহয় আবার কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আওয়াজটা আরও বাড়ল যেন। এবার মেয়েলি গলার শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল। চেহেলসুতুনের হারেমে এত বড় বেআদপি তো কখনও আগে আর ঘটেনি? তবে?
ইরাজ খা আর থাকতে পারলে না। বলে উঠল–নেয়ামত কোথায়? নেয়ামত?
নেয়ামত নেই। নেয়ামত তার আগেই হারেমের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। সেখানে তখন গোলমাল চলেছে চারদিকে।
পিরালি খাঁ দৌড়োচ্ছিল ভুলভুলাইয়ার দিকে। নেয়ামত ডাকলে খসাহেব, কী হল? গোলমাল কীসের?
কিন্তু খাঁ সাহেবের কানে বোধহয় সেশব্দ গেল না। কিন্তু নেয়ামতও ছাড়লে । পেছনে আসছিল নজর মহম্মদ।
কী রে নজর? নানিবেগমসাহেবা অত চেঁচাচ্ছে কেন?
নজর মহম্মদ চলতে চলতেই বললে–চোর ধরা পড়েছে চেহেলসূতুনে!
চেহেলসতুনের হারেমের ভেতর চোর? কথাটা যেন বিশ্বাস হল না নেয়ামতের।
বললে–কে চুরি করেছে?
আমিনা বেগমসাহেবা।
আমিনা বেগমসাহেবা? নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার মা? কী চুরি করতে গেল?
তবু নজর মহম্মদ সবটা খুলেও বললে–না। সোজা চলে গেল ভেতরের দিকে। আজ চেহেল্-সুতুনের ভেতরে যেন সব অরাজক অবস্থা। নেয়ামতকে দেখে চেহেল্-সুতুনের বেগমরা আর আড়ালে চলে গেল না। সেই তক্কি বেগম আলুথালু অবস্থাতেই একেবারে সামনে এসে হাজির হয়েছে।
জিজ্ঞেস করলে নেয়ামত, কী চুরি হয়েছে রে?
সেকথার উত্তর না দিয়ে নেয়ামত ভেতরের দিকে ছুটে গেল। সেখানে সব বেগমসাহেবারা এসে জুটেছে। জোরে জোরে কথা বলছে। বব্বু বেগম, গুলসন বেগম, পেশমন বেগম। সবাই।
হঠাৎ নবাবের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। আম-দরবার ছেড়ে নবাব হারেমের ভেতরে এসে ঢুকেছে।
পিরালি খাঁ?
সেই দাউদপুর থেকে সমস্ত রাস্তাটা উটের পিঠে দৌড়োতে দৌড়োতে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল নবাব। তারপর ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই। আম-দরবারে আমির-ওমরাদের ডেকে তোয়াজ তদবির খোশামদ করতে হয়েছে। ওদিকে মুর্শিদাবাদের মসনদ যখন বিপন্ন তখন হারেমের ভেতরে এ কী গোলমাল!
খোদাবন্দ।
পিরালি খাঁ খোজা সর্দার কুর্নিশ করে সামনে এসে দাঁড়াল।
এত গোলমাল কীসের?
হারেমের ভেতরে চোর ধরা পড়েছে।
কে চুরি করেছে? কী চুরি করেছে?
পিরালি খাঁ বললে–জি খোদাবন্দ, মালখানার হিরে, জহরত, মুক্তো, আসরফি
কে, কে?
আমিনা বেগমসাহেবা!
নবাবের মাথার ওপর যেন বাজ ভেঙে পড়ল। মা! মাথা থেকে পা পর্যন্ত যেন টলতে লাগল।
নানিবেগমসাহেবা খবর পেয়েই দৌড়ে কাছে এসেছে। বললে–শুনেছিস মির্জা, মেহের পালিয়েছে
ঘসেটি বেগম?
অনেক খুঁজলাম, কোথাও পাওয়া গেল না তাকে। সমস্ত হারেম খুঁজেছে পিরালি সর্দার–
নবাব মির্জা মহম্মদ মুখে কিছু বললে–না। নানিবেগমসাহেবার দিকে শুধু চেয়ে রইল। বললে–আর একটা কথা তো বললে–না নানিজি? আমার মার কথা তো বললে–না। মালখানা থেকে কী কী চুরি করেছে মা?
নানিবেগমসাহেবা বললে–ওকথা থাক, তুই মাথা ঠান্ডা কর, আয়, আমার সঙ্গে আয়
