ছোটমশাই বললে–বহুদিন আগে তো একবার গিয়েছিলাম সেখানে, সেদিন ছিল না সে-লোক
এখনই আর একবার যান না, দেখুন না, পান কিনা তাকে। সে হয়তো কিছু খবর দিতে পারে। যদি না পান তো আবার ফিরে আসবেন। ততক্ষণ আমি একবার নবাবের সঙ্গে দেখা করে আসি জরুরি তলব দিয়েছে আমাকে নবাব
ঠিক আছে বলে ছোটমশাই আবার বেরোল। তখন বেশ ফরসা হয়ে গেছে চারদিক। রাস্তায় আরও লোক নেমেছে।
ছোটমশাই চলে যাবার পর জগৎশেঠজির তাঞ্জামও বেরোল। কদিন থেকেই ঘুম হচ্ছিল না জগৎশেঠজির। দেওয়ানজি, খাজাঞ্চি, মোহরার, সবাই ক’দিন ধরে বড় ব্যস্ত। একটা কিছু যুদ্ধ-বিগ্রহ হলেই টাকা দিয়ে নবাবকে মদত দিতে হয়। সেইটেই নিয়ম। লক্কাবাগে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে যাবার আগে দিতে হয়েছে টাকা। ফৌজের লোকেরা টাকা না নিয়ে লড়াই করতে যাবে না বলে বেঁকে বসেছিল। মিরজাফর আলি খাঁ আড়ালে টাকা দিতে বারণ করেছিল। কিন্তু না দিলে কি আর তখন পার পাওয়া যেত?
শুধু মিরজাফর আলি সাহেব নয়। ইয়ার লুৎফ খাঁ, রাজা দুর্লভরাম, সবাই-ই বলেছিল–আপনি যদি এখন টাকা দেন তো লড়াই থেকে ফিরে এসে আমাদের সকলকে কোতল করবে নবাব
সত্যিই তখন সবাই ভয় দেখিয়েছিল, এতদিনের সব ষড়যন্ত্র সব আয়োজন নষ্ট হবে। তাই নবাব ফৌজ নিয়ে চলে যাবার পর থেকেই উদ্বেগে আর অশান্তিতে দিন কেটেছে। কাল সকালেও খবর এসেছে, নবাবের মন-মেজাজ খারাপ। মেহেদি নেসার সাহেব নবাবের সঙ্গেই সারা রাস্তা গিয়েছিল। তাকেও নাকি নবাব বলেছে–ফিরে এসে সকলকে শায়েস্তা করবে। সেখানে গিয়ে কে যেন নবাবের সোনার কলকেটা চুরি করে নিয়েছিল, সে-খবরও এসেছিল। তারপর বৃষ্টিতে গোলাবারুদ ভিজে গিয়েছিল, তাও কানে এসেছিল। তারপরে সারারাত আর কোনও খবর আসেনি। দেওয়ানজি দফতরে বসে ছিল সারারাত। খবর এলেই যাতে বাড়ির ভেতরে শেঠজির কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। কিন্তু না, আর কোনও খবরই আসেনি।
শুধু ভোররাত্রে খবর এল নবাব রাজধানীতে ফিরে এসেছে। সঙ্গে কেউ ছিল না। একটা উটের পিঠে চড়ে একলা চেহেল সুতুনে ঢোকার সময় কেউ নাকি চিনতেও পারেনি নবাবকে।
তারপরেই খবর এল জগৎশেঠজির ডাক পড়েছে নবাবের আম-দরবারে
আর তারপরেই হাতিয়াগড়ের হিরণ্যনারায়ণ রায় এসে হাজির।
রাস্তায় সত্যিই লোকজনের বড় ভিড়। জগৎশেঠজির তাঞ্জাম মুর্শিদাবাদের মানুষেরা চেনে। সামনে চলেছে জগৎশেঠজির নিশানা লাগানো পাইক। ভিড় হটাতে হটাতে তারা আগে আগে চলেছে। চেহেলসূতুনের আম-দরবারের ফটকে এসে তাঞ্জাম থামতেই জগৎশেঠজি নামল। তারপর খিলেন-দেওয়া ইটের থামের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগল দৃরবার-ঘরের দিকে। সব যেন চারদিকে ছন্নছাড়া ভাব। চারদিকে ফিসফিস গুজগুজ শব্দ। মনসুর আলি মেহের, নিজামতের মোহরার জগৎশেঠজিকে দেখেই মাথা নিচু করে কুর্নিশ করলে।
বন্দেগি শেঠজি
নবাব ডেকেছে কেন মোহরার?
মনসুর আলি মেহের সাহেব বললে–শুধু আপনাকে নয় শেঠজি, নবাব আমাদেরও ডেকেছেন, সবাইকে ডেকেছে। মেহেদি নেসার সাহেবকেও ডেকেছেন। মুর্শিদাবাদে যত আমির-ওমরাও আছে সকলকে ডেকেছেন!
কিন্তু কী দরকার নবাবের? লক্কাবাগের লড়াইতে কী হল? মিরজাফর আলি সাহেব কোথায়? তারা কেউ আসেনি?
মনসুর আলি মেহের আরও কাছে সরে এল। মুখের কাছে মুখ নিচু করে বললে–ফিরিঙ্গি ক্লাইভ সাহেব মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে আসছে শেঠজি, আর কিছু ভয় নেই আমাদের।
কিন্তু জেনারেল ল’ সাহেবের যে ফৌজ নিয়ে আসবার কথা ছিল?
সে আর আসছেনা শেঠজি! আপনার কাছে টাকা চাইলে আপনি যেন আবার সেবারের মতো টাকা দিয়ে দেবেন না?
জগৎশেঠজি সেকথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন–তুমি ঠিক জানো জেনারেল ল’ সাহেব আসছে না?
হ্যাঁ শেঠজি, বিলকুল ঠিক। কিন্তু আপনাকে বলে রাখছি শেঠজি, আলি জাঁহা আপনাকে ডেকেছে টাকার জন্যে। আপনি যেন এবার আর টাকা দেবেন না সেবারের মতো
কিন্তু টাকা নিয়ে আলি জাঁহা কী করবে?
ফৌজ বানাবে! নতুন ফৌজ নিয়ে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে ফিন লড়াই করবে।
ফৌজ বানাবে? নতুন ফৌজ?
হ্যাঁ শেঠজি, আমাকে মেহেদি নেসার সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা করে বলতে বলেছে সব।
জগৎশেঠজি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন মিরজাফর আলি সাহেব এখন কোথায়?
দাউদপুরে। দাউদপুরে ক্লাইভসাহেব মিরজাফর আলি সাহেবকে ডেকে পাঠিয়েছে। সেখানে মিরজাফর আলি সাহেব আছে, তার ছেলে মিরনসাহেব আছে, মির্জা ওমর বেগ আছে, আর স্ক্র্যাফর্টন সাহেব আছে। ক্লাইভসাহেব মিরজাফর আলি সাহেবকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সুবাদার বলে স্বীকার করে নিয়েছে ।
জগৎশেঠজি চমকে উঠলেন।
বললেন–তাই নাকি? তারপর
তারপর মিরজাফর আলি সাহেব আর মিরনসাহেব রওয়ানা দিয়েছে দাউদপুর থেকে। মুর্শিদাবাদের দিকে আসছে খবর এসে গেছে। তাদের পথ আটকাবার জন্যেই আলি জাঁহা ফৌজ বানাতে চাইছেন রাতারাতি
হঠাৎ নেয়ামত দৌড়োত দৌড়াতে আসছিল, জগৎশেঠজিকে দেখে কুর্নিশ করে বললে–নবাব শেঠজিকে এত্তেলা দিয়েছেন, আপনাকে ডাকতেই আমি যাচ্ছিলাম
চলো
জগৎশেঠজি আর দাঁড়ালেন না। আগে আগে চলতে লাগলেন। আমরবার ঘরে তখন অনেক আমির-ওমরাহর ভিড়। দূরে নবাব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকলের সঙ্গে কথা বলছেন। জগৎশেঠজির মনে হল নবাবের যেন অন্য রকম চেহারা হয়ে গিয়েছে। যেন ভেঙে পড়েছে, নুয়ে পড়েছে চেহারাটা এই দু’দিনের মধ্যেই। যেন নবাবের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। যেন নবাব বলছে–আমার মসনদ আজ আর আমার নয়, এ তোমাদের সকলের মসনদ। আমি যদি এ-মসনদ হারাই তো তোমরাও এ হারাবে। তোমরাও আমার মতো নিঃস্ব হয়ে যাবে। তোমাদের জন্যেই আমিনবাবি পেয়েছিলাম, আমার নবাবি চলে গেলে তোমরাও তোমাদের অধিকার হারাবে। আমিই কি শুধু তোমাদের ছিলাম? তোমরাও তো আমারই ছিলে। তোমাদের ওপর একদিন যে অন্যায় করেছিলাম, তা আজ হাজার গুণ হয়ে আমার ওপরেই ফিরে এসেছে। তেমনই আমার ওপরেও যদি তোমরা কোনও অন্যায় করো, সে অন্যায় হাজার গুণ হয়ে আবার তোমাদের ওপরেও ফিরে আসবে। অন্যায় দিয়ে অন্যায়ের প্রতিকার যদি হত তা হলে কি আজকে আমাকে লক্কাবাগ ছেড়ে চলে আসতে হয়? চলে এসে তোমাদের কাছে মার্জনা ভিক্ষে চাইতে হয়?
