পালকিতে কে আছে?
জেনানা!
এবার আর আটকানো যায় না। ফটকটা ফাঁক করে রাস্তা করে দিলে ভিখু শেখ। দিতেই পালকি দুটো ভেতরে গিয়ে ঢুকল। মহিমাপুরের এই বাড়িতে কত নবাব এসেছে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এসেছে, নবাব সুজাউদ্দিন খাঁ এসেছে, নবাব সরফরাজ খাঁ এসেছে, নবাব আলিবর্দি খাঁ এসেছে। জগৎশেঠজিরা কি নবাবের চেয়ে কিছু ছোট? লড়াই করতে যখন টাকার কমতি পড়বে তখন তো জগৎশেঠজির কাছেই হাত পাততে হবে। দিল্লির বাদশার কাছেও যখন খাজনা পাঠাতে হবে তখন তো এই জগৎশেঠজির কাছেই হুন্ডি কাটতে হবে। পালকি ভেতরে চলে যাবার পর ভিখু শেখ আবার গোঁফজোড়া পাকিয়ে নিলে। ভিখু শেখ নিজে পাঠান, আর জগৎশেঠজি জৈন। তা হোক, ভিখু শেখের কাছে ইমানদারি আগে, তারপর জাত। ভিখু শেখ ইমানদারির জন্যে একবার নিজের জানের ঝুঁকি নিয়েছিল। দরকার হলে আবার নেবে। রাস্তার সামনে একটা ঘেয়ো কুকুর সামনের দিকে আসছিল। ভিখু শেখ বন্দুকটা জমিনের ওপর ঠুকল–ভাগো, নিকাল
শালা নেড়ি কুত্তার বাচ্চা! জগৎশেঠজির অন্দরে ঘুষতে এসেছে। নবাব সরফরাজ খাঁ এইরকম করে একদিন জগৎশেঠজির হারেমে ঘুষতে চেয়েছিল। তার ফল পেয়েছে নবাব। তোরও সেই দশা হবে। ভাগ ভাগ নিকাল যা–ভিখু শেখ বন্দুকটা নিয়ে আবার জমিনের ওপর ঠুকে দিলে।
ওদিকে দেউড়ি পেরিয়ে পালকি দুটো গিয়ে থামল দরদালানের সামনে। পালকির দরজা খুলে ঘোমটা দেওয়া জেনানা নামল একজন। পেছনের পালকিতেও জেনানা। আর নামল মোহরার মনসুর আলি মেহের। বশির মিঞা বুকটা আরও চিতিয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। জগৎশেঠজির অন্দরের দরোয়ান গদির দরজা খুলে দিলে। তারপর সকলকে বসতে বলে অন্দরে চলে গেল।
মনসুর আলি সাহেব বশিরকে বললে–তুই বাইরে যা
বশির মিঞা দরজার বাইরে এসে একটা বিড়ি ধরালে। তারপর চারদিকে চেয়ে দেখলে কেউ কোথাও নেই। মুর্শিদাবাদ থেকে অনেক দূরে এই মহিমাপুর। সারাদিন খেটে খেটে পরেশান হয়ে গিয়েছিল। তা জাসুসের কাজই এইরকম। ভেতরে কী কথা হচ্ছে শোনা যাচ্ছে না। ভিখু শেখ তখন নেড়ি কুত্তাটাকে তাড়া করছে। বশির মিঞা বললে–আহ্যাঁ হ্যাঁ, ওকে তাড়াচ্ছ কেন শেখজি, ও তো কুত্তা, ছাড়া আর কিছু নয়
তারপর ভাল করে ভাব করবার জন্যে জেব থেকে একটা বিড়ি বার করলে একটা বিড়ি পিয়ো খাঁ সাহেব
ভিখু শেখ এরকম অনেক বশির মিঞাকে বগলে টিপে মেরে ফেলতে পারে। কিছু বললে–না মুখে, বশিরের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে একবার চাইলে। অর্থাৎ আমি যার-তার নোকর নই ছোকরা, আমি শাহানশা বাদশা দিল্লির আলমগির বাদশার চেয়েও রেইস আদমি জগৎশেঠ মহাতাপজির নোকর! আমি কুত্তাদের সঙ্গে বাতচিত করি না–।
বশির মিঞা ভয়ে ভয়ে পেছিয়ে এসে বিড়িটাতে লম্বা লম্বা টান দিতে লাগল।
জগৎশেঠজি ঘরে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে আদাব করলে। ততক্ষণে মনসুর আলি ঘরের সব জানালা দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসেছে।
হুজুর, ইনিই সেই হলওয়েল সাহেব আর এঁকে তো চেনেনই, মিরজাফর আলি সাহেব।
জেনানার বোরখা খুলেছে তখন দুজনেই। জগৎশেঠজি বসতেই হলওয়েল সাহেব বসল, পাশে বসল মিরজাফর আলি খাঁ।
জগৎশেঠজি সোজা কথার লোক। ফতোদজি যতদিন বেঁচে ছিলেন, সব হাতেকলমে মহাতাপজিকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়ে গেছেন। মহাতাপজি নিজেও ছিলেন দিল্লির বাদশার দরবারে। তামাম দুনিয়ায় কোথায় কী ঘটছে তা জগৎশেঠজির জানতে বাকি নেই। দিল্লির বাদশাই হোক আর তাতারের খুদে চামড়ার কারবারিই হোক, জগৎশেঠজির কাছে টাকার জন্যে হাত পাততেই হবে। ফতোদজি রেখে গিয়েছিলেন দশ কোটি টাকা, মহাতাপজি আর স্বরূপচাঁদজি দুই ভাই মিলে তাকে এই কদিনেই বাড়িয়ে করেছেন বারো কোটি টাকার জন্যেই বরাবর ওয়াটস্ সাহেব, কলেট সাহেব, হলওয়েল সাহেব, ব্যাটসন সাহেব সবাই তার কাছে এসেছে হুন্ডির জন্যে। কিন্তু এবার অন্য কারবার। এবার টাকা নয়, দুনিয়াদারি।
হলওয়েল সাহেব বললে–না হুজুর, দুনিয়াদারি নয়–
জগৎশেঠজি বললেন–তা দুনিয়াদারি নয় তো কী? আমার সঙ্গে টেক্কা দিয়ে আপনাদের কাউন্সিল কলকাতায় ঠাকশাল করেছে, আমি খবর পেয়েছি।
হলওয়েল ইংরেজ বাচ্চা। গরম হতে জানলেও নরম হতেও জানে। বললে–আপনি যদি বলেন হুজুর তো মিন্ট আমরা তুলে দেব, আপনার মিন্ট থেকেই আগেকার মতন আর্কট টাকা ম্যানুফ্যাকচার করে দেব! আপনি হুজুর যা বলবেন তাই-ই করব, আমাদের কোম্পানি ইন্ডিয়াতে ব্যাবসা করতে এসেছে, পিসফুলি ব্যাবসা করতে পারলে আমরা তো আর কিছু চাই না। কিন্তু নবাব আমাদের তাও করতে দেবেন না
তারপর একটু থেমে আবার বললে–সেই জন্যেই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, আমি শুনেছি আপনি হুজুর এব্যাপারে কোম্পানির কাউন্সিলকে হেল্প করবেন
মিরজাফর আলি এতক্ষণ চুপ করে ছিল। জগৎশেঠজির সামনে বহুবার এসেছে আগে আলিবর্দি খাঁ’র সময়ে। কিন্তু তখনকার কথা আলাদা। হজরত আলির শেষ বংশধর। নবাব আলিবর্দির সৎ বোনের স্বামী। বড় ভালবাসত আলিবর্দি খাঁ তাকে। কিন্তু শেষের দিকে চটে গিয়েছিলেন নবাব তার ওপর।
জগৎশেঠজি হঠাৎ বললেন–শরবত আনতে বলব?
হলওয়েল সাহেব মাথা নিচু করে সবিনয়ে বললে–আপনার খেয়েই আপনার মেহেরবানিতেই কাউন্সিল এখানে টিকে আছে হুজুর আর আপনাকে তকলিফ দেব না
