ছোটমশাই তা জানত। কিন্তু ভেতরের খবর কিছুই জানত না। ভেতরে ভেতরে যে এত কাণ্ড হয়ে গেছে, হাতিয়াগড়ের ডিহিদার রেজা আলি সাহেব যে একদিন আগে মুর্শিদাবাদে এসে সব ফাস করে দিয়েছে তাও জানত না।
জগৎশেঠজি যখন ঘরে এলেন তখনও ছোটমশাই কিছু খবর পায়নি।
ছোটমশাই বললে–আমার সহধর্মিণীকে মেহেদি নেসার ওই মতিঝিলেই আটক করে রেখেছে যে-
-জগৎশেঠজি বললেন–কে বললে–আপনাকে?
আমি নিজের চোখে দেখেছি! সে-সব কথা তো আপনাকে সবই বললুম। মেহেদি নেসার আমাকে আগে ধরেছিল, তারপর মোল্লাহাটির কাছে গিয়ে আমার সহধর্মিণীকেও ধরে। তখন আমার স্ত্রী ওদের নৌকোটা দেখতে পেয়ে ডাঙায় ঝাঁপ দিয়ে পালাতে যাচ্ছিল
আপনার স্ত্রী একলা ছিলেন?
না, সঙ্গে আর একজন কে ছিল। তাকে চিনতে পারিনি।
তারপর?
তারপর সেখান থেকে আমাদের ধরে নিয়ে মতিঝিলে এনে রাখে। কয়েক ঘণ্টা আমি ওখানেই ছিলাম, ভাবলাম মেহেদি নেসারের হাতে যখন পড়েছি তখন আর আমার রেহাই নেই। কিন্তু কে একজন হঠাৎ এসে আমার দরজার চাবি-তালা খুলে দিলে
কে সে?
তা জানি না। মুখময় দাড়ি, খুব বুড়ো একজন মুসলমান খিদমদগার।
নেয়ামত, সেও কি এর মধ্যে ফিরে এল নাকি? কী বললে সে?
ছোটমশাই বললে–কিছু বললে–না। আমার ঘরের ফটকটা খুলে দিয়ে চলে গেল। তাকে আর দেখতে পেলুম না। ভাবলাম আমার সহধর্মিণীকে কোথায় আটকে রেখেছে সেটা একবার দেখে আসি। কিন্তু আর সাহস হল না ওখানে থাকতে। তাই ছাড়া পেয়েই বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম। দেখলুম চারদিকে লোকজন গমগম করছে। লোকেরা বলাবলি করছে নবাব নাকি লঙ্কাবাগের যুদ্ধে হেরে চলে এসেছে রাতারাতি। সকলের ভয় হয়ে গেছে, হয়তো নিজামতি চলে যাবে কেউ কেউ বলছে কর্নেল ক্লাইভ নাকি ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দিয়েছে
জগৎশেঠজি চুপ করে শুনছিলেন। কিন্তু উত্তর দিলেন না।
ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলে আপনি কিছু শোনেননি?
জগৎশেঠজি বললেন–সবই শুনেছি, শুধু শুনেছি নয়, নবাবের কাছ থেকে ডাকও এসেছে আমার…
ছোটমশাই চমকে উঠল।
তাই নাকি? নবাব আপনাকে ডাকলেন কেন?
আমার কাছে তো সবাই টাকার জন্যেই আসে। আমার সবচেয়ে বড় খাতির আমার টাকার জন্যে। তাই এখন বিপদে পড়ে আমাকেই স্মরণ করতে হয়েছে।
ছোটমশাই বললে–আপনি টাকা দিচ্ছেন নাকি?
সেই কথাই ভাবছিলাম। ভাবছিলাম নবাবের সামনে গিয়ে কী বলব। একবার সকলের সামনে আমার মুখে চড় মেরেছিল নবাব। আমাকে ফাটকের মধ্যে আটকে রেখেছিল, সে কথা আমি ভুলিনি।
এখন নবাবের কী রকম অবস্থা?
জগৎশেঠজি বললেন–তা জানি না, এখন সকলকে ডেকে পাঠাচ্ছেন। রাত চার প্রহরের সময় নাকি হঠাৎ চেহেল্-সুতুনে এসে পৌঁছেছেন। কেউ তাকে চিনতে পারেনি শুনছি। কী করেই বা চিনতে পারবে? কী করে কল্পনা করবে যে, নবাব ওই শেষরাত্রের দিকে একলা উটের পিঠে চড়ে চেহেল্-সুতুনে ঢুকবেন! সবাই তখন যে-যার জায়গায় মড়ার মতো ঘুমুচ্ছে। নহবত-মঞ্জিলে ইনসাফ মিঞা নহবত বাজাচ্ছিল, সেঁও গোলমাল শুনে বাজনা থামিয়ে দিয়েছিল। নানিবেগমসাহেবাও নাকি শুনছি চেহেলসুতুনে ছিল না
কিন্তু আপনি না-হয় সব খোঁজখবর পান, কিন্তু লোকে এসব খবর কী করে পেলে? আমি যখন গঙ্গার ঘাট থেকে আসছিলাম তখনই শেষরাত্তিরের দিকেই মনে হয়েছিল চকবাজারের রাস্তায় হইহল্লা করছিল
আর একটা কথা
ছোটমশাই বললে–কী?
আপনি জানেন কি না জানি না। এদিকে তো এই গণ্ডগোল, ওদিকে আবার শুনলাম আপনার হাতিয়াগড়ের ডিহিদার রেজা আলিটা হঠাৎ এই হট্টগোলের মধ্যে এসে পৌঁছেছে–
সেকী? তার আবার কী মতলব? সে কি খবর পেয়েছে নাকি নবাবের ব্যাপার?
জগৎশেঠজি বললেন–সে কী করে খবর পাবে? সে নিশ্চয় এসেছিল নিজের কোনও মতলব হাসিল করতে। এসে দেখে এই কাণ্ড!
ছোটমশাই বললে–আমার তো শুনে ভয় করছে জগৎশেঠজি! আমি তো হাতিয়াগড় একলা ছেড়ে এসেছি। সেখানে খাজাঞ্চিবাবুর হাতে সব ভার দিয়ে এখানে এসে ঘুরছি। আমার এত ঘোরাঘুরি দেখছি সব পণ্ডশ্রম হল। আপনিই আমাকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে পাঠিয়েছিলেন, আপনিই আমাকে ক্লাইভ সাহেবের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কোথায় সেই হাতিয়াগড় আর কোথায় সেই কলকাতা, আর কোথায় সেই কেষ্টনগর, আর কোথায়ই বা এই মুর্শিদাবাদ! এবার দেখছি আর বোধহয় কোনও আশা নেই। আপনি ঠিক ভাল রকম জানেন রেজা আলি এসেছে?
জগৎশেঠজি বললেন–শুধু এসেছে নয়, মেহেদি নেসারের সঙ্গে দেখাও করেছে
ছোটমশাই বড় ভাবনায় পড়ল।
বললে–আমি তা হলে এখন কী করব পরামর্শ দিতে পারেন? হাতিয়াগড়ে চলে যাব?
জগৎশেঠজি বললেন–আপনার স্ত্রীকে যখন ওরা মতিঝিলে আটকে রেখেছে দেখে এলেন তখন সেখানে গিয়েই বা কী করবেন? বরং তাকে ছাড়িয়ে নেবার কোনও ব্যবস্থা করা যায় কি না সেই চেষ্টাই দেখুন না
সে কী করে হবে?
জগৎশেঠজি বললেন–দেশে এখন যা অবস্থা তাতে সবকিছু টলমল করছে, এখন তো মুর্শিদাবাদের মসনদই থাকে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এই অবস্থাতে চেষ্টা করলে হয়তো কিছু সুরাহা হলেও হতে পারে
কী করব তাই বলুন?
জগৎশেঠজি বললেন–বহুদিন আগে আপনার সহধর্মিণী একবার আমার এখানে এসেছিলেন, সে তো আপনি জানেন আমাকে বলে গিয়েছিলেন যে, চকবাজারের খুশবু তেলের দোকানের মালিক সারাফত আলির বাড়িতে একটা লোক থাকে, তার নাম কান্ত, তার কাছে খবর দিলেই আপনার সহধর্মিণীর কাছে তা পৌঁছোবে–
