বললে–ঠিক আছে বাবাজি, তাই-ই ঠিক রইল, আমি ছোটমশাইয়ের ঘরের তালাটাও খুলে দিচ্ছি–
তা হলে আপনার কী হবে? আপনাকে যদি…
সচ্চরিত্র বললে–সে যা-হয় হবে বাবাজি! আমি ঈশ্বর ইন্দীবর ঘটকের পুত্র, ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র,এমনিতেই তো আমার পিতৃপুরুষ আমার হাতে জল পাচ্ছেন না, আমার আর কী ক্ষতি করবে ওরা? আমি যাচ্ছি
বলে সচ্চরিত্র অন্য দিকে চলে গেল।
কান্ত বললে–এবার তো আর তোমার কোনও আপত্তি নেই?
কিন্তু তুমি?
কান্ত বললে–আর তুমি আমার কথা ভেবো না। আমি পুরুষমানুষ, আমি যেমন করে হোক, এখান থেকে পালিয়ে যাবই। এখন যা অবস্থা, তাতে তোমাকে এ-অবস্থায় রেখে আমি কোথাও যেতে পারব না–
কিন্তু আমিই বা কোথায় যাব?
কান্ত বললে–কেন, আজকের জন্যে তুমি তো সারাফত আলির দোকানে গিয়ে থাকতে পারো। সেখানে বাদশা আছে, সে তোমাকে আমার ঘরে থাকতে দেবে। তুমি তো সে-দোকান চেনো, তুমি তো একদিন আমার খোঁজে সেখানে গিয়েছিলে। দোকানের পেছন দিকে গিয়ে বাদশা’ বলে ডাকলেই সে দরজা খুলে দেবে। তারপর যখন অবস্থা শান্ত হয়ে আসবে তখন আমিও এখান থেকে চলে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করব। ওই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ আছে, ও থাকতে কোনও ভয় নেই।
মরালী জিজ্ঞেস করলে কিন্তু কতদিন পরে তুমি আসবে?
বেশিদিন নয়। মেহেদি নেসার সাহেব বাইরে কোথাও চলে গেলেই আমি সেই সুযোগে এখান থেকে পালিয়ে যাব।
কিন্তু এখন চলে গেলে ক্ষতিটা কী? দুজনে একসঙ্গে গেলেই বা কে দেখছে?
না, তা হলে মেহেদি নেসার সাহেব যদি এখনই ফিরে এসে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে না দেখতে পায় তো সচ্চরিত্র পুরকায়স্থমশাইকে কোতল করবে। ও বেচারি না থাকলে তোমাকে আজ এমন করে বাঁচাতে পারতাম না, ছোটমশাইকেও ছাড়াতে পারা যেত না।
মরালী বললে–কিন্তু ছোটমশাইকে দেখতে না পেলে যদি পুরকায়স্থমশাইকে হেনস্থা করে?
না, অতটা করবে না, যতটা করবে মরিয়ম বেগমকে না দেখতে পেলে! আমি তো রইলুমই।
কিন্তু আমার যে বড় ভয় করছে। এতে তোমার কোনও ক্ষতি হবে না তো?
কান্ত বললে–কিন্তু আমার তো মনে তৃপ্তি হবে মরালী যে, তুমি নিরাপদে আছ। একবার এখান থেকে বেরিয়ে গেলে আর কখনও যেন মুর্শিদাবাদে এসো না। এ বড় খারাপ জায়গা। আমিও আর কখনও এখানে আসব না। তুমিও এসো না।
*
তারপর?
ঘসেটি বেগম সমস্ত কাহিনীটা এতক্ষণ শুনছিল। বললে–তারপর কী হল?
মরালী বললে–তারপর তাকে সেই মতিঝিলের ঘরের মধ্যে রেখে আমি তার জামাকাপড় পরে চলে এলাম। আমাকে এখন এখানেই থাকতে হবে যতদিন না ও আসে। রাস্তায় আসতে আসতে খুব ভয় করছিল। ভাবছিলাম কেউ ধরতে পারবে কিনা। কিন্তু কান্ত আমাকে সব বলে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছিল। আমার বুঝতে কোনও কষ্ট হয়নি। দেখলাম সবাই নিজামত নিয়ে ব্যস্ত, সবাই নবাব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। আমি বেটাছেলে বলে আমার দিকে কেউ বিশেষ নজর দিলে না। কিন্তু আপনাকে দেখে আমার কেমন সন্দেহ হল বেগমসাহেবা। আমি এতদিন চেহেল্-সুতুনে ছিলাম, আমি হাঁটা-চলা দেখে বুঝতে পারি কে বাঁদি কে বেগম। আপনি আমার চোখকে ঠকাতে পারেননি বেগমসাহেবা।
তা হলে এখন কী করবে?
মরালী বললে–আপনি এখানে থাকুন, আমি দেখে আসছি আপনার নজরকুলি খাঁ বাড়িতে এসেছে কি না–আপনি কারও সঙ্গে কিছু কথা বলবেন না। বোরখা পরে বসে থাকুন। বাদশা আমাকেও চিনতে পারেনি। আপনাকেও চিনতে পারবে না–
বলে আবার বাইরে এল। বুড়ো সারাফত আলি সাহেবের কাশির শব্দ পাওয়া গেল পাশের ঘরে। হয়তো ঘুম থেকে উঠেছে। ও নিশ্চয় সারাফত আলির গলা।
আবার কোথায় চললে কান্তবাবু?
বাদশা উনুনে কাঠ দিয়েছে। আগুন ধরাবে।
আমি এখুনি আসছি বাদশা। বাঁদিটা রইল, ওকে যেন বিরক্ত কোরো না তুমি, দেখো। আমি যাব আর আসব দরজাটা ভেজিয়ে দাও ।
বলে মরালী গায়ের চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে চকবাজারের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। নহবত-মঞ্জিল থেকে হঠাৎ আবার নহবতের সুর বেজে উঠতে সেই দিকেই চলতে লাগল। নহবত আবার বাজতে শুরু করল কেন?
মহিমাপুরের জগৎশেঠজির বাড়ির সামনে সেদিনও ভিখু শেখ পাহারা দিচ্ছিল। হঠাৎ একটা চেনা চেনা মুখ দেখে অবাক হয়ে গেল।
কে? কৌন?
পালকি নেই, তাঞ্জাম নেই, পোশাক-পরিচ্ছদের বাহারও নেই। কিন্তু তবু দেখে মনে হল রেইস আদমি। রেইস আদমিদের ওপর ভিখু শেখের টানটা বেশি!
লোকটা জিজ্ঞেস করলে শেঠজি হাবেলিমে হ্যায়?
জি হাঁ!
তারপর তড়িঘড়ি ভেতরে নিয়ে গেল। দেওয়ানজির সঙ্গে দেখা হল। দেওয়ানজি কিন্তু দেখেই চিনতে পারলে।
অবাক হয়ে বললে–ছোটমশাই আপনি?
ছোটমশাই বললে–আমি এখুনি মতিঝিল থেকে ছাড়া পেয়ে আসছি, শেঠজির সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। কিন্তু আমার স্ত্রীকে ওখানে এখনও আটক করে রেখেছে।
কে?
ওই, যাকে ওরা মরিয়ম বেগম বলে। আমাদের দুজনকেই একসঙ্গে মেহেদি নেসার ধরেছিল, কিন্তু আমি ছাড়া পেয়ে চলে এসেছি। এখন জগৎশেঠজির সঙ্গে দেখা করে এর বিহিত করতে চাই।
দেওয়ানজি বললে–আপনি বসুন, আমি জগৎশেঠজিকে খবর পাঠাচ্ছি। বলে বাইরে চলে গেল।
*
রণজিৎ রায় মশাই জগৎশেঠজির ডান হাত। নবাবের সঙ্গে যখনই তার বিরোধ বেধেছে তখনই পরামর্শ দিয়েছে রণজিৎ রায়। কলকাতায় যখন প্রথমবার যুদ্ধ বেধেছিল তখনও দেওয়ান রণজিৎ রায় মশাই। গিয়েই সব মিটমাট করে দিয়েছিল।
