নবাব লড়াই থেকে ফিরে এলে কি নহবত থেমে যায়? যা, বাজাতে বল গে যা-যা
ছোটে শাগরেদ তখন ইনসাফ মিঞার সামনে বসেনীচের রাস্তার দিকে চেয়ে দেখছে। এ কি তাজ্জব ব্যাপার ঘটছে তার চোখের সামনে। মুর্শিদাবাদে তো এমন ঘটনা ঘটেনি কখনও আগে। সমস্ত কিছু ওলোটপালোট হয়ে যাবে নাকি। একটু আগেই নানিবেগমসাহেবার তাঞ্জাম বেরোল চেহেল্-সুতুনের ফটক থেকে, আবার খানিক পরেই চেহেল্-সুতুনে ফিরে এল।
কী হবে চাচা?
বুড়ো ইনসাফ মিঞাও হতবাক হয়ে গেছে। এমন করে কখনও তাকে সুরের মুখ চাপা দিতে হয়নি।
হঠাৎ বরকত আলি সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে ওপরে উঠে এসেছে।
কী হল মিঞাসাহেব, নহবত থামল কেন? বাজাও বাজাও
দু’জনেই অবাক হয়ে গেছে বরকত আলিকে দেখে। বরকত আগে কখনও নহবত-মঞ্জিলে এসে এমন করে হুকুম করেনি তাদের।
কী হল বরকত?
নানিবেগমসাহেবা জিজ্ঞেস করছে, নহবত থামল কেন? বাজাতে বলছে।
তা শুনলাম নাকি নবাব লড়াইতে হেরে ফিরে এসেছে?
বরকত আলি রেগে গেল।
দুর মিঞাসাহেব, নবাব কখনও লড়াইতে হারতে পারে? লড়াই চলছে লক্কাবাগে, ফিরিঙ্গি হারামদের সাধ্যি কি নবাবকে হারায় বাজাও, তোমরা বাজাও
বাজাব?
হ্যাঁ, বাজাবেনা তো কি চুপ করে বসে থাকবে? দেখছ না নহবত বন্ধ হয়েছে, রাস্তায় ভিড় জমছে, হল্লা হচ্ছে?
তাই তো বটে। ইনসাফ মিঞা বুড়ো হয়ে গিয়েছিল। হয়তো নতুন জমানার কানুন বুঝতে পারেনি। জমানা বদলে যাচ্ছে। নবাব আলিবর্দি খা’র জমানার কানুন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার জমানায় চলবে কেন? তাই তো বটে।
বরকত আলি আবার তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল।
এবার ইনসাফ মিঞা ধরলে–জয়জয়ন্তী
ছোটে শাগরেদ সুরটা শুনেই তবলায় জোরসে চাটি মারলে কেয়াবাত–কেয়াবাত—
*
এমন যে হবে মরিয়ম বেগমও তা বুঝতে পারেনি। কোথায় ত্রিবেণীর ঘাট, সেখান থেকে মোল্লাহাটি। মোল্লাহাটিতেই যদি পালাতে পারত তা হলে আর ধরা পড়ত না মেহেদি নেসারের হাতে। সেখান থেকে সোজা আবার এই মতিঝিলে।
তারপর?
তারপরের কথা ভাবতে গিয়ে ঘরখানার চারদিকে একবার চেয়ে দেখছিল। এ-ঘরটায় কখনও আগে ঢকেনি মরালী। চারদিক ইট দিয়ে, পাথর দিয়ে শক্ত করে গাঁথা। তখন বুঝতেই পারেনি যে, এখান থেকে আবার বেরোতে পারবে কোনওদিন।
বাইরে সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাইকে দেখে শুধু চিৎকার করে উঠেছিল। বলেছিল নানিবেগমসাহেবাকে একবার খবরটা দিন ঘটকমশাই
কিন্তু তারপর অনেকক্ষণ কেটে গিয়েছিল। কেউ-ই আসে না।
হঠাৎ যখন দরজা খুলল, তখন দেখে অবাক হয়ে গেল। নানিবেগম নয়–কান্ত। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই।
একী, তুমি?
কান্ত চাপা গলায় বললেমরালী শিগগির করো, আর সময় নেই, কেউ এসে পড়বে, তুমি এখান থেকে পালাও–
পালাব?
মরালীর যেন তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না।
কী করে দরজা খুললে?
সচ্চরিত্র বলে–আমি খুলেছি মা, আমার কাছে নেয়ামত সব ঘরের চাবি দিয়ে গিয়েছিল।
কান্ত বললে–তুমি আর আপত্তি কোরো না মরালী
কিন্তু মেহেদি নেসার কোথায়? বশির মিঞা কোথায়?
তারা এখন অন্য দিকে চলে গেছে। নানিবেগম এসেছিল এখানে, মেহেদি নেসারও এসেছিল, তোমাকে ছেড়ে দেবার জন্য নানিবেগমসাহেবা মেহেদি নেসারকে হুকুম করেছিল। কিন্তু হঠাৎ নবাব এসে পড়ার খবর পেয়ে দু’জনেই চলে গেছে
নবাব? নবাব কোথা থেকে এল?
হ্যাঁ, শুনছি তো নবাব এসেছে। তাই বাইরের রাস্তায় অত হইচই হল্লা হচ্ছে। এখনই হয়তো নবাব মতিঝিলে এসে পড়বে, তার আগেই তুমি চলে যাও।
আর তুমি? তোমাকে ছেড়ে দিলে কেন ওরা?
আমাকে ছাড়েনি মরালী, আমি টাকা দিয়ে তোমাকে ছাড়াবার জন্য সারাফত আলির দোকানে গিয়েছিলাম, এদিকে রাস্তার হল্লা শুনে বশির মি অন্য ধান্দায় চলে গেছে। বোধহয় নিজামত এবার উলটে যাবে।
তার মানে?
তার মানে আমি জানি না। চারদিকে ব্যাপার দেখে খুব ভয় হচ্ছে। কিন্তু ওসব কথা ভাববার আর সময় নেই এখন। এমন সুযোগ আর আসবে না। শুনছ মহবত-মঞ্জিলে বাজনা থেমে গেছে?
কিন্তু আমি পালাব কী করে? কেউ পাহারাদার নেই এখানে?
পাহারাদাররা আছে, কিন্তু এই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাইকে ওরা সবাই খুব বিশ্বাস করে। উনি এখন ইব্রাহিম খাঁ। তোমাকে ওঁর হেপাজতে রেখেই ওরা চলে গেছে
কিন্তু ছোটমশাইয়ের খবর কী?
ছোটমশাইও এখানেই আছেন।
তা হলে তাঁকে আগে ছেড়ে দাও
তাঁকেও ছেড়ে দেব, কিন্তু তুমি আগে এসো।
তা হতে পারে না। তিনি এখানে থাকলে আমি ছাড়া পেয়ে কোনও লাভ নেই। আর তা হলে ছোট বউরানির জন্যে আমি কেন এত কিছু করতে গেলুম?
কান্ত সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর মুখের দিকে চাইলে।
আপনি ছোটমশাইকে ছাড়তে পারবেন পুরকায়স্থমশাই?
কিছুক্ষণ ভাবতে লাগল পুরকায়স্থ মশাই। এই চাকরি, এই ধর্মান্তর, এই অবমাননা, এই দুর্যোগ, সমস্ত কিছু মাথার ওপর চেপে বসল। থরথর করে কাঁপতে লাগল বুড়ো মানুষটা। সবই তো ছাড়তে। হয়েছে জীবনে। যারা তার আপনজন ছিল, তারাও পর হয়ে গেছে। শেষে যেটা আছে, সেটা তার পেট। সেই পোড়া পেটটা নিয়েই এতদিন এখানে সরাবখানার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সেটাও যদি খোয়াতে হয়, তা হলে কোথায় মাথা গোঁজবার একটা ছাদ আর দুমুঠো অন্ন সে পাবে?
কিন্তু হঠাৎ যেন সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর শরীরে যৌবনের শক্তি ফিরে এল। এত দিনের সব অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্তের কথাটাও মনে এল।
