নবাব মির্জা মহম্মদ তখন চেহেল্-সুতুনের ভেতরে ঢুকেছে। চেনা জায়গা। ছোটবেলা থেকে এই চেহেলসুতুনেই বড় হয়েছে মির্জা মহম্মদ। সবাই সেখানে তখন অসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছ। হাতের কাছে হুকুম করবার মতো কেউ নেই। নেয়ামত রয়ে গেছে সেই লক্কাবাগে। নবাবের জীবনের শেষ মর্যাদাটুকু সেই লঙ্কাবাগেই ফেলে রেখে আসতে হয়েছে হঠাৎ।
আর নেয়ামতকে কিছু বলবার সময়ও তখন ছিল না। যে-লোক জীবনে তিনবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল তার সঙ্গে লড়াই করবার আগে তিনবার ভাবা উচিত ছিল। ইয়ারজান বলেছিল–ক্লাইভ তিন-তিনবার নিজের হাতে নিজের জান নিতে গিয়েছিল।
উটটার পিঠ থেকে নবাব নেমে পড়ল। উটটারও কি কম হয়রানি হয়েছে। সেই লঙ্কাবাগ থেকে ছুটতে ছুটতে এসে শুধু একবার দম নিয়েছিল দাউদপুরে।
ভয় ছিল হয়তো ফিরিঙ্গি ফৌজ নবাবের পেছু নেবে।
মরিয়ম বেগমসাহেবা!
সেদিন নবাবের, কেন কে জানে, যেন মনে হয়েছিল সেই বিপদের দিনে এক মরিয়ম বেগম ছাড়া আর তার কেউ নেই। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে গেল, মরিয়ম বেগমসাহেবা তো চেহেল্ সুতুনে নেই। ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে যাবার সময়ই কানে এসেছিল কথাটা। কেউ বলেছিল মরিয়ম বেগমসাহেবা পালিয়েছে, কেউ বলেছিল ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে হাত মিলোতে গেছে কলকাতায়। সেদিন বিশ্বাস হয়নি নবাবের।
তবু একটা দরজার সামনে ঘা দিতে দিতে নবাব ডাকতে লাগল-মরিয়ম বেগমসাহেবা! মরিয়ম বেগমসাহেবা!
নজর মহম্মদ নবাবকে সামনে দেখে অবাক হয়ে গেছে।
খোদাবন্দ!
মরিয়ম বেগমসাহেবার মহল কোথায় রে? কোন দিকে?
মরিয়ম বেগমসাহেবা তো মহলে নেই জাঁহাপনা।
নেই? এখনও ফিরে তাসেনি? এত দেরি করছে কেন ফিরতে? কোথায় গেল তোরা খবর রাখিস না কেন?
কিন্তু কথা বলতে বলতে হঠাৎ যেন খেয়াল হল নবাবের। খেয়াল হল যে, আজ আর তার কেউ নেই। এতদিন চেহেল্-সুতুনের ভেতরে প্রত্যেকটি বেগম ছিল নবাবের নিজের সম্পত্তি। পুরুষানুক্রমে যে-সম্পত্তি জমা হয়ে হয়ে চেহেল সুতুনের পাথরগুলো পর্যন্ত ভারী হয়ে উঠেছিল, আজ সব ফাঁকা। কেউ নেই তার।
নজর মহম্মদ!
কোনও উত্তর নেই।
আবার ডাকলে নবাব পিরালি খাঁ, বরকত আলি, নজর মহম্মদ
সমস্ত চেহেল-সুতুন যেন সেই চিৎকারে গমগম থমথম করে উঠল। যেন হঠাৎ মুর্শিদাবাদ মসনদের সমস্ত বেহেস্তে যাওয়া নবাবের প্রেতাত্মা একসঙ্গে সাড়া দিয়ে উঠল–খোদাবন্দ!
সাতাশ বছর বয়েসের নবাব চারদিকে চাইতে লাগল হতবাক হয়ে। কে সাড়া দিলে? কে জবাব দিলে? কে? কারা ওরা? কোথায় ওরা?
তারপর মনে পড়ল নানিসাহেবার কথা। দৌড়ে গেল নানিবেগমসাহেবার মহলের দিকে। এ সময়ে নানিবেগমসাহেবা জুম্মা মসজিদে নমাজ পড়তে যায়। তবু নানিবেগমসাহেবার মহলের সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগল-নানিবেগমসাহেবা, নানিবেগমসাহেবা..
ঘুঙুরের শব্দ করতে করতে কে যেন সামনে এসে দাঁড়াল। এসে নবাবকে দেখেই ভয়ে চমকে উঠেছে। তারপর কাঁপতে কাঁপতে বললে–নানিবেগমসাহেবা মতিঝিলে গেছে আলি জাঁহা
মতিঝিলে? কেন?
তা মালুম নেই আলি জাঁহা।
সত্যিই নবাবের যেন বিশ্বাস পাকা হল যে, তার কেউ নেই। আমি অত্যাচার করেছি নানিবেগমসাহেবা, আমি পাপ করেছি। মরিয়ম বেগমসাহেবা, তোমাকেও জানিয়ে রাখি, আমি অন্যায় করেছি। এ-খবর তোমাদের কাছেনতুন নয়, কিন্তু আজ নতুন করে আবার তোমাদের জানিয়ে রাখলুম। আমি চলে যাবার পর তোমরা দুনিয়াকে জানিয়ে দিয়ে, আমি লম্পট, জানিয়ে দিয়ে, আমি পাপী, প্রচার করে দিয়ে আমি স্বার্থপর নীচ চরিত্রহীন! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তোমরা একথাও প্রচার করে দিয়ে যে, আমি অনুতাপ করেছি। আমি বিশ্বাস করেও অনুতাপ করেছি অবিশ্বাস করেও অনুতাপ করেছি। ভালবেসেও অনুতাপ করেছি, ঘৃণা করেও অনুতাপ করেছি। অনুতারে যদি কিছু সুফল থাকে, সেটুকু যেন আমার প্রাপ্য থাকে। তার বেশি কিছু আমি চাই না।
হঠাৎ সামনে যেন কার তাঞ্জাম এসে থামল।
নানিজি!
মির্জা।
মির্জা মহম্মদ দুই হাতে নানিবেগমসাহেবাকে একেবারে জড়িয়ে ধরেছে। নানিবেগমসাহেবার দুই চোখ জলে ভরে এল।
বললে–কী হল রে মির্জা? এমন করছিস কেন?
নানিজি, আমি লড়াইতে হেরে গিয়ে ফিরে এসেছি।
নানিবেগম বললে–তাতে কী হয়েছে মির্জা, তোর নানা অনেকবার এমন করে হেরে গেছে, তুই অভ কাঁপছিস কেন?
মির্জা বললে–আমি যদি সহজে হেরে যেতুম, তা হলে তো আমার দুঃখ থাকত না নানিজি, আমাকে যে আমার মিরবকশিরা হারিয়ে দিলে। আমি যে তাদের বিশ্বাস করেছিলুম খুব। এখন কী হবে নানিজি!
নানিবেগম বললে–কোন মিরবকশি? কোন মিরবকশি তোকে হারালে?-
-মির্জা বললে–মিরজাফর আলি।
কিন্তু কোথায় হারালে? কী করে হারালে?
সব কথা বুঝিয়ে বলবার এখন সময় নেই নানিজি। এরই মধ্যে আমাকে যা-তোক কিছু ব্যবস্থা করতেই হবে। নইলে তোমার চেহেল্-সুতুন বাঁচবে না, আমি বাঁচব না, তুমি বাঁচবে না। আমরা কেউ বাঁচব না নানিজি। মুর্শিদাবাদের মসনদ পর্যন্ত চলে যাবে!
কে বললে–মসনদ চলে যাবে?
বলে নানিবেগমসাহেবা নিজেকে মির্জার হাতে থেকে ছাড়িয়ে নিলে। তারপর বললে–পিরালি
গিরালি আর বরকত আলি পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সামনে এসে দাঁড়াল। বললেনহবত-মঞ্জিলে নহবত থামালে কেন ইনসাফ মিঞা?
এতক্ষণে যেন সকলের খেয়াল হল। সত্যিই তো নহবত তো বাজছে না আর!
