আমার কথাও আপনি কাউকে বলবেন না। আমার নাম মরিয়ম বেগম।
বলে গায়ের জড়ানো উড়ুনিটা খুলে ফেললে। তারপর আবার সেটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বললে–আমাকে এরা এখানে কান্ত বলে সবাই ডাকবে, আপনি যেন কাউকে বলে দেবেন না।
*
২৪ জুন ১৭৫৭ সালের সে ইতিহাস বাংলা মুলুকের এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণের ইতিহাস। ইতিহাস বটে, কিন্তু লজ্জার অগৌরবের আর পরাজয়ের ইতিহাস। সেই দিনটার জন্যে সেদিন বাংলার মসনদে কোনও নবাব ছিল না। নবাব থাকলেও সেনবাবের কোনও মর্যাদা ছিল না, সে নবাবের কোনও অস্তিত্ব ছিল না, সে নবাবের কোনও অধিকারও ছিল না। ঠিক সেই দিনই মেহেদি নেসার সাহেব এসে পৌঁছেছিল তার নিজামতি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই হিরণ্যনারায়ণেরও ড়ান্ত অসম্মান ঘটেছিল সেই দিনটিতেই। মরিয়ম বেগমসাহেবা ঠিক সেই দিনই মতিঝিলের কারাকক্ষের ভেতরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। আর ঘসেটি বেগম সেই দিনই চেহেল সুতুনের হারেম থেকে বাঁদির পোশাক পরে চকবাজারের রাস্তায় পায়ে হেঁটে বেরিয়েছিল।
আর ঠিক সেই দিনই বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজউদ্দৌলা হেবাৎ জঙ শা কুলি খান আলমগিরও হঠাৎ একলা একটা উটের পিঠে এসে দাঁড়িয়েছিল চেহেলসূতুনের ফটকে।
এই ফটক দিয়েই মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে সুজাউদ্দিন, সরফরাজ খাঁ, আলিবর্দি খাঁ সবাই একদিন ভেতরে ঢুকেছে কিংবা হয়তো বাইরে বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু তার আগে আগে চলেছে হাতি, উট, তাঞ্জাম, পালকি, ঘোড়া। নবাবি কেতাদুরস্তে বরাবর নবাবের আগে পিছে ওদের আগমন নির্গমন অপরিহার্য ছিল। কানুনের এতটুকু হেরফের হলে পাহারাদার কি খিদমদগারের কোতল হয়েছে। কিন্তু সেদিন কিছুই হল না।
কৌন হে তুম?
পাহারাদারই বা যাকে তাকে চেহেসূতুনের ভেতরে ঢুকতে দেবে কেন? তুমি কে? তোমার পাঞ্জা আছে কিনা দেখাও, আগে নিজের নামধাম কুলুজি পেশ করো, তবে তো ভাবব ভেতরে যাবার এক্তিয়ার তোমার আছে কিনা
সে বেচারিরও দোষ নেই সত্যি! তখন সারা মুর্শিদাবাদ ঝিম হয়ে ঘুমোচ্ছ নেশার ঘোরে। সারাফত আলির আরকের নেশা। সে-নেশা বড় সাংঘাতিক। একবার সে-নেশা করলে রাজ্য রাজা-বিষয়-ক্ষোভকামনা সবকিছু একাকার হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় যেন ছায়ার মতো কে
এল ফটকের সামনে। একটা উটের পিঠের ওপর কে যেন বসে ছিল, সেটাও নজরে পড়েছিল। কিন্তু সে মানুষটা যে কে তা সেই আবছা অন্ধকারে আর ভাল করে দেখতে পায়নি। শুধু অভ্যেসের তাগিদে হাঁক দিয়েছিল
কৌন হো তুম?
আর সঙ্গে সঙ্গে খাড়া মাথাটা গলা থেকে খসে যাবার মতো হয়েছিল তার। মনে হয়েছিল সে যেন যমদূতকে সামনে দেখল।
কিন্তু সামলে নেবার আগেই লম্বা উঁচু উটটা একেবারে সড়সড় করে ভেতরে ঢুকে গেছে। তখন খেয়াল হয়েছে এ তো জাঁহাপনা!
আর দৌড়ে গিয়ে খবরটা দিয়েছে পরের ফটকের চৌকিদারকে। সেও তাজ্জব হয়ে গেছে। তারপর এক কান থেকে আর এক কানে যেতে যেতে নহবত-মঞ্জিলের ইনসাফ মিঞার কানে গিয়েও উঠল। তখন ইনসাফ মি টোড়ির কোমল রেখাবটা নিয়ে কায়দা করতে গিয়ে হয়রান হয়ে যাচ্ছে, এমন সময় ছোটে শাগরেদ বললে–উস্তাদজি,নবাব ফিরে এসেছে
নবাব?
ইনসাফ মিঞা দিনরাত সুর নিয়ে মেতে থাকলে কী হয়, নবাবের খবর তাকেও রাখতে হয়। নবাব কোথায় আছে, কী করছে সব খবর আরসকলের মতো ইনসাফ মিঞাও রাখে। সবাই জানত নবাব লাবাগে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে গেছে। কিন্তু ফিরে এল কেন? লড়াই ফতেহ হয়ে গেছে?
না চাচা, নবাব একলা ফিরে এসেছে
সঙ্গে ফৌজ নেই?
তাই তো বটে! তখন ইনসাফ মিঞার খেয়াল হল। এমন তো কানুন নয়। নবাব আলিবর্দি খাঁ যখন উড়িষ্যা থেকে পূর্ণিয়া থেকে নানা দিক থেকে লড়াই ফতেহ করে ফিরে আসত তখনকার কথা তো ইনসাফ মিঞার মনে আছে। ছোটে শাগরেদদেরও ইয়াদ আছে। এই নবাবও যখন পূর্ণিয়া থেকে নিজের ভাই শওকত জঙকে হারিয়ে রাজধানীতে ফিরে এসেছিল তখন অন্য রকম। তবে কি টোড়ি রাগ বন্ধ করবে?
জয়জয়ন্তী বাজাব?
না উস্তাদজি, ব্যাপার গড়বড় মালুম হচ্ছে
কীসের গড়বড়? নবাব হেরে পালিয়ে এসেছে
দাঁড়াও উস্তাদজি, আসলি খবর মালুম করে আসছি।
ইনসাফ মিঞা নহত বাজানো বন্ধ করে দিলে। ছোটে শাগরেদ নহবত-মঞ্জিলের পাথরের সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নীচেয় নেমে এল। নীচে নেমে দেখলে চেহেল্-সুতুনের ছোট ফটক ফাঁকা। তারপর বড় ফটকে এল। সেখানেও পাহারাদার নেই। এদিক-ওদিক চারদিক দেখতে লাগল। মশালচিরা ঘুমোয় পাশেই, সেখানে গেল। সেখানেও কেউ নেই। বড় তাজ্জব ব্যাপার তো! সবাই কি রাতারাতি নিজামতের চাকরি ছেড়ে দিলে! তারপর বাইরে থেকে হল্লা কানে এল। রাস্তায় যেন ভিড় জমছে মানুষের। কীসের ভিড়? কেন এত ভিড়?
তারপর দেখা হয়ে গেল খোজা সর্দার পিরালি খাঁ’র সঙ্গে। পিরালি খাঁ হন্তদন্ত হয়ে দৌড়োচ্ছে বাইরের ফটকের দিকে।
ছেটে শাগরেদ পেছন পেছন দৌড়ে গেল।কী হয়েছে পিরালি খাঁ সাহেব?নবাব ফিরে এসেছে?
তখন আর পিরালির কথা বলবার সময় নেই। বললো হ্যাঁ
কোথায় যাচ্ছ তুমি খাঁসাহেব?
মতিঝিলে। নানিবেগমসাহেবাকে ডাকতে।
নবাব কি লড়াইতে হেরে ফিরে এসেছে খাঁসাহেব?
কিন্তু সে কথার উত্তর আর দিলে না পিরালি খাঁ। না দিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল। মেই আবছা অন্ধকারের মধ্যেই ছোটে শাগরেদ হতভম্বের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে আবার নহবত-মঞ্জিলের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
