কিন্তু জীবনে কখনও পায়ে হেঁটে যে বাইরে বেরোয়নি, তার কি অত জোরে পা চালানো পোষায়!
পেছন থেকে কারা যেন শিস দিয়ে উঠল।
ঘসেটি বেগম আরও ভয় পেয়ে গেছে।
ওরে ইয়ার, চেহেলসতুনের গেম রে, পায়দলে চলেছে!
দুর ইয়ার, বেগম নয় রে, বাদি ও
কোনওরকমে তাদের এড়ানো গেল, কোনওরকমে আর কিছু দূর গেলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। তোমার সব পাত্তা আমাকে আমার বাদি দিয়েছে, নজরকুলি খাঁ। আমি শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছ। তুমি খুব তকলিফে আছ। কিন্তু আমি কী করব বলো? আমাকে যে এতদিন নজরবন্দি করে রেখেছিল ওই শয়তানটা। আমি কেমন করে তোমার সঙ্গে দেখা করব বলো?
আজ আমি স্বাধীন, নজরকুলি খাঁ। আমি আমার যা কিছু আছে সব এনেছি সঙ্গে করে। আমার যে গয়না আছে সঙ্গে, তারই দাম নি লাখ টাকা। এই তিন লাখ টাকা দিয়ে তুমি ফৌজ বানাও নজরকুলি খাঁ। নবাব এখন ফতুর হয়ে গেছে। নবাবের এখন ফৌজ নেই, টাকা নেই, মোহর নেই, আমির নেই। এই সময়েই তুমি চেহেলসূতুনে হামলা করে। তারপর যেমন করে মির্জা মহম্মদ হোসেনকুলি খাঁ-কে খুন করেছে, তেমনি করে তুমি সেই খুনের বদলা নাও নজর কুলি খাঁ
ঘসেটি বেগম বোরখার ভেতরে জেবরের পুঁটলিটা ভাল করে আঁকড়ে ধরল।
কৌন হো তুম?
ঘসেটি বেগম একেবারে সামনাসামনি পড়ে গেছে একজনের। তাড়াতাড়ি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু লোকটা সামনে পথ আটকে দাঁড়াল।
বললে–কোনও ডর নেই, বলো তুমি কে?
ঘসেটি বেগম বললে–আমি ঘসেটি বেগমের বাঁদি—
নাম কী?
রাবেয়া।
বোরখার ভেতর মুখের চেহারা দেখা যায় না। তবু যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ভেতরটা দেখবার চেষ্টা করলে লোকটা।
তারপর বললে–কোথায় যাচ্ছ তুমি এখন?
ঘসেটি বেগম কী বলবে বুঝতে পারলে না। অথচ জবাব না দিলেও রেহাই নেই লোকটার হাত থেকে।
বলো, কোথায় যাচ্ছ তুমি এখন?
নজরকুলি খাঁ’র হাবেলিতে!
নজরকুলি খাঁ’র হাবেলি কোথায়? সে তো ঝুপড়ি! সে তোমার কে হয়?
আমার ভাই!
সেখানে এখন যাচ্ছ কেন?
ঘসেটি বেগমের ইচ্ছে হল লোকটার গালে এক চড় কষিয়ে দেয়। কিন্তু ধরা পড়ে যাবার ভয়ে চুপ করে রইল।
বলল, এখন সেখানে যাচ্ছ কেন?
ঘসেটি বেগম বললে–চেহেল্-সুতুন থেকে পালিয়ে এসেছি, সেখানে গোলমাল বেধেছে।
লোকটা যেন একটু চুপ করে রইল।
তারপর বললে–নজরকুলি খাঁর বাড়ির রাস্তা তুমি চিনতে পারোনি, রাস্তা ভুল করেছ, তুমি আমার সঙ্গে এসো
ঘসেটি বেগম তখনও নড়ে না দেখে লোকটা ধমক দিয়ে উঠল। বললে–এসো
ঘসেটি বেগম কোনও উপায় না দেখে লোকটার সঙ্গে চলতে লাগল। আশেপাশে সবাই তাদের দিকে চেয়ে দেখছে। ভালই হল, এবার আর কেউ তাকে বিরক্ত করবেনা। লোকটা তাকে ঠিক রাস্তায় পৌঁছে দেবে।
তুমি আগে কখনও নজরকুলি খাঁ’র বাড়িতে গিয়েছিলে?
ঘসেটি বেগম বললে–না
তবে? তুমি তো মহিমাপুরের দিকে যাচ্ছিলে। ওটা তো মতিঝিলের রাস্তা। আর নজরকুলি খাঁ তো থাকে চকবাজারের রাস্তায় এসো আমি তোমাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছিয়ে দিচ্ছি
ঘসেটি বেগম আর কোনও কথা না বলে লোকটার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল।
কিন্তু নজরকুলি খাঁ’র বাড়ির সামনে অনেক ডাকাডাকি করেও তাকে পাওয়া গেল না। একটা চাকর বাইরে বেরিয়ে এসে বললে–খাঁ সাহেব কাল রাতে বেরিয়েছে, এখনও বাড়ি ফেরেনি!
কখন ফিরবে?
তার কোনও ঠিক নেই বাবুজি! না-ও ফিরতে পারে।
ঘসেটি বেগম কেমন হতাশ হয়ে গেল। এত দূর এসে এত কাণ্ড করেও দেখা হল না। কিন্তু সময়ও যে আর হাতে নেই। যা কিছু করতে হবে সব যে এখনই করতে হবে। আর দেরি করা চলবে না যে! নবাবি ফৌজ ফিরে আসবার আগেই যে সব খতম করে ফেলতে হবে।
এখন কোথায় যাবে? চেহেলসূতুনে ফিরে যাবে?
ঘসেটি বেগম বললে–না–নজরকুলি খাঁ ফিরে এলে আমি আবার তার সঙ্গে দেখা করতে যাব
কিন্তু ততক্ষণ কোথায় থাকবে? আমার খুলিতে চলল
বলে আর সম্মতির অপেক্ষা না করে সোজা সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের পেছন দিকে গিয়ে ডাকলে–বাদশা
বাদশা দরজা খুলে অবাক হয়ে গেছে কান্তবাবুকে দেখে। বললে–কান্তবাবুজি, আপনি? সঙ্গে
এ চেহেল্-সুতুনের এক বাঁদি, ভাইয়ের কোঠিতে যাচ্ছিল, রাস্তা ভুল হয়ে গেছে তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি এখানে থাকবে।
বাদশা সামনে গিয়ে কান্তর ঘরের দরজাটা খুলে দিলে। দিয়ে বাইরে চলে গেল। ঘসেটি বেগম তখন ভেতরে ভেতরে থরথর করে ভয়ে কাঁপছে।
কান্ত চারদিকে চেয়ে দেখলে। কেউ কোথাও নেই।
বললে–এবার বলো তুমি কে?
আমি তো বলেছি আমি রাবেয়া।
কান্ত বললে–সে তো বুঝলাম, এখন সত্যি কথাটা বলো তো
বলে আর দেরি না করে খপ করে বোরখার মুখটা খুলে দিয়েছে। দিতেই দুই হাতে মুখ ঢাকা দিয়েছে ঘসেটি বেগমসাহেবা।
কিন্তু তার আগেই কান্ত স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে মুখখানা!
তুমি তো রাবেয়া নও, বলো তুমি কে?
ঘসেটি বেগম তখন আর্তনাদ করে উঠতে যাচ্ছিল–না-না-না
চেঁচিয়ো না, সব জানাজানি হয়ে যাবে। বলো কে তুমি?
ঘসেটি বেগম তখনও মুখ ঢেকে আছে। বললে–কাউকে বোলো না তুমি, আমি ঘসেটি বেগম।
ঘসেটি বেগম। এতদিন যার নাম শুনে এসেছে।
তারপর আস্তে আস্তে নিজের মাথায় হাত ঠেকিয়ে বললে–কিছু ভাববেন না, আমি কাউকে বলব না। আমি নিজেও চেহেলসুতুন থেকে পালিয়ে এসেছি।
ঘসেটি বেগম হঠাৎ এতক্ষণে মুখটা তুলে সোজা লোকটার মুখের দিকে তাকাল। দেখতে দেখতে কেমন সন্দেহ হল। কললেচেহ্নেতুন থেকে পালিয়ে এসেছ? কে তুমি?
