রাবেয়া নিজের পোশাকটা খুলে দিলে ছোটি বেগমকে।
বহুদিন আগে একদিন ঘসেটি বেগম মনে মনে একটা ক্ষীণ আশা পোষণ করেছিল যে, একদিন বড় হয়ে তারই ছেলে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসবে। ঘসেটি বেগম সেই ছেলের আড়ালে বসে এই বাংলা বিহার-উড়িষ্যা মুলুকের মালকিন হবে। কিন্তু সেছেলে চলে গিয়েছিল। তারপর কোলে টেনে নিয়েছিল। আমিনার ছেলেকে। সে এক্ৰামুদ্দৌলা। সেও একদিন মারা গেল। তার এগারো বছর বয়সেই ঘসেটি বেগমের সব আশা চুরমার করে দিয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু এবার? এবার কেমন করে আমাকে ঠেকাবে তুমি মির্জা মহম্মদ?
আপনি এখন কোথায় যাবেন ছোটি বেগম?
তোর কোনও ভয় নেই রাবেয়া। আমি ফিরে আসব। মুর্শিদাবাদের মসনদ এই আমিই নেব।
কিন্তু যাবেন কোথায়?
তুই কাউকে বলবি না বল?
না, কাউকে বলব না ছোটি বেগম। আমি শুধু জেনে রাখব
ঘসেটি বেগমের তখন সাজ-পোশাক বদলানো হয়ে গেছে। বললে–যাব নজরকুলি খাঁ’র কাছে–
নজরকুলি খাঁ?
রাবেয়া জানত নজরকুলি খাঁর কথা। একদিন সেই নজরকুলি খাঁই কত টাকা কত মোহর ঠকিয়ে নিয়েছে ছোটি বেগমের কাছ থেকে। যেদিন নবাব মতিঝিলে হামলা করে ঘসেটি বেগমকে বন্দি করে নিয়ে চেহেল্-সুতুনে পোরে, সেদিন সেই নজরকুলি খাঁ-ই ঘসেটি বেগমের মোহর-হিরে-জহরত সোনা-চাদি ফৌজের সেপাইদের হাত করবে বলে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, আর আসেনি। আজ এতদিন পরে সেই নজর কুলি খাঁ’র কাছে যাবে ছোটি বেগম?
তুই একবার বাইরে গিয়ে দেখে আয় তো রাবেয়া, সামনে কেউ আছে কিনা
রাবেয়া মহলটার ফটকে গিয়ে উঁকি মেরে চারদিকে দেখলে। চেহেল্-সুতুনের ভেতরে কারা যেন। কথা বলছে। কারা যেন ত্রস্ত পায়ে এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। সব ওলোটপালোট, সব বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে চারদিকে। ইনসাফ মিঞা নহবত বাজাতে বাজাতে হঠাৎ থামিয়ে দিয়েছে টোড়ি রাগের আলাপ। আবছা আবছা আলো-অন্ধকারের মধ্যে চেহেল্-সুতুনের চেহারাটা যেন আমূল বদলে গেছে। ভোরবেলায় চেহেল্-সুতুনের কোনও স্পন্দন এমনিতেই থাকে না। এমনিতেই সবাই ঘুম থেকে দেরি করে ওঠে। তারই মধ্যে আজ প্রথম ব্যতিক্রম হয়েছে।
ঘসেটি বেগম নিঃশব্দে পা বাড়াল।
অন্যদিন পাহারাদার মোতায়েন থাকে মহলের ফটকে। কড়া নজর রাখে ঘসেটি বেগমের মহলের ওপর। আজ ফাঁকা রয়েছে সব। কেউ নেই কোথাও। দূরে কোথাও কারও পায়ের শব্দ হল যেন। ঘসেটি বেগম বাদির বোরখা পরেছে, কারও চিনতে পারার কথা নয়। তবু ভয়ে ভয়ে এগোতে হয়। অথচ আবিদি খা’র সময়ে এই চেহেল্-সুতুনের মধ্যেই কত প্রতাপ ছিল তার, কত দাপট। নবাবের বড় মেয়ে, কোনওদিন কোনও জিনিস মুখ ফুটে চাইতে হয়নি। না-চাইতে পাওয়াটাই সেই বড় মেয়ের নিয়ম। শুধু যে-একটা জিনিস মন-প্রাণ দিয়ে চেয়েছিল সেইটেই এখনও পাওয়া বাকি রয়েছে। সে এই মসনদ।
কে? কৌন?
আগে হলে এক ধমক দিত চেহেল্-সুতুনের ছোটি বেগম। কিন্তু আজ তার অন্য পরিচয়। আজকের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে কথা বলা বেমানান। আজকে শুধু কুর্নিশ করার পরিচয়, আজকে শুধুহুকুম তামিল করার পরিচয় তার।
যেশব্দটা একবার দূর থেকে আঘাত করেছিল, সে তার সাড়া না পেয়ে আবার আরও জোরে তাগিদ দিলে–কৌন হ্যায়?
একবার মনে হল ধমক দেয় উল্লুকটাকে দুর বেল্লিক
কিন্তু তখনই নিজেকে সামলে নিয়ে জবাব দিলে–ম্যায় রাবেয়া হুঁ —
কৌন রাবেয়া?
ঘসেটি বেগম কি বাঁদি!
আর কোনও বাধা নেই। আর একটা ফটক পেরোতে পারলেই একেবারে বাইরের দুনিয়া। তখন নজরকুলি খাঁ আছে, নিজে আছে, আর আছে মোহর, আর সোনার গয়না। বহু উপহার জীবনে পেয়েছে। বাপজানের কাছ থেকে, রাজা রাজবল্লভের কাছ থেকে, নজরকুলির কাছ থেকে। বেগমের কাছ থেকে তারা নিয়েছে অনেক, কিন্তু তারই মধ্যে কিছু কিছু উপহার হয়েও ফিরে এসেছে। এতদিন গায়ের গয়না হয়ে সেগুলো তার শুধু রূপের বাহার বাড়িয়েছে, জওয়ানির বাহার বাড়িয়েছে। এবার সেগুলো ইজ্জতের বাহার বাড়াক।
তুমি আমাকে ভয় পেয়ে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে নজরকুলি খাঁ। তুমি আমাকে মদত দেবে বলে আমার হিরে-জহরত-মোহর-সোনা-চাদি সবকিছু নিয়ে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু তোমার সেই শ্বেতপাথরের মতো হাত-পা বুক-চোখের কথা আমি ভুলতে পারিনি। আমি শুনেছি তুমি জুয়ায় সব টাকা নষ্ট করেছ, কিন্তু তবু আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি নজরকুলি৷ তুমি কাশি থেকে ফিরে এসে আবার চকবাজারের খুলিতে এসে উঠেছ। আমার সঙ্গে কতদিন মোলাকাত করবার জন্যে কোশিস করেছ। তখন তোমার সঙ্গে দেখা করবার এক্তিয়ার ছিল না আমার, কিন্তু এবার এক্তিয়ার মিলেছে। এবার তুমি আমাকে মদত দাও নজরকুলি খাঁ। এবার আমার দুশমন খতম হয়েছে। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা বরবাদ হয়েছে। এই-ই সুযোগ নজরকুলি খাঁ, এই সুযোগ! এবার তুমি আমাকে মদত। দাও
চকবাজারের রাস্তায় তখন বেশ ভিড়। সবাই কি জানতে পেরেছে নবাব লড়াইতে হেরে ফৌজ ছেড়ে পালিয়ে এসেছে? রাস্তার এক পাশ দিয়ে চলতে চলতে কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল ঘসেটি বেগমের। সবাই জিজ্ঞেস করছে সবাইকে-ক্যা হুয়া হ্যায় ভাইয়া?
তবে কি কেউ জানে না এখনও?
অল্প অল্প আলো ফুটতে আরম্ভ করেছে পুব দিকের মঞ্জিলের মাথায়। জুম্মা মসজিদের মিনার চারটি ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে আসমানের গায়ে হেলান দিয়ে। ঘসেটি বেগম আরও জোরে পা চালিয়ে দিলে।
