হঠাৎ ফিরিঙ্গি আর্মির সেপাইদের মধ্যে যেন বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল। ফরওয়ার্ড, কুইক, ফায়ার। কুড়িজন ইংলিশ আর্মির লোক মারা গেছে, যাক। কিন্তু কোম্পানির জন্যে আমাদের সবকিছু স্যাক্রিফাইস করতে হবে। দরকার হলে মরতে হবে। উই মাস্ট ডু অর ডাই… ফায়ার… ফায়ার…
*
খবরটা ঘসেটি বেগমের কানেও গেছে। আমিনা বেগমসাহেবার কানেও গেছে। এক-একজন নিজের মহলে বসে ধ্বরটা শুনেছে আর বাঁদিদের ডেকে জিজ্ঞেস করেছে কী হয়েছে রে বাঁদিক্যা হুয়া?
একদিন নবাব আলিবর্দি খাঁ’র আমলে মেয়েরা সব পরামর্শ করত বাপজানের সঙ্গে। কেমন করে মসনদ চালাতে হয় তারই পরাম। দরকার হলে যে তোমার উপকার করবে তাকেও খুন করতে পেছোলে চলবে না। এদুনিয়াটা শুধু সততা দিয়ে চলে না বেটি, চলে ষড়যন্ত্র করে, খুনখারাবি করে আর মোহরের জোরে। আমি তো সোজা সরল পথে মসনদ পাইনি। নবাবি নীতিতে একে অসৎ পথ বলে না। যতক্ষণ মসনদ আমার, ততক্ষণ আমিই নবাব। তুমি যদি তা কেড়ে নিতে পারো তো তখন তুমিই নবাব। এই-ই দুনিয়া। সুতরাং যে-কোনও রকমে মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে। মসনদে যতক্ষণ তুমি বসে আছ ততক্ষণ সবাই তোমাকে কুর্নিশ করবে। তুমি যেই সরে যাবে, তখন সবাই কুর্নিশ করবে অন্য লোককে। একানুন চিরকালের কানুন, একানুন খোদাতালাহ আল্লাহর কানুন। একানুন বদলায় না, বদলায়নি, বদলাবে না কখনও!
তখন আমিনা বেগম, ঘসেটি বেগম, ময়মানা বেগম সবাই ছোট। সেই ছোট বয়েস থেকেই বাপজানের কাছে শুনে এসেছে এসব কথা। শিখে এসেছে কাকে বলে নবাবি, কাকে বলে ষড়যন্ত্র, কাকে বলে খুনখারাবি!
তারপর একে একে সবাই বড় হয়েছে, সকলের বিয়ে হয়েছে। সবাই দেখেছে মানুষের জীবনের একমাত্র সাধ হওয়া উচিত বাংলা মুলুকের মসনদ পাওয়া। তার জন্যে যদি পরপুরুষের সঙ্গে এক বিছানায় শুতে হয় তাতেও আপত্তি করতে নেই। তাতে তোমার জাত যাবে না, বরং ইজ্জত বাড়বে। ইজ্জত শুধু থাকে টাকায়, থাকে প্রতিষ্ঠায় প্রতিপত্তিতে আর খেতাবে। মেয়েরা বরাবর জেনে এসেছে টাকা থাকলেই তোমার সব রইল। চরিত্র-স্বভাব ওগুলো গ্রামের সাধারণ মানুষদের জন্যে। আমির-ওমরাহ-বেগমের ওসব থাকতে নেই। ওগুলো উন্নতির পথে বাধা কেবল।
সুতরাং ওড়াও ফুর্তি, টাকা কামাও আর কীসে আরও প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ে তার জন্যে ষড়যন্ত্র করো।
কিন্তু মুশকিল শুরু হল মির্জা মহম্মদ নবাবি পাবার সঙ্গে সঙ্গেই।
ষড়যন্ত্রের যেন জাল গড়ে উঠল নিজামতে। প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল আমিরে-আমিরে ওমরাহে-ওমরাহে আর বেগম-বেগমে।
আমিনা বেগমের সঙ্গে ঝগড়া শুরু হল মির্জা মহম্মদের। মির্জা মহম্মদের সঙ্গে ঝগড়া শুরু হল ঘসেটি বেগমের। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে ঝগড়া শুরু হল আমিনা বেগমের। কার সঙ্গে কার ঝগড়া বাধল না সেইটেই বলা শক্ত হয়ে দাঁড়াল।
সকলেই ভাবলে কবে মির্জা মহম্মদ মরে। মির্জা মহম্মদ মারা গেলেই যেন মসনদটা তারই ভাগে আসবে!
যে বাঁদিটা খবর এনেছিল সে বকশিশ পেয়ে গেল একটা মোহর।
তুই ঠিক শুনেছিস তো?
হ্যাঁ ছোটি বেগম, আমি ঠিক শুনেছি।
কার কাছে শুনলি?
খোজা সর্দার পিরালি খাঁ-ও বলছিল, বরকত আলিও বলছিল।
নানিবেগমসাহেবা কোথায়?
মতিঝিলে, ওরা দু’জনেই তো নানিবেগমসাহেবাকে ডেকে আনতে গেছে ছোটি বেগম।
ছোটি বেগম আর দেরি করলে না। অনেক দিন ধরে নজরবন্দি হয়ে ছিল চেহেল্-সুতুনে। সেই মতিঝিল! কত সাধের মতিঝিল তার। মতিঝিলের এক-একটা পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ঘসেটি বেগমের জীবন। জাহাঙ্গিরাবাদে স্বামীকে রেখে মতিঝিলের মধ্যেই তো কাটত তার দিন। আলিবর্দি খাঁ আদর করে বড় মেয়ের নাম দিয়েছিল মেহেরুন্নিসা। তাই থেকে শেষকালে মেহের। রাজা রাজবল্লভও তাকে আদর করে মেহের বলেই ডাকত। হোসেনকুলি খাঁ অনেক রাত্রে লুকিয়ে লুকিয়ে আসত তার শোবার ঘরে। এসে ডাকত–মেহের’। আর শেষ পর্যন্ত ছিল নজরকুলি খাঁ। আঃ, কী খুবসুরতই না চেহারা ছিল নজরকুলির। মার্বেল পাথরের মতো তেলা-তেলা হাত-পা-মুখ-চোখের গড়ন। ছোটি বেগম পাগল হয়ে গিয়েছিল সেই নজরকুলিকে দেখে।
আজ সব কোথায় গেল তারা!
ঘসেটি বেগম বললে–দ্যাখ তো, বাইরের ফটকে পাহারাদার আছে কে?
বাঁদিটা বললে–কেউ নেই ছোটি বেগম, আজ সব বিলকুল বেসামাল হয়ে গেছে চেহেল্-সুতুন—
আর নবাব? নবাবের সঙ্গে কেউ আসেনি?
নবাব একলা লড়াই থেকে ওয়াপাস এসেছে ছোটি বেগম। এসেই চেহেল্-সুতুনে লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবার মহলে গিয়েছিল, সেখান থেকে আমির-ওমরাহদের তলব দিয়েছে মোলাকাত করবার জন্যে–
কেন?
নবাব আবার ফৌজ বানাবে শুনছি, নয়া ফৌজ। সেই নয়া ফৌজ নিয়ে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করবে!
ঘসেটি বেগম সব শুনলে। তারপর বললে–তুই একটা কাজ করতে পারবি রাবেয়া, আমাকে তোর পেশোয়জ দিতে পারবি? তুই আমার সাজ-পোশাক পরে আমার ঘরে বসে থাক, আমি তোর পোশাক পরে একবার চেহেল্-সুতুনের বাইরে যাব
কেন ছোটি বেগম, বাইরে যাবেন কেন?
ঘসেটি বেগম বললে–শিগগির দে, আর বখত নেই, এই-ই আমার সুযোগ। এ-সুযোগ ছাড়লে আর সুযোগ আসবে না জীবনে
কিন্তু, যদি কেউ দেখতে পায় আপনাকে ছোটি বেগম? যদি কেউ ধরে ফেলে?
কে আর ধরবে রে? সবাই তো এই সুযোগই খুঁজছিল। এতদিন পরে যদি সুযোগ এসেছে তো একে আমি ছাড়ব না, দে তোর পোশাকটা দে
