আচ্ছা মিরজাফর আলি সাহেব, আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, আপনি এখানে আসবার আগে আমার সামনে কোরান ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, আপনি আমার বিরুদ্ধাচরণ করবেন না?
মিরজাফর আলি এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নবাবের সব কথা শুনছিল। এতক্ষণে উত্তর দিলে। বললে–সেকথা তো আমি এখনও বলছি আলি জাঁহা!
আপনি সত্যিই আমার বিরুদ্ধাচরণ করবেন না? আপনি সত্যি বলছেন?
হ্যাঁ, আলি জাঁহা। সত্যি বলছি!
নবাব মির্জা মহম্মদ আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলে না। উঠে দাঁড়িয়ে মিরজাফর আলিকে জড়িয়ে ধরলে।
বললে–কিন্তু তা হলে আমার বড় ভয় করে কেন আলিসাহেব!
কীসের ভয় আলি জাঁহা?
কেন মনে হয় আপনি আমার দলে নন, আপনি ওদের দলে আলিসাহেব? মনে হয় আমার কেউই নেই, আমি একলা আর আমার চারপাশে কেবল সব দুশমন! আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না কেন আলিসাহেব? আপনি থাকতে আমি কেন এত অসহায় মনে করছি নিজেকে?
মিরজাফর মির্জার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললে–আপনি স্থির হন আলি জাঁহা।
আপনারা সবাই বিরুদ্ধে গেলে আমি কেমন করে স্থির হয়ে থাকি আলিসাহেব? আমার মাথার ওপরে এত দায়িত্ব নিয়ে আমি কী করে স্থির হতে পারি? আপনারা যখন কাল রাত্রে সবাই চলে গেলেন, তারপর থেকে কি আমি ঘুমিয়েছি? জানেন আলিসাহেব, আমার সোনার কলকেটা পর্যন্ত কে চুরি করে নিয়ে গেছে, তাবুর কাপড়টা কে খানিকটা ছুরি দিয়ে কেটে নিয়ে গেছে। এরা কি মনে করেছে আমি মারা গিয়েছি? আমার মরা পর্যন্তও কি এরা অপেক্ষা করতে চায় না? নিজামত কি নেই? খোদাতালাহও কি মারা গেছে বেহেস্তে? দুনিয়ার ইনসান কি সবাই জানোয়ার হয়ে গেছে?
মিরজাফর সাহেব বললে–আপনি চুপ করুন আলি জাঁহা, আমি তো আছি
কিন্তু কোথায় আছেন আপনি? সকাল থেকে দু’শো-তিনশো সেপাই আমার মারা গেল, আপনারা তো কিছুই করলেন না। ওই দেখুন, আমার মিরমদন এখনও আমার সামনে পড়ে রয়েছে, ও কিছু শুনতে পাচ্ছে না, কিন্তু আপনারা তো কর্নেল ক্লাইভকে মেরে ওর বদলা নিতে পারলেন না?
আপনাকে কিছু ভাবতে হবে না আলি জাঁহা, আমি তো বলছি আমি আছি
মির্জা মহম্মদ বললে–আপনি আছেন তো বলছেন, কিন্তু আমি কেমন করে বিশ্বাস করব যে আপনি আছেন? আপনি কখন কাজ করে দেখাবেন যে আপনি আছেন? আপনার ফৌজরা যে গুলি ছুঁড়েছে তার কি একটাও ফিরিঙ্গিদের ফৌজের ওপর গিয়ে পড়েছে? শুধু আপনি কেন, রাজা দুর্লভরাম, ইয়ার লুৎফ খাঁ তারাই কি একটা ফিরিঙ্গি ফৌজের গায়ে আঁচড় কাটতে পেরেছে? তা হলে আমি কেমন করে বুঝব যে আপনারা আমার পেছনে আছেন? একবার আমি হালসিবাগান থেকে ইজ্জত হারিয়ে পালিয়ে এসেছি, এবারও কি আমি আমার, আপনার, হিন্দুস্থানের সকলের ইজ্জত নিয়ে পালিয়ে যাব বলতে চান? বলুন, আপনার কী মতলব আলিসাহেব, চুপ করে থাকবেন না, কথা বলুন?
হঠাৎ ওদিক থেকে একটা কামানের বিকট শব্দ কানে এল।
ওই দেখুন আলিসাহেব, ওদের কামানের কেমন শব্দ হয়, আমাদের কামানের শব্দ নেই কেন? আমাদের কামানগুলো কি খারাপ? আমাদের কামানগুলো কি ভোঁতা?
মিরজাফর আলি তাড়াতাড়ি বাইরে চলে যাচ্ছিল।
বললে–আমি যাই, দেখে আসি আলি জাঁহা–
না, যাবেন না, আপনি দাঁড়ান আলিসাহেব, আপনার সঙ্গে কথা আছে। আজ আমি সব কথার ফয়সালা করে ফেলতে চাই। আমার মিরমদন বেঁচে থাকলে আজ আমি আপনাকে এমন করে বলতাম না, সে চলে গিয়ে আমাকে খোঁড়া করে দিয়ে গিয়েছে–
মিরজাফর আলি কথার মধ্যেই হঠাৎ বললে–কেন আলি জাঁহা, আপনার মিরমদন নেই বটে, কিন্তু আপনার মোহনলাল তো আছে–
আপনি দেখছি এখনও সেই কথা ভুলতে পারেননি আলিসাহেব! আমি জানি আপনি এখনও এই বিপদের সময়েও আমার ওপর রাগ করে আছেন। কিন্তু সত্যি বলুন তো, আপনার সঙ্গে কি মোহনলালের তুলনা?
মিরজাফর আলি সাহেব চুপ করে রইল।
আপনার কাছে শুধু একটা অনুরোধ, আর একটা দিন আমার যুদ্ধটা চালিয়ে দিন আপনি আলিসাহেব, যেমন করে হোক চালিয়ে দিন, তারপরে আর আমার ভাবনা নেই। জেনারেল ল’ কাল কিংবা পরশুই এসে পড়বে, তখন আর আপনাকে আমি বিরক্ত করব না–বলুন আপনি চালিয়ে যাবেন?
ইয়ারজান পাশেই দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
এতক্ষণে বললে–হ্যাঁ, আলিসাহেব, এমন সময় আপনি আর না’ বলবেন না–আপনি বলুন ‘হ্যাঁ’, আপনার ওপর বাংলা মুলুকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে
ওদিকে তখন কর্নেল ক্লাইভ চিৎকার করে উঠেছে–কিলপ্যাট্রিক
কিলপ্যাট্রিকের সোলজাররা তখন দেখা গেল পেছন দিকে হটে আসছে। মেজর কিলপ্যাট্রিক তার সৈন্যদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে খালের দিকে।
স্টপ, স্টপ দেয়ার
দৌড়োতে দৌড়োতে ক্লাইভ সোজা মেজর কিলপ্যাট্রিকের সামনে গিয়ে হাজির।
কী করছ? ওদের হটাচ্ছ কেন?
মেজর কিলপ্যাট্রিক বললে–ওপাশ থেকে এনিমি এবার ফায়ারিং বন্ধ করেছে, সেই জন্যেই হাইড-আউটের মধ্যে ওদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি–
কিন্তু আমি তো চাই এনিমি সামনে এগিয়ে আসুক!
সামনে এগিয়ে এলে আমরা ওদের আর্মির কাছে যে পিষে মারা যাব।
ক্লাইভ রেগে গেল আরও। বললে–কিন্তু আমরা পেছিয়ে এলে যে ওরাও পেছিয়ে যাবে
মেজর কিলপ্যাট্রিক বললে–কিন্তু তাতে ক্ষতি কী? আমাদের আর্মি একটু রেস্ট পাবে।
কিন্তু রেস্ট আগে না ভিক্টরি আগে?
আমার সোলজাররা মারা গেলে কারা ভিক্টরি আনবে?
তুমি তর্ক কোরো না। ডোন্ট আ। লেট দ্য সোলজার্স গো অ্যাহেড, কামান-বন্দুক নিয়ে সবাই এগিয়ে যাক সামনের দিকে, তা হলেই এনিমি-লাইনস এগিয়ে আসবে! আমি তো তাই-ই চাই আমি এ-যুদ্ধ প্রোলং করতে চাই না। জেনারেল ল’ আসবার আগেই আমি ওয়ার খতম করে দিতে চাই–গো অন, ফায়ার, ব্যাটালিয়ান, ফরওয়ার্ড, কুইক, ফায়ার….
