রেজা আলি মুখে কিছু বললে–না। শুধু ছুঁচোলো গোঁফের দুটো দিক আরও ছুঁচোলো করতে করতে বললে–তওবা তওবা
তারপর যা করণীয় তা করলে পরদিনই। এবার আর লোক মারফত নয়। নোকরিতে উন্নতি করতে হলে খবরটা মেহেদি নেসার সাহেবকে নিজে গিয়ে দিতে হবে। রাত থাকতেই বেরিয়ে পড়ল রেজা আলি ফিরিঙ্গি’র পিঠে। নবাব যেখানেই থাকুক, তাতে কিছু হরজা নেই। মেহেদি নেসার সাহেব থাকতে পারে। তার চেলা মনসুর আলি মেহের মোহরার থাকতে পারে। দফতর ফেলে আর কোথায় যাবে সবাই মিলে।
ভোররাত থাকতে থাকতে মুর্শিদাবাদে পৌঁছে অবাক! এত হল্লা কেন? এত গোলমাল কীসের? চকবাজারের রাস্তায় এত ভোরে তো এত লোক বেরোয় না!
বশির মিঞাও তখন সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের সামনে পঁড়িয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিল। এত হল্লা কীসের? ক্যা হুয়া?
মাঝিমাল্লারা পাশেই দাঁড়িয়ে ভয়ে কঁপছিল। একবার যখন মেহেদি নেসারের চরের কবলে পড়েছে তখন আর তাদের রেহাই নেই জেনেই নিয়েছে।
ওদিকে কান্ত সারাফত আলির কাছ থেকে মোহর আনতে গিয়েছে।
কিন্তু বশির মিঞা আর দাঁড়াতে পারলে না। আস্তে আস্তে একটু একটু করে পায়ে পায়ে এগোতে লাগল। তবে কি নিজামত বরবাদ হয়ে গেল। ফিরিঙ্গি ফৌজ কি মুর্শিদাবাদের চকবাজারে এসে হাজির হবে নাকি?
ক্যা হুয়া হ্যায় ভেইয়া?
একজন বললে–শুনা হ্যায় নিজামত পালট গয়া
দুর বেওকুফ!
বেওকুফ না বেওকুফ! নিজামত পালটে যাবে মানে? নবাব কি মারা গেছে? মেহেদি নেসার সাহেব কি পটল তুলেছে? বলছিস কী তুই বেল্লিকের মতো? নাকে ঘুষি মেরে মুখ চ্যাপটা করে দেব তোর!
কথাটা মনে মনে বললে–বটে বশির মিঞা, কিন্তু অবস্থাটা দেখে ভাল মনে হল না! পায়ে পায়ে আরও এগিয়ে গেল। দুঃসংবাদ বোধহয় বাতাসের চেয়েও জোরে ছোটে। তবে কি সত্যি সত্যিই দুঃসংবাদ এসে গেছে!
রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ পেছনে কার গলা শুনে বশির মিঞা মুখ ফিরিয়ে দেখলে ডিহিদার রেজা আলি সাহেব–
আরে বশির মিঞা, তুই?
বশির মিঞা সেলাম করলে সেলাম আলেকুম জনাব রাজধানীতে কী মনে করে?
হাতিয়াগড়ে হলে বশির মিঞাকে আমলই দিত না রেজা আলি সাহেব। কিন্তু মুর্শিদাবাদে অন্যরকম। রাজধানীর লোক, তার ওপর মনসুর আলি মেহের মোহরার সাহেব বশির মিঞার ফুপা।
ফিরিঙ্গি’র পিঠে বসে বসে বললে–মেহেদি নেসার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, সাহেব আছে তো শহরে?
বশির মিঞা বললো হ্যাঁ জনাব, সাহেব তো আছে শহরে, লেকিন বড়ি মুশকিলমে আছে।
কেন? কী হল?
বশির মিঞা বললে–সে অনেক বাত জনাব। মেহেদি সাহেব এখন আপনার সাথে মুলাকাত করতে পারবে না। অনেক কাম সাহেবের।
রেজা আলি সাহেব বললে–অনেক কম হলে কী হবে, আমার ভি অনেক কামের কথা আছে সাহেবের সঙ্গে
তারপর চারদিকে চেয়ে বললে–এত হল্লা হচ্ছে কীসের রে?
কে জানে জনাব! বলছে, নিজামত পালট গয়া।
সেকী রে? পালটে গেছে মানে? লোকগুলো বেল্লিক নাকি? তা সে যা বলুক, আমার কামটা যে খুব জরুরি।
কী রকম?
তুই বলবি না তো কাউকে? বড় বেওকুফি করে ফেলেছি রে বশির। আসলি রানিবিবি বলে যাকে চেহেল্-সুতুনে সেবার পাঠিয়েছিলুম, সে সাচ্চা রানিবিবি নয় রে।
বশির মিঞা অবাক হয়ে গেল। বললে–সেকী জনাব?
হ্যাঁ রে বশির, বড় বেওকুফি করে ফেলেছি। চেহেল্-সুতুনে যাকে পাঠিয়েছি সে হল আসলে হাতিয়াগড়ের নওকরের লেড়কি। আর আসলি রানিবিবি কেষ্টনগরের রাজা কৃষণচন্দরের হাবেলিতে লুকিয়ে আছে।
বশির মিঞার মাথার উপর যেন সত্যিই বাজ পড়ল।
রেজা আলি বললো রে, আমার চর নিজের চোখে দেখে এসেছে রানিবিবিকে।
তা হলে মরিয়ম বেগম বলে কাকে মেহেদি নেসার সাহেব গ্রেফতার করলে? সে কে? সে কি রানিবিবি নয়?
আপনি বলছেন কী জনাব, রানিবিবিকে যে আজ মেহেদি নেসার সাহেব গ্রেফতার করে মতিঝিলে বন্দি করে রেখেছে। এই একটু আগে!
রেজা আলি অবজ্ঞার হাসি হাসল–আরে দুর, সে রানিবিবি নয়, সে হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির নওকর শোভারামের লেড়কি মরালী! আসলি রানিবিবিকে তো মহারাজার কেষ্টনগরের হাবেলিতে লুকিয়ে রেখেছে
লেকিন, হাতিয়াগড়ের রাজা ছোটমশাইকে তো গ্রেফতার করেছে মেহেদি নেসার সাহেব।
তাজ্জব বাত তো!
বশির মিঞা বললে–চলুন জনাব, মতিঝিলের দিকে যাই, সাহেবকে পাত্তা করি, চলুন—
তারপর সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়েই চলতে লাগল দুজনে। রেজা আলি ঘোড়ার পিঠে, আর বশির মিঞা।
কিন্তু হঠাৎ ওদিক থেকে দুটো তাঞ্জাম আসতে দেখা গেল। চেহারা দেখে বোঝা গেল সামনেরটা নানিবেগমসাহেবার আর পেছনেরটা মেহেদি নেসার সাহেবের। সামনে দিয়ে তাঞ্জাম দুটো চলে গেল। বশির মিঞা কিছু বুঝতে পারলে না। এত ভোরে নানিবেগমসাহেবা কী করতে এসেছিল মতিঝিলে? আবার চলেই বা যাচ্ছ কেন?
কিন্তু পেছনেই দৌড়োত দৌড়োতে পিরালি খাঁ চলেছে।
বশির তাকে ডাকলে–পিরালি খাঁ, কী হয়েছে? নানিবেগমসাহেবা কোথায় যাচ্ছে?
চেহেল-সূতুনে!
কেন? রাত্রে মতিঝিলে এসেছিল কেন?
তা মালুম নেই।
চেহেল্-সুতুনে কী হয়েছে? এত হল্লা হচ্ছে কেন চারদিকে?
পিরালি খাঁ বললে–নবাব লড়াই থেকে ওয়াপাস এসেছে
বলে আর সেখানে দাঁড়াল না। তাঞ্জাম দুটোর পেছন পেছন চেহেল্-সুতুনের দিকে দৌড়োতে লাগল।
২.১৫ মুখোশ
আমি জানি, তোমরা সকলে আমার সামনে মুখোশ পরে আছ। আমি মুখে কিছু বলছি না, কিন্তু মিরজাফর আলি সাহেব, তুমি আর আমাকে প্রবঞ্চনা করতে পারবে না। আমাকে তুমি অর্বাচীন ভেবে এতদিন অবজ্ঞা করেছ। আর আমিও তোমাকে যখন-তখন অপমান করে বুঝতে দিয়েছি যে, আমি অর্বাচীন নই। কিন্তু এখন তোমার বুদ্ধির সঙ্গে আমার বিপদের মোকাবিলা হোক!
