সচ্চরিত্র ঘটক এতক্ষণ খাইখাই করেও খেতে পারেনি। যেন তার খাবার জায়গাও হঠাৎ ফুরিয়ে গিয়েছে। হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে কান্তর সঙ্গে দেখা।
একী বাবাজি, তুমি এখনও আছ? খাওয়া হয়েছে?
কান্ত কিছু উত্তর দিলে না।
সচ্চরিত্র বললে–সেকী, বিয়ে হল না বলে খেতে কীসের আপত্তি, চলো, আমারও খাওয়া হয়নি–
তারপর নাপিতের দিকে চেয়ে বললে–চলো হে, তুমিই বা কেন মাঝখানে থেকে উপুসি থাকবে, চলো, চলো–
*
ওদিকে মুর্শিদাবাদেও অনেক রাত হয়েছে। রাত হলেই আজকাল কেমন সব থমথম করে। এই মহিমাপুর থেকেই শাহিবাগটার সামনের বড় মসজিদটা দেখা যায়। মসজিদের মাথায় সবুজ নিশান ওড়ে। হাওয়ায় দোল খায়, পতপত করে। তার ওপরে একটা বাতি জ্বলে। বাতির আলোটা আরও অনেক দূর থেকে দেখা যায়। ভাগীরথী দিয়ে যেতে যেতে নৌকোর মাঝিমাল্লারা আলোটা দেখে নিশানা ঠিক করে নেয়। বলে মসজিদের আলো
ফতোদ জগৎশেঠের বাড়ির লোহার দরজার সামনে বন্দুক নিয়ে বসে পাহারা দেয় ভিখু শেখ।
ভিখু শেখ বলে–মহারাজ ফতোদ জগৎশেঠকা হাবেলি।
মনিবের গৌরবে গোলামেরও গৌরব বাড়ে। সামনে দিয়ে কেউ গেলে কিছু বলে না। যার-তার সঙ্গে কথা বললে–ভিখু শেখের ইজ্জত চলে যায়। শাহি সড়কের পদাতিক মানুষের ওপর তার বড় তাচ্ছিল্য। তাচ্ছিল্য করে বলেই তাদের সঙ্গে কথা বলে নিজেকে ছোট করে না। বরং একলা চুপচাপ সব দেখে। দুনিয়াদারি দেখতে ভিখু শেখের বেশ লাগে। যখন নবাব মঞ্জিলের নহবতখানায় ইনসাফ মিঞা ভোরবেলা আশাবরীর সুর তোলে তখন ভিখু শেখ মাঝে মাঝে চোখ বুজে দিওয়ানা হয়ে যায়। দুনিয়ার দৌলত, খানদান, জৌলুস, জমজমা, আওরাত, তনখা, এমনকী বেহেস্তের খোদাতালা পর্যন্ত তার কাছে বরবাদ হয়ে যায়। যেন ইনসাফের নহবতের ফুটোগুলোতে মিছরি মাখানো আছে। ভিখু শেখের মতো পাঠানকেও জাদুর মোহে ভুলিয়ে দেয়। আর ঠিক তার পরেই বুঝি হঠাৎ সচেতন হয়ে ওঠে। চোখ দুটো খোলে। বন্দুকটাও সামলে নেয়। গোঁফজোড়া পাকিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে নিজেকে যেন অপরাধী মনে হয় তার। রাজা দৌলতরাম ফতোদ জগৎশেঠজির সে খাস নৌকর। রাজা দৌলতরাম নামটা তার নিজের দেওয়া। তার মনে পড়ে যায়, তার ওপর নির্ভর করে এত বড় দৌলতরাম আরাম করে ঘুমুচ্ছে। তার একটু গাফিলতিতে সবকিছু লোকসান হয়ে যেতে পারে। মারাঠি ডাকুরা লুঠপাট করে নিতে পারে। চোট্টা ডাকুর তো কমতি নেই দেশে। দৌলত দৌলত করে তামাম দুনিয়া মস্তানা হয়ে গেছে। আরে, হারামি দৌলতের মতো খতরনাক চিজ আছে নাকি আর? দৌলতের জন্যেই তো বেগমের সঙ্গে নবাবের, নবাবের সঙ্গে নবাবজাদার লড়াই চলছে দুনিয়ায়। দৌলত আর আউরত। দুটোই খতরনাক চিজ। ভিখু শেখের চোখের সামনেই এই দুটো জিনিসের পাহাড় জমে আছে। দৌলত ভি দেখেছে, আউরত ভি দেখেছে, ঘসেটি বেগম, আমিনা বেগম, মনি বেগম সবাইকে দেখেছে ভিখু শেখ। ঢাকার দেওয়ান নোয়াজিস মহম্মদ সাহেবকে দেখেছে, পূর্ণিয়ার দেওয়ান সৈয়দ আহম্মদ সাহেবকে দেখেছে। শেঠ মানিকচাঁদ সাহেবকে দেখেছে, ফতেচাঁদ জগৎশেঠজিকে দেখছে। মহারাজ স্বরূপচাঁদকে দেখেছে, এখন মহতাপচাঁদ জগৎশেঠজিকে দেখছে। সবই দৌলত আর আউরত। সেই দৌলত আর আউরতের খাতিরেই সবাই মহারাজার কাছে দরবার করে। কাশ্মীরিরা আসে, মুলতানিরা আসে, পাঠানরা আসে, শিখরা আসে। তাতার, মোগল, ফিরিঙ্গি, ইংরেজ, দিনেমার, আর্মানি সবাই আসে। এসে টাকা চায়, হুন্ডি কেনে। ভিখু শেখ শেঠজির ফটকে পঁড়িয়ে সবাইকে দেখে। সব লক্ষ করে। কিন্তু কথা বিশেষ বলে না।
কিন্তু সেদিন হাঁক দিয়ে উঠল ভিখু শেখ–কৌন?
বশির মিঞা বলে–আমি রে বাপু, আমি
আমি কৌন?
আরে বাবা, আমাকে চিনিস না? মোহরার মনসুর আলি মেহের আমার ফুপা, নবাব-নিজামতের মোহরার
ভিখু শেখ আজকের লোক নয়। মির হবিব খাঁ যখন বর্গির সেপাই নিয়ে শেঠজির বাড়ি চড়াও হয়েছিল, তখনও এই বন্দুক দিয়ে দশটা মারাঠি ডাকুকে খুন করেছিল। ফতেচাঁদ জগৎশেঠজির আমলের লোক সে। অত সহজে তাকে দলে টানা যায় না।
বললে–হুকুম নেই—
বশির মিঞা বললে–আরে হুকুম নেই মানে, তোমার শেঠজির দোস্ত আমাদের নবাব, আমাদের অন্দরে যেতে দেবে না?
তারপর হঠাৎ সোজা কথায় কাজ হবে না দেখে আদর করে বললে–কেন গোসা করছ শেখজি, তুমিও মুসলমান আমিও মুসলমান, এক জাত, এক আল্লা আমাদের
ভাগো নেড়ি কুত্তা!
এর পর আর দাঁড়ানো যায় না। জগৎশেঠজির হুকুম হয়েছে কাউকেই বিনা পাঞ্জায় ঢুকতে দেওয়া হবে না এই হাবেলিতে! দুনিয়ার হালচাল ভাল নয়। দিল্লির বাদশা না-থাকারই মতো। পাঠান, আফগান, মারাঠি সবাই টাকা লুঠতে বেরিয়েছে। আর জগৎশেঠজির মতো টাকা কার আছে? শাহানশা বাদশা দিল্লির বাদশার চেয়েও বেশি দৌলত জগৎশেঠজির। তাই মহিমাপুর হাবেলির সব ফটকে বন্দুকওয়ালা পাহারাদার বসেছে। কোথাকার কোন নবাবের মোহরার তার রিস্তাদারকে ঢুকতে দেবে জগৎশেঠজির বাড়িতে! ভিখু শেখ আবার বন্দুকটা খাড়া করে ধরে গোঁফে তা দিতে লাগল।
কৌন?
এবার দুটো পালকি এগিয়ে আসছিল। সামনে সামনে আসছিল আর-একজন আদমি। আদমিটা কাছে আসতেই ভিখু শেখ হাতটা ধরে ফেলেছে। ফির দিল্লাগি!
বশির মিঞা এবার বুকটা চিতিয়ে দাঁড়াল।
পাঞ্জা?
পাঞ্জাও ফেলে দিলে চিত করে ভিখু শেখের চোখের সামনে।
